শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

জাতীয় রাজনীতির সমীকরণে নতুন অশনি সংকেত?

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ৮:৩৬ অপরাহ্ন


গণ-অভ্যুত্থানের পর এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে বাংলাদেশ। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচনের প্রত্যাশায় যখন পুরো দেশ, ঠিক তখনই রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন এক ঝড়ের সৃষ্টি করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনের ফলাফল। প্রায় ছয় বছর পর, গত ৯ সেপ্টেম্বর সম্পূর্ণ নতুন এক রাজনৈতিক বাস্তবতায় অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনের ফল শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনাতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং জাতীয় রাজনীতির গতিপথেও এক গভীর ও সুদূরপ্রসারী আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নির্বাচনে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির-সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’-এর অভাবনীয় বিজয় এবং বিএনপির ছাত্রসংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের শোচনীয় পরাজয় আগামী দিনের রাজনীতির জন্য কী বার্তা দিচ্ছে, তা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।

ডাকসু নির্বাচনের ফলাফলকে শুধু চমক বললে কম বলা হবে। এটি ছিল এককথায় রাজনৈতিক ভূমিকম্প। কেন্দ্রীয় সংসদের ২৮টি পদের মধ্যে সহ-সভাপতি (ভিপি), সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এবং সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস)-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদসহ মোট ২৩টি পদেই জয়লাভ করেছে শিবির-সমর্থিত প্যানেল। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অতীতে ডাকসুতে ছাত্রশিবির কখনো প্রকাশ্যে পূর্ণাঙ্গ প্যানেল দেওয়ার সাহস বা সুযোগ পায়নি, কেন্দ্রীয় পদে জয়লাভ তো দূরের কথা। সেই শিবির যখন এমন ভূমিধস বিজয় অর্জন করে, তখন তা প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য এক বড়সড় ধাক্কা হিসেবেই প্রতিভাত হয়।

অন্যদিকে, গণ-অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতার অন্যতম দাবিদার হিসেবে বিবেচিত বিএনপির জন্য এই ফলাফল ছিল এক চরম বিব্রতকর বাস্তবতা। তাদের ছাত্রসংগঠন ছাত্রদল একটি পদেও জয়লাভ করতে পারেনি। এই ভরাডুবি দলটির তৃণমূল পর্যায়ের সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং তরুণ প্রজন্মের সাথে তাদের দূরত্বের বিষয়টিকেই যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে।

ডাকসুতে শিবিরের এই ঐতিহাসিক বিজয় আকস্মিক কোনো ঘটনা নয়, বরং এর পেছনে ছিল দীর্ঘমেয়াদী, সুশৃঙ্খল ও কৌশলগত পরিকল্পনা। যেখানে ছাত্রদলের মতো সংগঠনগুলো তফসিল ঘোষণার আগেও ভিপি-জিএস প্রার্থী চূড়ান্ত করতে পারেনি, সেখানে ছাত্রশিবির প্রায় ছয় মাস আগে থেকেই তাদের সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম শিক্ষার্থীদের মাঝে পরিচিত করে তোলে। তাদের নির্বাচনী কৌশল ছিল বহুমাত্রিক:

১. অন্তর্ভুক্তিমূলক প্যানেল: নিজেদের রক্ষণশীল ছাত্রসংগঠনের পরিচিতি থেকে বেরিয়ে আসতে তারা প্যানেলকে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ করার চেষ্টা করে। প্যানেলে চারজন ছাত্রী এবং চাকমা সম্প্রদায়ের একজন শিক্ষার্থীকে স্থান দিয়ে তারা একটি সর্বজনীন বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করে। সংবাদ সম্মেলনে হিজাব পরিহিত এবং হিজাববিহীন উভয় ধরনের নারী প্রার্থীদের উপস্থিতি তাদের কৌশলগত বিচক্ষণতার পরিচয় দেয়।

২. হলের রাজনীতিতে কৌশলগত অবস্থান: জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে অপরাজনীতির বিরুদ্ধে সাধারণ শিক্ষার্থীরা সোচ্চার, তখনও শিবির কৌশলগতভাবে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে গেছে। তারা সরাসরি রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার না করে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন প্রয়োজন ও কার্যক্রমে যুক্ত থেকে একটি ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করেছে, যা নির্বাচনের মাঠে তাদের জন্য উর্বর ক্ষেত্র প্রস্তুত করে।

৩. “ট্যাগিং” রাজনীতির বিরুদ্ধে প্রচারণা: অতীতে শিবিরকে কোণঠাসা করার জন্য যে ‘ট্যাগিং’ বা নেতিবাচক প্রচারণার রাজনীতি প্রচলিত ছিল, সাধারণ শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ যে তা পছন্দ করে না, এই বাস্তবতাটি তারা কাজে লাগিয়েছে। হল ও ক্যাম্পাসকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার পক্ষে তাদের জোরালো প্রচারণা শিক্ষার্থীদের সমর্থন আদায়ে বড় ভূমিকা রেখেছে।

