রবিবার, ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ৫ মাঘ ১৪৩২

কাজ শুরুর আগেই বিল, কাজ না করেই ‘অতিরিক্ত কাজের’ কার্যাদেশ

ডুলাহাজারা সাফারি পার্কের টেন্ডার জালিয়াতি: দুদকের অভিযানে বেরিয়ে এলো দুর্নীতির থলের বিড়াল
এম জিয়াবুল হক | প্রকাশিতঃ ১১ জুলাই ২০২৫ | ৯:৩২ অপরাহ্ন


কক্সবাজারের চকরিয়ায় ডুলাহাজারা সাফারি পার্কের প্রায় চার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পে টেন্ডার জালিয়াতি এবং ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগে অবশেষে অভিযানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর এবং লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে গতকাল বৃহস্পতিবার (১০ জুলাই) দুপুরে কক্সবাজার দুদকের একটি দল পার্কে অভিযান চালিয়ে উন্নয়নকাজে গুরুতর অসঙ্গতির প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে।

কক্সবাজার জেলা সমন্বিত কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. সাখাওয়াত হোসেনের নেতৃত্বে দুদকের একটি দল সরেজমিনে পার্কের চলমান ছয়টি উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ পরিদর্শন করে। এ সময় প্রকল্পের প্রায় ৩৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে দেখা গেলেও, পার্কের রেঞ্জ কর্মকর্তা মনজুর আলম শুধুমাত্র কাজের কার্যাদেশ ছাড়া আর কোনো প্রয়োজনীয় নথি দেখাতে পারেননি।

অভিযান শেষে দুদকের সহকারী পরিচালক মো. সাখাওয়াত হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, “সাফারি পার্কের উন্নয়ন কাজের টেন্ডার জালিয়াতি ও বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে অভিযোগের ভিত্তিতে আমরা অভিযান শুরু করেছি। সরেজমিনে কাজের অগ্রগতি দেখা হয়েছে। আগামী দুই কার্যদিবসের মধ্যে চট্টগ্রামের বিভাগীয় বন কর্মকর্তার (ডিএফও) কার্যালয় থেকে এ সংক্রান্ত সব নথি সংগ্রহ করা হবে। এরপর পর্যালোচনা শেষে কমিশনে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে এবং কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

অভিযোগের অন্তরালে

অভিযোগ উঠেছে, চলতি বছরের এপ্রিল মাসে ডুলাহাজারা সাফারি পার্কের ছয়টি উন্নয়ন কাজের জন্য প্রায় চার কোটি টাকার টেন্ডারে ভয়াবহ জালিয়াতির ঘটনা ঘটে। এ নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলেও তা উপেক্ষা করে চট্টগ্রাম বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) আবু নাছের মোহাম্মদ ইয়াছিন নেওয়াজ এবং টেন্ডার কমিটির সভাপতি জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা নুরজাহান বেগম তড়িঘড়ি করে তাদের পছন্দের ছয়টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দিয়ে দেন।

আরও গুরুতর অভিযোগ হলো, কাজের মেয়াদ আগামী বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত নির্ধারিত থাকলেও, জুন মাসেই সামান্য কিছু কাজ সম্পন্ন করে ঠিকাদারদের পুরো বিলের চেক প্রদান করা হয়েছে। এমনকি, কাজ শুরু হওয়ার আগেই প্রতিটি প্রকল্পের বিপরীতে অতিরিক্ত কাজের (ভেরিয়েশন) কার্যাদেশ দেওয়ার মতো নজিরবিহীন ঘটনাও ঘটেছে।

বারবার একই জালিয়াতির পুনরাবৃত্তি

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের শুরুতে ১১টি উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হলে সেখানেও ব্যাপক জালিয়াতির অভিযোগ ওঠে। মেসার্স এম আলী এন্টারপ্রাইজ ও মেসার্স রাজীব ট্রেডার্স নামের দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এ বিষয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের কাছে লিখিত অভিযোগ করে। পরে মন্ত্রণালয়ের উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় পুরো টেন্ডার প্রক্রিয়াটি বাতিল করা হয়।

কিন্তু গত ২১ এপ্রিল পুনরায় ছয়টি প্রকল্পের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হলে সেখানেও একই প্রক্রিয়ায় জালিয়াতির পুনরাবৃত্তি ঘটে বলে অভিযোগ। মেসার্স এম আলী এন্টারপ্রাইজ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গত ১৪ মে মন্ত্রণালয়ে পুনরায় লিখিত অভিযোগ করলেও তা আমলে না নিয়ে প্রকল্প পরিচালক আবু নাছের মোহাম্মদ ইয়াছিন নেওয়াজ গত ১ জুন তার পছন্দের ছয়টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ প্রদান করেন।

এসব অনিয়মের বিষয়ে জানতে ডুলাহাজারা সাফারি পার্কের প্রকল্প পরিচালক এবং ডিএফও আবু নাছের মোহাম্মদ ইয়াসিন নেওয়াজকে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি, ফলে তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

দুদকের এই অভিযানের পর এখন থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।