
নৌ ও সড়কপথের দীর্ঘদিনের নির্ভরতা পেছনে ফেলে পাইপলাইনের মাধ্যমে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় জ্বালানি তেল সরবরাহের যুগে প্রবেশ করল বাংলাদেশ। শনিবার সকালে চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই যুগান্তকারী প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়।
এর মধ্য দিয়ে দেশের জ্বালানি পরিবহন খাতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হলো, যা কেবল সময় ও অর্থই সাশ্রয় করবে না, বরং নিশ্চিত করবে নিরবচ্ছিন্ন ও পরিবেশবান্ধব সরবরাহ ব্যবস্থা।
শনিবার বেলা ১১টায় পতেঙ্গায় পদ্মা অয়েলের ডেসপাস টার্মিনালে এই কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) অধীনে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড।
প্রকল্প পরিচালক আমিনুল হক জানান, বছরে প্রায় ২৭ লাখ টন ডিজেল পরিবহনের ক্ষমতা সম্পন্ন এই পাইপলাইনটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় একটি মাইলফলক। তিনি বলেন, “আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের আগে আমরা টানা দেড় মাস পরীক্ষামূলকভাবে সরবরাহ চালিয়েছি। এতে কোনো ধরনের কারিগরি ত্রুটি পাওয়া যায়নি, যা আমাদের আত্মবিশ্বাসী করেছে।”
খরচ কমবে, বাড়বে সক্ষমতা
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এতদিন চট্টগ্রাম থেকে নদীপথে নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল ও ফতুল্লা ডিপোতে তেল আনা হতো। এরপর সেখান থেকে সড়কপথে ট্যাংকলরিতে করে ঢাকায় সরবরাহ করা হতো, যা ছিল সময়সাপেক্ষ, ব্যয়বহুল এবং ঝুঁকিপূর্ণ।
পাইপলাইন স্থাপনের ফলে এই বিপুল পরিমাণ খরচ বেঁচে যাবে। প্রকল্প পরিচালক আমিনুল হক বলেন, “বর্তমানে নৌ ও সড়কপথে ডিজেল পরিবহনে যে খরচ হচ্ছে, তার চেয়ে অনেক কমে পাইপলাইনে জ্বালানি পরিবহন করা সম্ভব হবে। সব ধরনের রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালন ব্যয় বাদ দিয়েও বছরে অন্তত ২৩৬ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে।”
প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, এই পাইপলাইন থেকে বছরে আয় হবে প্রায় ৩২৬ কোটি টাকা এবং পরিচালন ব্যয় হবে ৯০ কোটি টাকা। ধারণা করা হচ্ছে, প্রকল্পের মোট নির্মাণ ব্যয় আগামী ১৬ বছরের মধ্যেই উঠে আসবে।
দুর্যোগেও সচল থাকবে সরবরাহ
পাইপলাইনের অন্যতম বড় সুবিধা হলো, যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা প্রতিকূল আবহাওয়ায় জ্বালানি সরবরাহ সচল রাখা সম্ভব হবে। আমিনুল হক বলেন, “এই প্রকল্পের মাধ্যমে শুধু দ্রুত গতিতে তেল পরিবহনই নয়, বরং বর্ষা, বন্যা বা ঘূর্ণিঝড়ের মতো দুর্যোগেও ঢাকায় জ্বালানির সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখা যাবে। এতে পরিবেশ দূষণ এবং ‘সিস্টেম লস’ও কার্যকরভাবে রোধ করা সম্ভব হবে।”
একনজরে প্রকল্প
২০১৬ সালে গৃহীত হলেও প্রকল্পটির নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৮ সালে। তিন দফা মেয়াদ বাড়ানোর পর চলতি বছরের মার্চে এর কাজ শেষ হয়। চট্টগ্রামের পতেঙ্গা থেকে ফেনী, কুমিল্লা, চাঁদপুর ও মুন্সীগঞ্জ হয়ে নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল ডিপো পর্যন্ত বিস্তৃত এই পাইপলাইন।
প্রাথমিকভাবে প্রকল্পের ব্যয় ২ হাজার ৮৬১ কোটি টাকা ধরা হলেও কয়েক ধাপে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৩ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকায়। ২২ জুন থেকে পরীক্ষামূলক সরবরাহ শুরু হয়ে ৪ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ৪ কোটি ৮২ লাখ লিটার ডিজেল সফলভাবে পরিবহন করা হয়েছে।