
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা মামলার অর্ধেকেরও বেশি আসামি আদালত থেকে খালাস পেয়ে যাচ্ছেন, যা সংস্থাটির কার্যক্রমের কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। দুদকের ২০২৪ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই বছর নিষ্পত্তি হওয়া দুর্নীতির মামলার ৫৩ শতাংশ আসামিই খালাস পেয়েছেন। দুর্বল অনুসন্ধান ও তদন্ত, প্রসিকিউশনের গাফিলতি এবং জবাবদিহিতার অভাবকে এর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন বিশেষজ্ঞরা।
দুদকের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালে ২৯৫টি মামলার বিচারকাজ শেষ হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ১৩৮টি মামলায় আসামিদের সাজা হয়েছে, যা মোট মামলার ৪৭ শতাংশেরও কম। বিপরীতে, ১১৬টি মামলায় সরাসরি খালাস এবং ৪১টি মামলা ‘অন্যভাবে’ নিষ্পত্তি হওয়ায় মোট ১৫৭টি মামলার আসামিরা দুর্নীতির অভিযোগ থেকে রেহাই পেয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিপুল সংখ্যক খালাসের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। দুদকের সাবেক মহাপরিচালক মো. মইদুল ইসলাম বলছেন, দুদকের অধিকাংশ অভিযোগের উৎস সাধারণ মানুষ, নিজস্ব গোয়েন্দা সংস্থা নয়। এর ফলে ব্যক্তিগত শত্রুতা বা হয়রানির উদ্দেশ্যে বহু ভিত্তিহীন অভিযোগ জমা পড়ে, যা যাচাই-বাছাই না করেই অনুসন্ধানে গৃহীত হয়। দুর্বল অনুসন্ধানের ভিত্তিতে মামলা দায়ের হওয়ায় তদন্তের মানও ভালো হয় না এবং শেষ পর্যন্ত আদালতে গিয়ে তা টেকে না।
তিনি আরও বলেন, “এটি দুর্ভাগ্যজনক যে এত পরিমাণ অনুসন্ধান ও তদন্ত পরিসমাপ্তি হচ্ছে, যা দুদকের সময় ও শক্তি এবং রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়। তদন্তকারী কর্মকর্তাদের ব্যর্থতার জন্য তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা হয় না।”
তদন্তের দুর্বলতার পাশাপাশি আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে ইচ্ছাকৃতভাবে মামলায় ফাঁকফোকর রাখার অভিযোগও রয়েছে দুদকের কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুদকের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, কিছু কর্মকর্তার অনুসন্ধান ও তদন্ত কাজে দুর্বলতা রয়েছে এবং কেউ কেউ আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে আসামিদের পার পেতে সাহায্য করেন।
আদালতে মামলা প্রমাণের ব্যর্থতার জন্য দুদকের আইনজীবী বা পাবলিক প্রসিকিউটরদের গাফিলতিকেও দায়ী করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে সাক্ষীদের সঠিকভাবে উপস্থাপন বা জোরালো যুক্তি-তর্ক তুলে ধরতে না পারায় আসামিরা খালাস পেয়ে যান।
এছাড়া বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতাকেও একটি বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন দুদকের বর্তমান মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন। তিনি বলেন, “কোনো কোনো মামলার বিচার শেষ হতে সাত-আট বছর লেগে যায়। এই দীর্ঘ সময়ে সাক্ষী ও তথ্য-প্রমাণ দিয়ে অভিযোগ প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।”
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বিশেষজ্ঞরা দুদকের নিজস্ব গোয়েন্দা ইউনিটকে শক্তিশালী করা, অনুসন্ধান ও তদন্ত পর্যায়ে কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, প্রসিকিউটরদের গাফিলতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং দুদকের জন্য একটি স্বতন্ত্র প্রসিকিউশন ইউনিট গঠনের ওপর জোর দিয়েছেন। তাদের মতে, ছোটখাটো ও ভিত্তিহীন অভিযোগের পেছনে সময় নষ্ট না করে বড় বড় দুর্নীতির দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত দুদকের।