শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

কুয়ালালামপুর ডায়েরি: সাংবাদিকতার ‘গেম চেঞ্জার’ যখন স্যাটেলাইট

শরীফুল রুকন | প্রকাশিতঃ ২২ নভেম্বর ২০২৫ | ১০:৩৪ অপরাহ্ন


কুয়ালালামপুর (মালয়েশিয়া) থেকে : খালি চোখে যা দেখা যায় না, কিংবা সরকার ও প্রভাবশালীরা যা সাধারণ মানুষের চোখ থেকে আড়াল করতে চায়—তা দেখার জন্য এখন সাংবাদিকদের হাতে আছে এক জাদুকরী লেন্স। সেই লেন্সের অবস্থান পৃথিবীতে নয়, পৃথিবী থেকে কয়েক শ মাইল ওপরে মহাকাশে। বলছিলাম স্যাটেলাইট ইমেজের কথা।

কুয়ালালামপুরে চলমান ১৪তম বিশ্ব অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা সম্মেলনের (জিআইজেসি২৫) শনিবারের (২২ নভেম্বর) অন্যতম আকর্ষণ ছিল ‘স্যাটেলাইট ইমেজার ফর ইনভেস্টিগেশনস: হ্যান্ডস-অন ওয়ার্কশপ’। কুয়ালালামপুর কনভেনশন সেন্টারের তিন তলার ৩০৩ নম্বর কক্ষে তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্টার্স অ্যান্ড এডিটরস’ (আইআরই)-এর ট্রেনিং ডিরেক্টর লরা কার্টজবার্গ হাতে-কলমে দেখালেন কীভাবে বিনা পয়সায় মহাকাশ থেকে পৃথিবীর বুকে ঘটে যাওয়া অন্যায় ও অসঙ্গতি খুঁজে বের করা যায়।

যুদ্ধ, পরিবেশ ও দুর্নীতির সাক্ষী

লরা কার্টজবার্গ যখন প্রজেক্টরে ইউক্রেন সীমান্তে রাশিয়ান সামরিক বাহিনীর সমাগমের ছবি দেখাচ্ছিলেন, তখন পুরো হলরুম স্তম্ভিত। তিনি বলেন, স্যাটেলাইট ইমেজ সাংবাদিকতার জন্য একটি ‘গেম চেঞ্জার’। এটি কেবল যুদ্ধের ক্ষত বা পরিবেশগত বিপর্যয় দেখায় না, এটি এমন সব প্রামাণিক দলিল দেয় যা কেউ অস্বীকার করতে পারে না।

কর্মশালায় উঠে আসে বাজফিড নিউজের একটি চাঞ্চল্যকর অনুসন্ধানের কথা। চীনে উইঘুরদের জন্য তৈরি গোপন ইন্টার্নমেন্ট ক্যাম্প বা বন্দিশিবিরগুলো কীভাবে স্যাটেলাইট ইমেজের মাধ্যমে শনাক্ত করা হয়েছিল, তা ছিল বিস্ময়কর। মানচিত্রে যে জায়গাগুলো ‘ব্ল্যাঙ্ক’ বা ঝাপসা করে রাখা হয়েছিল, সাংবাদিকরা সেখানেই খুঁজে পেয়েছিলেন লুকিয়ে রাখা সত্য।

অদৃশ্যকে দৃশ্যমান করা

সাধারণত আমরা ভাবি স্যাটেলাইট ইমেজ মানেই ওপর থেকে তোলা সাধারণ ছবি। কিন্তু লরা দেখালেন ‘ফলস কালার’ (False Color) প্রযুক্তির ব্যবহার। এর মাধ্যমে খালি চোখে দেখা যায় না এমন জিনিসও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যেমন—কোথায় দাবানল হয়েছে, তার ক্ষত বা ‘বার্ন স্কার’ কতটা গভীর, তা লাল রঙের আস্তরণ দিয়ে সহজেই বোঝা যায়।

