
ফেসবুকে ঘুরছে হৃদয়বিদারক এক গল্প। হতদরিদ্র এক রিকশাচালকের চোখ থেকে চিবুক পর্যন্ত ছেয়ে গেছে কালচে রঙের গোটা গোটা মাংসপিণ্ডে। এই মাংসপিণ্ডের ভারে তিনি চোখে দেখতে পান না, শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, এমনকি আত্মীয়স্বজনও তাকে চিনতে পারেন না। মুখের এই ভয়াবহ বিকৃতির কারণে তার দৈনন্দিন কাজকর্ম বন্ধ। পরিবারে অসুস্থ মা-সহ পাঁচ সদস্যের মধ্যে তিনিই ছিলেন একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। এখন তার ছোট ভাই, স্ত্রী ও মেয়ে চিকিৎসার টাকার জন্য ঘুরছেন মানুষের দুয়ারে। শুধুমাত্র টাকার অভাবে পরিবারের পক্ষে তার চিকিৎসা করানো সম্ভব হচ্ছে না। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী, ব্যাটারির অ্যাসিডে দগ্ধ এই ব্যক্তির সার্জারি দ্রুত না করালে অবস্থা আরও ভয়াবহ হবে এবং চিকিৎসার জন্য প্রায় ৫ লাখ টাকা প্রয়োজন।
এমন আবেগঘন বিবরণ ও ব্যক্তির বিরল রোগের ছবি দেখে যে-কেউ মুহূর্তেই দয়াপরবশ হয়ে পড়বেন। বুকের ভেতর থেকে উথলে ওঠা সহানুভূতি নিয়ে সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসবেন অনেক সহৃদয় ব্যক্তি। কিন্তু অনুসন্ধানী প্রতিবেদকের চোখে প্রশ্ন জাগে—এই মানুষটি আসলে কে? পোস্টে নাম দেওয়া হয়েছে মো. মনিরুল ইসলাম, বাড়ি নোয়াখালী। কিন্তু সত্যিই কি এই ব্যক্তি সাহায্যপ্রার্থী?
না। সত্য হলো—ছবির মানুষটি মনিরুল ইসলাম নন এবং পোস্টে যে গল্পটি লেখা হয়েছে, তাও সম্পূর্ণ মিথ্যা।
গত ৩১ জুলাই ২০ হাজার ফলোয়ার ও ১৫ হাজার লাইক সংবলিত ‘Backbancher BD’ নামক একটি ফেসবুক পেজ থেকে পোস্টটি দেওয়া হয়। ‘দয়া করে কেউ এড়িয়ে যাবেন না’ শিরোনামে দেওয়া পোস্টটি এ পর্যন্ত ৭১ হাজার লাইক, ৪ হাজার ৬০০ মন্তব্য ও ৩১ হাজার শেয়ার হয়েছে। পোস্টে সাহায্যের জন্য মনিরুল ইসলামের ছোট ভাই বাদল মিয়ার বিকাশ, নগদ ও রকেট পার্সোনাল নম্বর (০১৯৫৩২৬৯৩০১) দেওয়া হয়েছে। এই নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে প্রতিবারই সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।
যেভাবে প্রতারণা ধরা পড়ে
২০২১ সালের ২৬ অক্টোবর একই ছবি ব্যবহার করে ‘ফাতেমা’ নামের একটি ফেসবুক আইডি থেকে লক্ষাধিক সদস্যের পাবলিক গ্রুপ ‘চাকরির খবর’-এ একটি পোস্ট দেওয়া হয়েছিল। তখন অনুসন্ধানে জানা যায়, মো. মনিরুল ইসলাম নামে বিরল রোগে আক্রান্ত এমন কোনো রোগীর অস্তিত্ব বাংলাদেশে নেই। দেশের মূলধারার সংবাদমাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এমন কোনো ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।
একপর্যায়ে প্রযুক্তির সহায়তায় পোস্টে দেওয়া ছবিটির প্রকৃত উৎস খুঁজে পাওয়া যায়। জানা যায়, এটি বাংলাদেশের নয়, বরং ভারতের একটি ঘটনা। এরপর একে একে হাতে আসে চিকিৎসা সংক্রান্ত বিভিন্ন ল্যাব রিপোর্ট, হাসপাতালে ভর্তি ও ছাড় পাওয়ার তথ্য এবং জানা যায় ছবিটির ব্যক্তির আসল পরিচয়।
অনুসন্ধানে উঠে আসে—ছবির ব্যক্তিটি ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের বাসিন্দা রবি কুমার (৪০), পেশায় একজন ট্যাক্সিচালক। ২০১৭ সালের শুরুর দিকে মুখে ও ঠোঁটে অস্বাভাবিকভাবে মাংসপিণ্ড বেড়ে যাওয়ায় তিনি চিকিৎসা নিতে যান তামিলনাড়ুর রিচার্ডসন ডেন্টাল এবং ক্র্যানিওফেসিয়াল হাসপাতালের বিখ্যাত ম্যাক্সিলোফেসিয়াল সার্জন ডা. সুনীল রিচার্ডসনের কাছে।
