
ঢাকার উত্তরা দিয়াবাড়ীর আকাশ গতকালও ছিল অন্য আর দশটা দিনের মতোই। কিন্তু দুপুর ১টা ৬ মিনিটে এক ভয়াল শব্দে সবকিছু স্তব্ধ হয়ে যায়। বিমানবাহিনীর একটি এফটি-৭ যুদ্ধবিমান আগুনের গোলার মতো আছড়ে পড়ে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের একটি ভবনের ওপর। মুহূর্তে উৎসবের নগরী পরিণত হয় শোকের চাদরে। পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মো. তৌকির ইসলাম সাগরসহ ৩১টি তাজা প্রাণের নিভে যাওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের বিমান দুর্ঘটনার ইতিহাসে যুক্ত হলো আরও একটি কালো অধ্যায়।
দিয়াবাড়ীর এই মর্মান্তিক ঘটনাই প্রথম নয়। গত ৫৩ বছর ধরে বাংলাদেশের আকাশ যেন এক অন্তহীন শোকের উপাখ্যান রচনা করে চলেছে। স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরে বিমান ও হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় ঝরে গেছে কমপক্ষে ১১৬টি অমূল্য প্রাণ। এই তালিকায় আছেন ৩০ জন দুঃসাহসী পাইলট ও কো-পাইলট, আছেন বিমানবাহিনীর সাবেক প্রধান, আছেন দেশের প্রথম নারী পাইলট, আছেন দেশের বরেণ্য কথাসাহিত্যিকের সম্ভাবনাময়ী কন্যা। আর এই হিসাবের বাইরে রয়েছে বিদেশের মাটিতে বিমান দুর্ঘটনায় নিহত বাংলাদেশিদের বিশাল তালিকা, যার মধ্যে নেপালের সেই ভয়াবহ ইউএস-বাংলা দুর্ঘটনায় নিহত ২৬ জন বাংলাদেশিও রয়েছেন।
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শোকগুলো
বাংলাদেশের আকাশে সবচেয়ে বড় কান্নার রোল উঠেছিল ১৯৮৪ সালের ৪ আগস্ট। বাংলাদেশ বিমানের একটি ফকার এফ-২৭ চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার পথে বিধ্বস্ত হলে দেশের প্রথম নারী পাইলট কানিজ ফাতেমাসহ বিমানের ৪৯ জন আরোহীর কেউই বেঁচে ফিরতে পারেননি। সেই ক্ষত শুকানোর আগেই বিভিন্ন সময়ে আরও অনেক নক্ষত্রের পতন দেখেছে বাংলাদেশ। ১৯৭৬ সালে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় দেশ হারায় তৎকালীন বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল খাদেমুল বাশারকে।
‘মৃত্যুদূত’ যখন প্রশিক্ষণ বিমান
পরিসংখ্যান বলছে, আকাশপথের এই ট্র্যাজেডির এক বিশাল অংশজুড়ে রয়েছে প্রশিক্ষণ বিমানের দুর্ঘটনা। তরুণ পাইলটদের স্বপ্ন প্রায়শই থেমে গেছে মাঝ আকাশে। সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাটি ঘটে ১৯৯৮ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর। এদিন এয়ার পারাবতের একটি প্রশিক্ষণ বিমান ঢাকার পোস্তগোলায় বিধ্বস্ত হলে চিরতরে হারিয়ে যান দেশের প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেনের কন্যা, পাইলট ফারিয়া লারা এবং তার সহকর্মী। বারবার দুর্ঘটনার কবলে পড়ে একসময় বন্ধই হয়ে যায় বেসরকারি এই এয়ারলাইনসটি।
একইভাবে, বিভিন্ন সময়ে বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমান এফটি-৫, পিটি-৬১, এফটি-৭ বিধ্বস্ত হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কুদ্দুস, উইং কমান্ডার হক, স্কোয়াড্রন লিডার ইসলাম, ফ্লাইং অফিসার মাসুদ, স্কোয়াড্রন লিডার মোহাম্মদ মহাসীন, ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট আদনান মুকিত, ফ্লাইট ক্যাডেট তানিউল ইসলাম, ফ্লাইট ক্যাডেট ফয়সল মাহমুদ, ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট শরিফ রেজাসহ আরও অনেকে। ২০১৫ সালে রাজশাহীতে প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হয়ে প্রাণ হারান প্রশিক্ষণার্থী পাইলট তামান্না রহমান ও তার প্রশিক্ষক।
যুদ্ধবিমান ও হেলিকপ্টার: থামছে না দুর্ঘটনা
শুধু প্রশিক্ষণ বিমানই নয়, দেশের প্রতিরক্ষায় নিয়োজিত মিগ-২১, এফ-৭-এর মতো যুদ্ধবিমান এবং হেলিকপ্টারগুলোও বারবার দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে। ১৯৯৮ থেকে সাম্প্রতিক সময়ের স্কোয়াড্রন লিডার আসিম জাওয়াদের শাহাদাত বরণ পর্যন্ত অনেকগুলো ঘটনা ঘটেছে। ২০০২ সালে চট্টগ্রামে টেলিভিশন টাওয়ারে ধাক্কা লেগে হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে প্রাণ হারান চারজন। আবার কখনো কখনো পাইলটরা নিজেদের জীবন বাজি রেখে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা থেকে বিমানকে দূরে নিয়ে যেতে সক্ষম হলেও শেষরক্ষা হয়নি। স্কোয়াড্রন লিডার মোরশেদ হাসানের মতো পাইলটরা প্যারাশুট দিয়ে নামার চেষ্টা করেও মৃত্যুর কাছে হার মেনেছেন।
দিয়াবাড়ীর ঘটনাটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, এই শোকের তালিকা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। প্রতিটি দুর্ঘটনার পর একটি তদন্ত কমিটি হয়, কিছু সুপারিশ আসে, কিন্তু কয়েক বছর পর আবার ফিরে আসে একই ধরনের ট্র্যাজেডি। কানিজ ফাতেমা থেকে ফারিয়া লারা, খাদেমুল বাশার থেকে আসিম জাওয়াদ, আর এখন তৌকির ইসলাম সাগর এবং মাইলস্টোন স্কুলের নিষ্পাপ শিক্ষার্থীরা—প্রত্যেকেই যেন এই রক্তাক্ত ডানার ইতিহাসের একেকটি চরিত্র। প্রশ্ন একটাই, এই মৃত্যুর উড্ডয়ন কবে থামবে? আর কত প্রাণ ঝরলে বাংলাদেশের আকাশ নিরাপদ হবে?