বলিভিয়ার সংরক্ষিত বনাঞ্চলে মেনোনাইট কলোনি কীভাবে জঙ্গল সাফ করে বসতি গড়ছে এবং নতুন ব্রিজ তৈরি করছে, তার প্রমাণও মিলেছে সেন্টিনেল-২ স্যাটেলাইটের ছবিতে। এমনকি আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের মধ্যপ্রদেশের নর্মদা নদীতে ভাসমান সোলার প্যানেল বা ‘ফ্লোটোভোলটাইকস’ বসানোর ফলে পরিবেশ ও নদীর গতিপথের কী পরিবর্তন হচ্ছে, তাও উঠে এসেছে নাসার ছবিতে।

বিনা পয়সায় মহাকাশ ভ্রমণ

অনেকের ধারণা, স্যাটেলাইট ইমেজ পেতে হলে প্রচুর টাকার প্রয়োজন। এই ধারণা ভুল প্রমাণ করে লরা পরিচয় করিয়ে দিলেন ‘কোপার্নিকাস ব্রাউজার’-এর সঙ্গে। এটি ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির একটি উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্ম, যেখান থেকে সাংবাদিকরা হাই-রেজুলেশন ছবি ডাউনলোড করতে পারেন এবং টাইমলেপস ভিডিও তৈরি করে দেখাতে পারেন একটি এলাকা গত কয়েক বছরে কীভাবে বদলে গেছে।

এ ছাড়া তিনি নাসা আর্থ অবজারভেটরি এবং গুগল আর্থ প্রো ব্যবহারের কৌশল শেখান। তিনি বলেন, সব সময় যে জটিল ইন্টারঅ্যাক্টিভ ম্যাপ তৈরি করতে হবে, তা নয়। ক্যানভা (Canva) বা ফ্লোরিশ (Flourish)-এর মতো সহজ টুল ব্যবহার করে স্ট্যাটিক ম্যাপ বা স্থিরচিত্র দিয়েই শক্তিশালী স্টোরি তৈরি করা সম্ভব, যা পাঠকদের সহজেই আকৃষ্ট করে।

লরা কার্টজবার্গ তাঁর সেশন শেষ করেন একটি শক্তিশালী বার্তা দিয়ে—”ক্ষমতাশীনদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার জন্য মুক্ত গণমাধ্যম অপরিহার্য”। আর সেই জবাবদিহিতা নিশ্চিতে স্যাটেলাইট প্রযুক্তি এখন সাংবাদিকদের হাতের মুঠোয়। কুয়ালালামপুরের এই ওয়ার্কশপ বিশ্বজুড়ে সাংবাদিকদের সেই বার্তাই দিল—সত্য লুকানোর আর কোনো জায়গা নেই, এমনকি আকাশ থেকেও নজর রাখছে সাংবাদিকের চোখ।

স্যাটেলাইট সাংবাদিকতার ৫টি প্রয়োজনীয় টুল

১. কোপার্নিকাস ব্রাউজার (Copernicus Browser): বিনামূল্যে সাম্প্রতিক ও ঐতিহাসিক স্যাটেলাইট ইমেজ ডাউনলোড এবং বিশ্লেষণের জন্য সেরা।

২. নাসা আর্থ অবজারভেটরি (NASA Earth Observatory): জলবায়ু পরিবর্তন, বন্যা ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের হাই-কোয়ালিটি ছবির ভাণ্ডার।

৩. গুগল আর্থ প্রো (Google Earth Pro): ঐতিহাসিক ছবি দেখা এবং থ্রিডি ভিউ পাওয়ার জন্য অত্যন্ত কার্যকর।

৪. ক্যানভা (Canva): স্যাটেলাইট ইমেজের ওপর কিছু লেখা বা ভিডিও তৈরির সহজ টুল।

৫. ফ্লোরিশ (Flourish): তথ্যের ভিজ্যুয়ালাইজেশন এবং ম্যাপ তৈরির জন্য জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম।