শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

অস্তিত্ব রক্ষায় এখন প্রয়োজন ‘র‍্যাডিক্যাল কোলাবরেশন’

কুয়ালালামপুরে গ্লোবাল ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম কনফারেন্সে হুঁশিয়ারি ও আশার আলো
শরীফুল রুকন | প্রকাশিতঃ ২২ নভেম্বর ২০২৫ | ৯:০৭ অপরাহ্ন

কুয়ালালামপুর (মালয়েশিয়া) থেকে : বিশ্বজুড়ে সাংবাদিকতা আজ এক অস্তিত্বের সংকটে। একদিকে স্বৈরাচারী সরকার ব্যবস্থা, অন্যদিকে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের অ্যালগরিদমের যাঁতাকলে পিষ্ট সত্য ও তথ্য। এমন এক ক্রান্তিলগ্নে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিত ১৪তম গ্লোবাল ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম কনফারেন্সে (জিআইজেসি২৫) ধ্বনিত হলো এক নতুন যুদ্ধের ডাক।

সম্মেলনের মূল বক্তা, ২০২১ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী ফিলিপাইনের সাংবাদিক মারিয়া রেসা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিলেন, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রক্ষায় আমাদের হাতে সময় খুব কম, হয়তো আর মাত্র এক বছর। এই সংকট মোকাবিলায় তিনি ডাক দিলেন ‘র‍্যাডিক্যাল কোলাবরেশন’ বা আমূল সহযোগিতার।

মারিয়া রেসার কণ্ঠে ছিল সতর্কবাণী ও সাহসের সংমিশ্রণ। র‍্যাপলার-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা মারিয়া রেসা বলেন, একটি শিল্প হিসেবে আমরা যা জানতাম, তার সবকিছুই ধ্বংস হয়ে গেছে। তাই আমাদের এখন থমকে থাকলে চলবে না। এখন সময় আমূল সহযোগিতার। তিনি হুঁশিয়ার করে বলেন, ২০২৬ সালটি স্বাধীন সংবাদমাধ্যমগুলোর জন্য একটি নির্ণায়ক সময় হতে যাচ্ছে। এই এক বছরের মধ্যে যদি আমরা নিজেদের অধিকার, অংশীদারিত্ব এবং নতুন আয়ের মডেল দাঁড় করাতে না পারি, তবে অনেক কিছুই চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাংবাদিকদের উদ্দেশে মারিয়া রেসা বলেন, আপনারা আপনাদের ভালো প্রেস আইনগুলো ধরে রাখুন, পিছিয়ে যাবেন না।

মারিয়া রেসার এই বক্তব্যের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল তাঁর নিজের জীবনের সংগ্রাম থেকে। তিনি ফিলিপাইনের সাবেক প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তের শাসনামলে কীভাবে ১১টি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মাথায় নিয়েও সাংবাদিকতা চালিয়ে গেছেন, সেই অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, যে বছর তাঁর বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা হচ্ছিল, সেই ২০১৯ সালেই তাঁর প্রতিষ্ঠান র‍্যাপলার লাভজনক হয়ে ওঠে।

দর্শকদের করতালির মধ্যে মারিয়া রেসা বলেন, যে ব্যক্তি আমাকে জেলে পাঠাতে চেয়েছিলেন এবং র‍্যাপলার বন্ধ করতে চেয়েছিলেন, সেই দুতার্তে আজ আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের জন্য অভিযুক্ত। অর্থাৎ, আমরা যদি আমাদের কাজ করে যাই এবং ঐক্যবদ্ধ থাকি, তবে বিচারহীনতার সংস্কৃতি শেষ হবেই।

সম্মেলনে কেবল আশার বাণীই নয়, উঠে এসেছে এশীয় সাংবাদিকদের ওপর নেমে আসা ভয়াবহ নির্যাতনের চিত্রও। ‘স্ট্র্যাটেজিস ফর কভারিং এশিয়া ইন আ শ্রিংকিং সিভিক স্পেস’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনায় ইন্দোনেশিয়ার টেম্পো ডিজিটালের সিইও ওয়াহু ধিয়াতমিকা এক লোমহর্ষক অভিজ্ঞতার বর্ণনা দেন।

তিনি জানান, তাঁদের রিপোর্টার ফ্রান্সিসকা ক্রিস্টি রোসানা একটি অনলাইন জুয়া চক্র নিয়ে প্রতিবেদন করার পর অফিসে একটি পার্সেল পান, যার ভেতরে ছিল একটি কাটা শূকরের মাথা। শুধু তাই নয়, এরপর তাঁদের ওয়েবসাইটে ভয়াবহ ডিডোস সাইবার হামলা চালানো হয়।

এই প্যানেলে ভারত থেকে দ্য রিপোর্টার্স কালেক্টিভ ট্রাস্টের ট্রাস্টি ও সম্পাদক মায়াঙ্ক আগরওয়াল, তাইওয়ানের দ্য রিপোর্টার-এর সিওও শেরি লি এবং দক্ষিণ কোরিয়ার নিউজতাপা-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ইয়ংজিন কিম তাঁদের নিজ নিজ দেশের পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেন। প্যানেলটি সঞ্চালনা করেন মালয়েশিয়াকিনির সহ-প্রতিষ্ঠাতা স্টিভেন গান।

দক্ষিণ কোরিয়ার ইয়ংজিন কিম শোনান কীভাবে সাংবাদিকতা ক্ষমতার ভিত নাড়িয়ে দিতে পারে। তিনি জানান, প্রেসিডেন্ট ইউন সুক-ইওল এবং ফার্স্ট লেডি কিম কিওন-হির দুর্নীতির বিরুদ্ধে নিউজতাপা ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এর জেরে তাঁদের নিউজরুমে তল্লাশি চালানো হয় এবং মানহানির মামলা দেওয়া হয়। কিন্তু তাঁরা পিছু হটেননি। তাঁদের এই অদম্য অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাই শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ইউনের পতন ত্বরান্বিত করে এবং তাঁকে অভিশংসনের মুখে ঠেলে দেয়।

অন্যদিকে, আজারবাইজানের আবজাস মিডিয়ার ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক গুনেল সাফারোভা শোনান নির্বাসিত সাংবাদিকতার কষ্টের কথা। তিনি জানান, তাঁর ছয়জন সহকর্মীকে মিথ্যা মামলায় কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। সহকর্মীদের কারাগারে রেখে নির্বাসনে কাজ করা মানসিকভাবে কতটা যন্ত্রণাদায়ক, তা বলতে গিয়ে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তবুও তিনি বলেন, কারাগারে থাকা সহকর্মীদের প্রতি আমাদের ঋণ শোধ করতে হলে সাংবাদিকতা চালিয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই।

ফিলিপাইনের র‍্যাপলার-এর নির্বাহী সম্পাদক গ্লেন্ডা গ্লোরিয়া জানান, কীভাবে সাধারণ নাগরিকদের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তাঁরা বড় বড় দুর্নীতির খবর প্রকাশ করছেন। তিনি বলেন, নাগরিকদের পাঠানো ছবি ও তথ্যের ভিত্তিতে আমরা বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের দুর্নীতি উন্মোচন করেছি। সাংবাদিকতার প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনার এটাই সেরা উপায়।

তাইওয়ানের শেরি লি তুলে ধরেন কীভাবে চীন আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে তাইওয়ানের ওপর ‘গ্রে জোন’ যুদ্ধ বা মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করছে। দ্য রিপোর্টার এবং ওয়াশিংটন পোস্টের যৌথ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে চীন কীভাবে ভুয়া তথ্য ও সামরিক মহড়ার মাধ্যমে তাইওয়ানকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে।

জিআইজেএন-এর নির্বাহী পরিচালক এমিলিয়া দিয়াজ-স্ট্রাক এবং মালয়েশিয়াকিনির সহ-প্রতিষ্ঠাতা প্রেমেশ চন্দ্রন স্বাগত বক্তব্যে জানান, এবারের সম্মেলনে ১৩৫টি দেশ থেকে দেড় হাজারের বেশি সাংবাদিক অংশ নিয়েছেন, যা প্রমাণ করে শত প্রতিকূলতার মধ্যেও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা বেঁচে আছে। এমিলিয়া দিয়াজ-স্ট্রাক বলেন, এ বছর এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকা থেকে বক্তার সংখ্যা অনেক বেড়েছে।

গাজায় নিহত সাংবাদিকদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে স্টিভেন গান বলেন, গত এক বছরে গাজায় ২০০-এর বেশি সাংবাদিক নিহত হয়েছেন, যা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর যেকোনো যুদ্ধের চেয়ে বেশি। তিনি বলেন, তাঁদের আত্মত্যাগ আমাদের সত্য প্রকাশের অনুপ্রেরণা জোগাবে।

মারিয়া রেসা তাঁর বক্তব্যের শেষে প্রযুক্তির অপব্যবহার নিয়ে সতর্ক করেন। তিনি বলেন, আমাদের শত্রু কোনো সরকার নয়, আমাদের শত্রু সেই প্রযুক্তি যা সমাজের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে এবং মিথ্যার স্বাভাবিকীকরণ করেছে। তিনি নারী সাংবাদিকদের অনলাইনে হেনস্তার ভয়াবহ পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেন, ৭৩ শতাংশ নারী সাংবাদিক অনলাইনে আক্রমণের শিকার হন।

কুয়ালালামপুরের এই সম্মেলনে উপস্থিত সাংবাদিকরা এক ফ্রেমে বন্দি হয়ে সংহতি প্রকাশ করেন। মারিয়া রেসার সেই ‘র‍্যাডিক্যাল কোলাবরেশন’ বা আমূল সহযোগিতার ডাক এখন বিশ্বজুড়েই সাংবাদিকদের মূলমন্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগামী এক বছর বা তার পরবর্তী সময়গুলোতে সাংবাদিকতা টিকে থাকবে কি না, তা নির্ভর করছে আমরা কতটা ঐক্যবদ্ধ হতে পারছি তার ওপর। প্রযুক্তির আগ্রাসন আর স্বৈরাচারের চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে সত্য প্রকাশে অবিচল থাকাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।