
গত বছর বিভিন্ন থানা ও ফাঁড়ি থেকে লুট হওয়া প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার অস্ত্রের মধ্যে এক হাজার ৩৫৩টি এখনও উদ্ধার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। একইসঙ্গে উদ্ধার হয়নি আড়াই লাখের বেশি গোলাবারুদ।
নানা অভিযান ও কৌশল ব্যর্থ হওয়ার পর সম্প্রতি পুরস্কার ঘোষণা করেও তেমন সাড়া না মেলায় আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে এসব অস্ত্র নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, লুট হওয়া এসব অস্ত্র হাতবদল হয়ে শীর্ষ সন্ত্রাসী, জঙ্গি, রাজনৈতিক দলের ক্যাডার ও পেশাদার অপরাধীদের হাতে চলে গেছে। ইতোমধ্যে এসব অস্ত্র ব্যবহার করে খুন, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ৫ আগস্টের পর দেশের ৪৬০টি থানা ও ১১৪টি ফাঁড়ি থেকে মোট ৫ হাজার ৭৫৩টি অস্ত্র এবং প্রায় সাড়ে ছয় লাখ গোলাবারুদ লুট হয়।
এর মধ্যে ৪ হাজার ৪১০টি অস্ত্র এবং প্রায় তিন লাখ ৯৫ হাজার গোলাবারুদ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। তবে এখনও ১ হাজার ৩৫৩টি অস্ত্র এবং ২ লাখ ৫৭ হাজার ৬৫৯টি গোলাবারুদ নিখোঁজ রয়েছে।
উদ্ধার না হওয়া অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে ১১৫টি চায়না রাইফেল, ৩০টি এসএমজি, ৩টি এলএমজি, ২১৪টি পিস্তল, ৪২৪টি শটগান এবং ৭টি টিয়ারগ্যাস লাঞ্চার।
ব্যর্থ অভিযান, মিলছে না সাড়া
অস্ত্র উদ্ধারে গত এক বছরে পুলিশ ও যৌথ বাহিনী একাধিক বিশেষ অভিযান পরিচালনা করলেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। সর্বশেষ গত ২৫ আগস্ট স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে অস্ত্রের ধরন অনুযায়ী ৫০ হাজার থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। তবে তাতেও তেমন সাড়া মেলেনি বলে জানা গেছে।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব অস্ত্র উদ্ধার না হওয়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, “লুট হওয়া অস্ত্রগুলো সমাজের জন্য বড় হুমকি। সামনের নির্বাচনে এগুলোর ব্যাপক ব্যবহার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ছিনতাই, চাঁদাবাজি, দখলবাজিতেও এসব অস্ত্র ব্যবহৃত হচ্ছে। দ্রুত চিরুনি অভিযান পরিচালনা করে এগুলো উদ্ধার করা না গেলে পরিস্থিতির অবনতি ঘটবে।”
অপরাধ জগতে অস্ত্রের ঝনঝনানি
গণ-অভ্যুত্থানের পর কারাগার থেকে বহু শীর্ষ সন্ত্রাসী জামিনে মুক্ত হয়েছে এবং পলাতক রয়েছে আরও অনেকে। কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মোতাহের হোসেন সম্প্রতি জানান, জেল ভাঙার ঘটনায় পালিয়ে যাওয়া ৭০০ বন্দি এখনও পলাতক, যাদের মধ্যে ৬৯ জন জঙ্গি ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। ধারণা করা হচ্ছে, লুট হওয়া অস্ত্রের একটি বড় অংশ এদের হাতে পৌঁছেছে।
এরই মধ্যে বিভিন্ন অপরাধে এসব অস্ত্রের ব্যবহারের প্রমাণও মিলেছে। গত বছরের ৩০ নভেম্বর মুন্সীগঞ্জে শাহিদা আক্তার নামে এক তরুণীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। পরে পুলিশ জানায়, হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত পিস্তলটি ঢাকার ওয়ারী থানা থেকে লুট করা হয়েছিল।
একইভাবে খুলনা ও চট্টগ্রামে লুট হওয়া অস্ত্রসহ একাধিক অপরাধীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ, যারা ছিনতাই-ডাকাতির মতো কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল বলে স্বীকার করে।
এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন জানান, লুট হওয়া অস্ত্রের বড় অংশই উদ্ধার করা হয়েছে। বাকিগুলো উদ্ধারে অভিযান চলছে এবং নির্বাচনের আগে আরও জোরালো পদক্ষেপ নেওয়া হবে।