রবিবার, ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ৫ মাঘ ১৪৩২

যে সাগর সবকিছু ফিরিয়ে দেয়, সে আমার ছেলেকে দিচ্ছে না কেন?

অথই সাগরে ছেলেকে রেখে ফিরব না: অরিত্রের মা
একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ১৯ জুলাই ২০২৫ | ১২:৪৫ অপরাহ্ন


কক্সবাজারের উত্তাল সাগর গত ১২ দিন ধরে এক নির্মম প্রহসন চালিয়ে যাচ্ছে সাকিব হাসান ও জেসমিন আক্তার দম্পতির সাথে। ৭ জুলাই যে সাগর কেড়ে নিয়েছিল তাদের ২২ বছরের সন্তান অরিত্র হাসানকে, সেই সাগরের দিকেই তাকিয়ে নির্ঘুম রাত আর অশ্রুসিক্ত দিন পার করছেন তারা। তাদের বিশ্বাস, সাগর যা নেয়, তা ফিরিয়েও দেয়। কিন্তু সময় গড়াচ্ছে, আর সেই বিশ্বাসে চিড় ধরছে একটু একটু করে। তবু সাগরপাড় ছাড়তে পারছেন না অসহায় এই বাবা-মা।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের ছাত্র অরিত্র বন্ধুদের সাথে কক্সবাজারে এসেছিলেন জীবনের একঘেয়েমি কাটাতে, পরীক্ষা শেষের আনন্দ উদযাপন করতে। কিন্তু কে জানত, এই আনন্দই তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় বেদনার কারণ হবে! ৭ জুলাই সকালে প্যাঁচার দ্বীপের কাছে সাগরের উত্তাল ঢেউ ভাসিয়ে নিয়ে যায় তিন বন্ধুকে। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে বন্ধু সাদমান ও আসিফের নিথর দেহ ফিরিয়ে দিলেও অরিত্রকে নিজের অতল গহ্বরেই যেন লুকিয়ে রেখেছে সাগর।

এই ১২ দিনে কী না করা হয়েছে! ফায়ার সার্ভিস, পর্যটন পুলিশ, লাইফগার্ড থেকে শুরু করে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর ড্রোন—সবাই মিলে চষে ফেলেছে সাগরের নীল জলরাশি। কিন্তু অরিত্রের কোনো চিহ্ন নেই। উদ্ধারকর্মীরা বলছেন, গত তিন দশকে সাগরে ডুবে নিখোঁজ থাকার এমন ঘটনা এটাই প্রথম। সাধারণত তিন দিনের মধ্যেই ভেসে ওঠে মরদেহ। অরিত্রের অন্তর্ধান তাই এক বেদনাদায়ক রহস্যে পরিণত হয়েছে।

ঢাকার এক ইংরেজি পত্রিকার সাংবাদিক অরিত্রের বাবা সাকিব হাসান। যিনি নিজে কত শত দুর্ঘটনার খবর লিখেছেন, আজ তিনিই এক জীবন্ত ট্র্যাজেডির কেন্দ্রীয় চরিত্র। ছেলের নিখোঁজ হওয়ার খবর পেয়ে ছুটে এসেছেন কক্সবাজারে। স্ত্রী আর স্বজনদের নিয়ে সৈকতের এপার থেকে ওপার ছুটে বেড়াচ্ছেন আর বুকফাটা আর্তনাদে বলছেন, “শুনেছি, সাগরে যা নিয়ে যায়, তা পুনরায় ফিরিয়ে দেয়; কিন্তু অরিত্রকে কেন ফিরিয়ে দিচ্ছে না? যেকোনো অবস্থায় আমি ছেলেকে চাই।” কক্সবাজারে আসার আগে ছেলেকে বারণ করেছিলেন তিনি। সেই আক্ষেপ এখন তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে।

অন্যদিকে, অরিত্রের মা জেসমিন আক্তারের কান্নাভেজা চোখ দুটি এক মুহূর্তের জন্যও সরছে না সমুদ্রের দিক থেকে। তিনি বলেন, “এই অথই সমুদ্রে তো আমি আমার ছেলেকে রেখে যেতে পারি না। বাসায় একটা মুহূর্তও থাকতে পারব না। যেকোনো অবস্থায় আমি ছেলেকে ফিরে পেতে চাই।”

প্রতিদিন সকালে সূর্য ওঠে, আর অরিত্রের পরিবার নতুন আশায় বুক বাঁধে। আবার সন্ধ্যা নামে, আর তাদের আশা হতাশায় রূপ নেয়। সাগরের গর্জন এখন তাদের কাছে কান্নার শব্দের মতো শোনায়। এই বিশাল জলরাশির সামনে দাঁড়িয়ে একটি পরিবারের অপেক্ষা আর হাহাকার যেন প্রকৃতির নির্মমতার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে। অরিত্র কি ফিরবে? নাকি অনন্তকালের জন্য সাগরের বুকেই থেকে যাবে তার গল্প? এই প্রশ্নের উত্তর নেই কারও কাছে।