অস্ত্রোপচারের জন্য প্রয়োজন ছিল প্রায় ১৭ লাখ রুপি, যা বহন করা ট্যাক্সিচালক রবি কুমারের পরিবারের পক্ষে অসম্ভব ছিল। এ অবস্থায় ডা. সুনীল রিচার্ডসন নিজেই রবি কুমারের চিকিৎসার জন্য তহবিল সংগ্রহের উদ্যোগ নেন। এর জন্য তিনি ভারতের নির্ভরযোগ্য অনলাইন ক্রাউডফান্ডিং প্ল্যাটফর্ম ‘কিটো’ (Ketto)-তে একটি আবেদন জানান।
কিটো’র ওয়েবসাইটে দেখা যায়, ২০১৭ সালের ৩ জুন রবি কুমারের জন্য তহবিল সংগ্রহের কাজ শেষ হয়। ৯৭৯ জন দাতা তহবিলে ১৭ লাখ রুপি অনুদান দেন। এর এক মাস পর রবি কুমারের মুখে সফল অস্ত্রোপচার হয়। মুখ থেকে অতিরিক্ত মাংসপিণ্ড বাদ দেওয়ায় রবি কুমার এখন সম্পূর্ণ সুস্থ।
রবি কুমারের সর্বশেষ অবস্থা জানতে ডা. সুনীল রিচার্ডসনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “রবি কুমার পুরোপুরি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন।”
পুরনো প্রতারণার নতুন রূপ
রবি কুমার ২০২১ সালের জুলাই মাসে সুস্থ হলেও তাকে বাংলাদেশের নোয়াখালীর ‘মনিরুল ইসলাম’ সাজিয়ে অর্থ সংগ্রহের বিষয়টি তৎকালীন নোয়াখালীর জেলা পুলিশ সুপার মো. শহীদুল ইসলামকে জানানো হয়েছিল। তিনি বিষয়টি তদন্তের আশ্বাসও দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই প্রতারক চক্র আর থেমে থাকেনি।
পাঁচ বছর পর, এ বছরের জুলাই মাসে নতুন করে একই প্রতারণা শুরু হয়েছে। একই ছবি ফিরে এসেছে নতুন পোস্টে, নতুন নামে ও নতুন ‘আবেগঘন গল্প’ নিয়ে।
* ২০২১ সালের প্রতারণায় ব্যবহৃত নম্বরটি ছিল ০১৮৫২২৯২৮৫৬ এবং পোস্ট করা হতো ‘ফাতেমা’ নামের আইডি থেকে।
* ২০২৫ সালের প্রতারণায় ব্যবহৃত নম্বরটি ০১৯৫৩২৬৯৩০১ এবং পোস্ট করা হচ্ছে ‘Backbancher BD’ নামক পেজ থেকে।
অধিকতর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শুধু ‘Backbancher BD’-ই নয়, ‘R Rajel’, ‘নবীর পথে’, ‘উজিরপুরী মিডিয়া’সহ অন্তত ১০টিরও বেশি ভুয়া পেজ ও প্রোফাইল থেকে একই ছবি ব্যবহার করে সাহায্যের আবেদন করা হচ্ছে। এসব পোস্ট লাখ লাখ শেয়ারের মাধ্যমে একদিকে অনলাইন থেকে ডলার আয় করা হচ্ছে, অন্যদিকে সহানুভূতির ফাঁদে ফেলে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে লাখ লাখ টাকা।
‘Backbancher BD’ পেজটি ঘেঁটে দেখা যায়, এটি ২০২৪ সালের অক্টোবরে খোলা হয়। শুরুতে ইসলামী ভাবধারার পোস্ট দিয়ে বিশ্বস্ততা অর্জন করে পরে প্রতারণা শুরু করা হয়। এই পেজে বিভিন্ন বয়সী রোগীর ছবি ব্যবহার করে শত শত সাহায্যের পোস্ট রয়েছে, যার বেশিরভাগ ছবিই ভারতের ক্রাউডফান্ডিং প্ল্যাটফর্ম ‘কিটো’ থেকে নেওয়া।
প্রতারক চক্র কি থেমেছিল?
বাস্তবতা হলো, চক্রটি থামেনি বরং সময় নিয়ে নতুন আঙ্গিকে, ভিন্ন নাম-পরিচয়ে আরও ধূর্তভাবে ফিরে এসেছে। প্রযুক্তিকে ঢাল ও আবেগকে অস্ত্র বানিয়ে তারা ছড়িয়ে দিচ্ছে সেই পুরনো ফাঁদ। ফলে প্রশ্ন থেকেই যায়—এই চক্র কি আদৌ থেমেছিল, নাকি কেবল ছায়া বদলেছে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফেসবুকে এ ধরনের সাহায্যের পোস্টে টাকা পাঠানোর আগে সাধারণ মানুষের উচিত তথ্য যাচাই করা। যাচাই ছাড়া দান করলে তা প্রতারকদের হাতেই পৌঁছানোর ঝুঁকি থাকে। বিশেষ করে যেসব পোস্টে ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে সাহায্য চাওয়া হয়, সেগুলোর প্রতি সতর্ক থাকা জরুরি।
প্রতারণা রোধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কর্তৃপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা। একইসঙ্গে নাগরিকদের উচিত পুরোনো খবর ও ফ্যাক্টচেক রিপোর্টগুলো খুঁজে দেখে প্রতারণার কৌশল সম্পর্কে সচেতন হওয়া। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা না নিলে একই ফাঁদে বারবার পড়তে হবে সাধারণ মানুষকে।