ডাকসু নির্বাচনের এই ফলাফল জাতীয় রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে বিশ্লেষক ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন মত পাওয়া যাচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমানের মতে, এই ফলের একটি বড় প্রভাব জাতীয় রাজনীতিতে পড়বে। তিনি মনে করেন, “এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জামায়াতে ইসলামী জাতীয় রাজনীতিতে একটি সুবিধাজনক অবস্থানে চলে গেছে এবং নির্বাচনী প্রচারে তারা অনেকটাই এগিয়ে গেল। অন্যদিকে, বিএনপি যে সাংগঠনিকভাবে অত্যন্ত দুর্বল, তা জাতির সামনে উন্মোচিত হয়ে গেল।”

এই মতের সাথে একমত নন বিএনপি ও অন্যান্য অনেক দলের নেতারা। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ মনে করেন, ডাকসুর নেতৃত্ব জাতীয় রাজনীতিতে তেমন প্রভাব ফেলতে পারে না, যদি না তারা কোনো বৃহৎ রাজনৈতিক দলের অংশ হয়। তার মতে, অতীতেও ডাকসুর অনেক নেতাই জাতীয় রাজনীতিতে হারিয়ে গেছেন। একইভাবে, নবগঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক সরোয়ার তুষারও মনে করেন, এই ফল জাতীয় নির্বাচনে সরাসরি প্রভাব ফেলবে না, তবে বিজয়ীদের সাংগঠনিক মনোবল নিঃসন্দেহে চাঙা হবে।

বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হকের বিশ্লেষণ আরও গভীর। তিনি এই ফলাফলকে জাতীয় নির্বাচনের প্রতিচ্ছবি মনে না করলেও এর পেছনের কারণ হিসেবে গত ১৫ বছরে আওয়ামী লীগের তৈরি করা রাজনৈতিক জমিনকে দায়ী করেছেন। তার মতে, “তরুণ প্রজন্মের মনস্তাত্ত্বিক জগতে বড় পরিবর্তন এসেছে। তাদের আকাঙ্ক্ষার সাথে বিএনপি-সহ প্রগতিশীল দলগুলোর যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, তা উপলব্ধি করা জরুরি।”

বড় দলগুলোর জন্য অশনি সংকেত?

রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী হাসনাত কাইয়ুম ডাকসুর ফলাফলকে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে তরুণ প্রজন্মের ‘হতাশা ও ক্ষোভের প্রকাশ’ হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, “এখান থেকে রাজনৈতিক শিক্ষা গ্রহণ করতে না পারলে, জনগণের এই ক্ষোভকে বিবেচনায় না নিলে, জাতীয় রাজনীতিতেও বড় দলগুলোর জন্য এমন ভরাডুবির আশঙ্কা রয়েছে।” বিশ্লেষকদের বড় একটি অংশ মনে করছেন, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ এবং ক্ষমতায় যেতে আগ্রহী বিএনপির প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়েই শিক্ষার্থীরা হয়তো পরীক্ষামূলকভাবে একটি নতুন, সুসংগঠিত শক্তিকে বেছে নিয়েছে। এই প্রবণতা যদি অব্যাহত থাকে, তবে তা জাতীয় রাজনীতিতে ডানপন্থার উত্থানকে আরও ত্বরান্বিত করতে পারে।

জামায়াতে ইসলামী এই ফলাফলকে অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে দেখছে। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের মতে, “এর মাধ্যমে একটি নতুন সংস্কৃতির উন্মেষ ঘটেছে। শিক্ষার্থীরা প্রমাণ করেছে যে তারা সহিংসতা, সন্ত্রাস ও পেশিশক্তির পরিবর্তে সৎ, চরিত্রবান ও ছাত্রবান্ধব নেতৃত্ব চায়।” জামায়াত আশা করছে, জাতীয় নির্বাচনেও এই সংস্কৃতির প্রতিফলন ঘটবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডাকসু নির্বাচন কোনো জাতীয় নির্বাচনের মাপকাঠি না হলেও এটি নিঃসন্দেহে দেশের রাজনৈতিক আবহাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যারোমিটার। এই ফলাফল প্রমাণ করে যে, গণ-অভ্যুত্থানের পর তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক চিন্তাধারায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। তারা প্রচলিত বড় দলগুলোর ওপর আস্থা হারাচ্ছে এবং বিকল্প খুঁজছে। ছাত্রশিবিরের এই বিজয় কেবল তাদের সাংগঠনিক শক্তির পরিচায়ক নয়, বরং প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যর্থতা এবং তরুণদের সাথে তাদের সংযোগহীনতারও প্রমাণ। জাতীয় নির্বাচনের আগে বিএনপি, আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য প্রগতিশীল দলগুলো যদি এই বার্তা অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়, তবে ডাকসুর এই ‘অশনি সংকেত’ জাতীয় রাজনীতিতেও বাস্তব রূপ নিতে পারে, যা দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণকে পুরোপুরি বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।