শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

রাজার সাক্ষী: ক্ষমা নাকি ফাঁসি?

যে চুক্তিতে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়ালেন সাবেক আইজিপি
একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ১১ জুলাই ২০২৫ | ৩:১৬ অপরাহ্ন


“আমি অপরাধী…গিলটি ফিল করছি!”—আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ভারি পরিবেশে যখন পুলিশের সাবেক সর্বোচ্চ কর্তা চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন এই স্বীকারোক্তি দেন, তখন কেবল একটি মামলার গতিপথই বদলায়নি, বরং আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে শতবর্ষী এক আইনি ধারণা—‘রাজসাক্ষী’।

কী এই রাজসাক্ষী? কেনই বা একজন আসামি নিজের গলায় অপরাধের দায় নিয়ে অন্যের বিরুদ্ধে সাক্ষী হতে চান? এর পেছনে কি শুধুই ক্ষমার হাতছানি, নাকি আরও গভীর কোনো হিসাব-নিকাশ?

চুক্তিটা কী: সত্যের বিনিময়ে মুক্তির আশা

সহজ কথায়, রাজসাক্ষী হলেন অপরাধের একজন অংশীদার, যিনি নিজের ও সহযোগীদের সব কুকর্মের পূর্ণাঙ্গ ও সত্য বিবরণ আদালতের কাছে তুলে ধরার শর্তে ক্ষমা পেতে পারেন। এটি অনেকটা আদালতের সঙ্গে এক অলিখিত চুক্তি, যেখানে পণ হলো ‘সত্য’ আর পুরস্কার হলো ‘মুক্তি’।

ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৩৭ ধারা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনের ১৫ ধারায় এই ‘চুক্তি’র আইনি ভিত্তি দেওয়া হয়েছে। আইন বলছে, গুরুতর অপরাধের তদন্ত বা বিচারের যেকোনো পর্যায়ে আদালত কোনো আসামিকে এই প্রস্তাব দিতে পারেন। শর্ত একটাই—অপরাধ নিয়ে বিন্দুমাত্র তথ্য গোপন করা যাবে না, দেওয়া যাবে না কোনো মিথ্যা সাক্ষ্য।

প্রখ্যাত আইনজ্ঞ গাজী শামসুর রহমানের ভাষায়, “যাঁকে রাজসাক্ষী করা হয়, তাঁর কাছে কঠিন শর্ত দেওয়া হয়। সেই ব্যক্তি প্রতিশ্রুতি দেন যে অপরাধের ব্যাপারে তাঁর যতটুকু জ্ঞান আছে, ততটুকু তিনি পুরোপুরি সততার সঙ্গে প্রকাশ করবেন।”

ভাঙ্গলে চুক্তি, ভয়ানক পরিণতি

এই চুক্তির পথটি একেবারে মসৃণ নয়। প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করলেই অপেক্ষা করছে ভয়ানক পরিণতি। যদি আদালত মনে করেন, রাজসাক্ষী সত্য গোপন করেছেন বা মিথ্যা বলেছেন, তবে তার ক্ষমা তৎক্ষণাৎ বাতিল হয়ে যাবে।

তখন তিনি আর সাক্ষী নন, ফের পরিণত হবেন আসামিতে। শুধু মূল অপরাধের জন্যই নয়, মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার অপরাধেও তার বিরুদ্ধে নতুন করে মামলা হবে। তখন তার বিচার হবে অন্য আসামিদের থেকে আলাদাভাবে।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এহসানুল হক সমাজী বলেন, “রাজসাক্ষী যদি শর্ত ভঙ্গ করেন, তিনি আর সাক্ষী থাকেন না, বরং আসামিতে পরিণত হন। তখন তার শাস্তিও হতে পারে।”

স্মরণে এরশাদ সিকদার, আলোচনায় মামুন

বাংলাদেশে রাজসাক্ষী হওয়ার ঘটনা বিরল হলেও একেবারে নজিরবিহীন নয়। দুই দশক আগে দেশ কাঁপানো সন্ত্রাসী এরশাদ সিকদারের দেহরক্ষী নূরে আলম রাজসাক্ষী হয়ে তার সব কুকীর্তি ফাঁস করে দিয়েছিলেন। তার সাক্ষ্যের ভিত্তিতেই এরশাদ সিকদারের ফাঁসি কার্যকর হয় এবং খুনের দায় থেকে খালাস পান নূরে আলম।

তবে চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের ঘটনাটি ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে, কারণ তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ইতিহাসে রাজসাক্ষী হলেন।

তার এই নাটকীয় স্বীকারোক্তির পর এখন পুরো দেশের নজর ট্রাইব্যুনালের দিকে। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জুলাই অভ্যুত্থানের সময়কার মানবতাবিরোধী অপরাধের রহস্য কতটা উন্মোচিত হবে? আর এই সত্য বলার বিনিময়ে তিনি কি পাবেন কাঙ্ক্ষিত ক্ষমা, নাকি শর্ত ভঙ্গের ফাঁদে পড়ে নিজেই ফেঁসে যাবেন? উত্তর মিলবে বিচারিক প্রক্রিয়ার ধাপে ধাপেই।