শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

১০ দফা সংস্কারে একমত দলগুলো, তবে মূলনীতি-তত্ত্বাবধায়ক নিয়ে মতভেদ

জুলাই সনদের দৌড়ঝাঁপ: নতুন দুই বিষয়ে ঐকমত্য, ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে আলোচনা শেষের তাগিদ
একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ২৮ জুলাই ২০২৫ | ১০:৫১ পূর্বাহ্ন


রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আরও দুটি বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের দ্বিতীয় পর্যায়ের ১৯তম বৈঠকে এক ব্যক্তি জীবনে সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রীর পদে থাকতে পারবেন এবং একটি স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন করা হবে—এমন প্রস্তাবে সব পক্ষ একমত হয়েছে। তবে রাষ্ট্রের মূলনীতি, নির্বাচনকালীন সরকার এবং সাংবিধানিক নিয়োগ কমিটির মতো গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয়ে দলগুলোর মধ্যে তীব্র মতপার্থক্য এখনো বিদ্যমান রয়েছে।

গতকাল রবিবার কমিশনের বৈঠক শেষে সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ জানান, পুলিশের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে একটি স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনে দলগুলো একমত হয়েছে। এই কমিশনের নেতৃত্বে থাকবেন একজন অবসরপ্রাপ্ত আপিল বিভাগের বিচারপতি এবং এতে সরকার ও বিরোধীদলীয় নেতাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের প্রতিনিধিরা থাকবেন।

প্রধানমন্ত্রীর পদের মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছর নির্ধারণের প্রস্তাবে বিএনপি আপত্তি জানায়নি, তবে তাদের শর্ত হলো, সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের জন্য পৃথক কোনো কমিটি গঠন করা হলে তারা এই প্রস্তাব মানবে না।

এই দুটি বিষয় ছাড়াও এর আগে আরও আটটি বিষয়ে দলগুলো ঐকমত্যে পৌঁছেছিল। সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো জরুরি অবস্থা ঘোষণার ক্ষমতা সীমিত করা, জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ, অর্থবিল ও আস্থা ভোট ছাড়া অন্য বিষয়ে সংসদ সদস্যদের দলের বিপক্ষে ভোটের সুযোগ দিয়ে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের পরিবর্তন, এবং সংসদীয় স্থায়ী কমিটির গুরুত্বপূর্ণ সভাপতি পদ বিরোধী দলকে আনুপাতিক হারে প্রদান।

এছাড়া রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদর্শনের বিধান সংশোধন, হাইকোর্টের বিকেন্দ্রীকরণ এবং একটি নির্বাচক কমিটির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন গঠনের বিষয়েও ঐকমত্য হয়েছে। কোনো ব্যক্তি একইসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ও নিজ দলের প্রধান থাকতে পারবেন না বলেও কমিশন সিদ্ধান্ত জানিয়েছে, যদিও এর সঙ্গে দ্বিমত পোষণকারী দলগুলো ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা আপত্তি জানাতে পারবে।

তবে এত অগ্রগতির পরেও বেশ কিছু মৌলিক বিষয়ে দলগুলো বিভক্ত হয়ে পড়েছে। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগের জন্য একটি সমন্বিত কমিটি গঠনের প্রস্তাবে বিএনপি জোরালো আপত্তি জানিয়ে বলেছে, এতে সরকার দুর্বল হবে। নারীদের জন্য সংরক্ষিত ১০০ আসনে সরাসরি ভোট, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের উচ্চকক্ষের নির্বাচন পদ্ধতি এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পদ্ধতি নিয়েও মতভিন্নতা রয়ে গেছে।

সবচেয়ে তীব্র মতভেদ দেখা দিয়েছে রাষ্ট্রের মূলনীতি নিয়ে। এ নিয়ে বৈঠকে উত্তেজনাও তৈরি হয়। বামপন্থী দলগুলো বাহাত্তরের সংবিধানের চার মূলনীতি বহাল রাখার পক্ষে, অন্যদিকে বিএনপি ও জামায়াতসহ ডানপন্থী দলগুলো এর সঙ্গে ‘আল্লাহর ওপর অবিচল আস্থা ও বিশ্বাস’ যুক্ত করতে চায়। নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনে সব দল একমত হলেও এর গঠনপ্রক্রিয়া নিয়ে বিএনপি ও জামায়াতের সঙ্গে এনসিপিসহ অন্য দলগুলোর প্রস্তাবনায় পার্থক্য রয়েছে।

কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা চলবে এবং যেকোনোভাবে ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে আলোচনা শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কোনো বিষয়ে চূড়ান্ত ঐকমত্য না হলে, সংশ্লিষ্ট দলগুলো তাদের আপত্তি বা ‘নোট অব ডিসেন্ট’ উল্লেখ করেই চূড়ান্ত ‘জুলাই সনদে’ স্বাক্ষর করতে পারবে।