শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

কুয়ালালামপুর ডায়েরি: নির্বাচনের ভুয়া খবর রুখতে সাংবাদিকদের নতুন কৌশল

শরীফুল রুকন | প্রকাশিতঃ ২৬ নভেম্বর ২০২৫ | ১:৩১ অপরাহ্ন


কুয়ালালামপুর (মালয়েশিয়া) থেকে ফিরে : পর্দায় খবর পড়ছেন দুই সংবাদ উপস্থাপক। একজনের নাম ‘লা চামা’, অন্যজন ‘এল পানা’। সাবলীল ভঙ্গি, ভেনেজুয়েলান উচ্চারণে নিখুঁত বাচনভঙ্গি। কিন্তু একটু খেয়াল করলেই বোঝা যায়, এরা রক্ত-মাংসের মানুষ নন। এরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর তৈরি অ্যাভাটাস। তবে চমকপ্রদ তথ্য হলো, সাধারণত এআই ব্যবহার করে যেখানে ভুয়া তথ্য বা ‘ডিপফেক’ ছড়ানো হয়, সেখানে এই দুজনকে সৃষ্টি করা হয়েছে ঠিক তার উল্টো কাজের জন্য—ভুয়া তথ্যের বিরুদ্ধে লড়াই করতে।

মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত ১৪তম গ্লোবাল ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম কনফারেন্সে (জিআইজেসি২৫) ‘নির্বাচনী ভুয়া তথ্য প্রচারণার বিরুদ্ধে লড়াই’ শীর্ষক প্যানেলে উঠে আসে এই অভিনব কৌশলের গল্প। লাতিন আমেরিকার অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা নেটওয়ার্ক ‘কানেক্টাস’-এর সৃষ্টি এই দুই এআই চরিত্র ভেনেজুয়েলার ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় সাংবাদিকদের সুরক্ষকবচ হিসেবে কাজ করেছে।

বিষে বিষক্ষয়: গুজবের বিরুদ্ধে এআই-এর ব্যবহার

ভেনেজুয়েলায় প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর শাসনামলে গণমাধ্যমের ওপর চরম দমন-পীড়ন চলছে। সেখানে সত্য খবর প্রকাশ করা সাংবাদিকদের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এই পরিস্থিতিতে কানেক্টাস ‘ভেনেজুয়েলা ভোটা’ এবং ‘লা ওরা দে ভেনেজুয়েলা’ নামে দুটি উদ্যোগ গ্রহণ করে। ১৪টি সংবাদমাধ্যম ও স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান এতে যুক্ত হয়।

কানেক্টাসের পরিচালক কার্লোস এদুয়ার্দো হুয়ের্তাস বলেন, “এআই নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় বিভ্রান্তি ছড়ানোর হাতিয়ার হতে পারে। কিন্তু সাংবাদিকরা যদি উদ্ভাবনী উপায়ে ঐক্যবদ্ধ হন, তবে এই এআই-কেই সাংবাদিকতা রক্ষার কাজে লাগানো সম্ভব।”

যখন রক্ত-মাংসের সাংবাদিকদের পক্ষে ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে সত্য বলা বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, তখন দায়িত্ব নেয় ‘লা চামা’ ও ‘এল পানা’। তারা সরকারি প্রপাগান্ডার বিপরীতে সঠিক তথ্য তুলে ধরে, অথচ কোনো সাংবাদিকের পরিচয় প্রকাশ করতে হয়নি। ফলে সাংবাদিকরা গ্রেপ্তার বা হামলার ঝুঁকি এড়িয়ে সত্য প্রচার করতে পেরেছেন।

ঘানা: নিউজ রুম যখন সিচুয়েশন রুম

শুধু ভেনেজুয়েলা নয়, ভুয়া তথ্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের গল্প শোনা গেল আফ্রিকার দেশ ঘানা থেকেও। দেশটির ২০২৪ সালের নির্বাচনের সময় ‘ফ্যাক্ট-চেক ঘানা’, ‘ঘানা ফ্যাক্ট’ এবং ‘দুবাজা’—এই তিনটি প্রতিষ্ঠান মিলে গড়ে তোলে ‘ঘানা ফ্যাক্ট-চেকিং কোয়ালিশন’।

মিডিয়া ফাউন্ডেশন ফর ওয়েস্ট আফ্রিকার প্রোগ্রাম ম্যানেজার কোয়াকু ক্রোবিয়া আসান্তে প্যানেলে জানান, একা কাজ করার চেয়ে জোটবদ্ধ হওয়াটা ছিল তাদের মূল কৌশল। তিনি বলেন, “আপনি যখন একা একা কাজ করবেন, তখন খুব সামান্যই অর্জন করতে পারবেন। কিন্তু শক্তি এক করলে অনেক বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব।”

এই জোট ঘানার উত্তর ও দক্ষিণ অংশে দুটি ‘মিডিয়া সিচুয়েশন রুম’ তৈরি করে। সেখান থেকে তারা সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্সে (সাবেক টুইটার) সংঘবদ্ধ ভুয়া প্রচার, পুরনো ছবি ও ভিডিওর ব্যবহার এবং মেরূকরণের কন্টেন্টগুলোর ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি চালায় এবং তাৎক্ষণিকভাবে ফ্যাক্ট-চেক রিপোর্ট প্রকাশ করে।

ভারত: শক্তির মহড়া ‘শক্তি’ কালেক্টিভ

নির্বাচনী ভুয়া তথ্যের সুনামি মোকাবিলায় ভারতের উদাহরণও ছিল চমকপ্রদ। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের সময় ভারতে গড়ে ওঠে ‘শক্তি: ইন্ডিয়া ফ্যাক্ট-চেকিং কালেক্টিভ’। এটি ছিল ১০০টিরও বেশি ফ্যাক্ট-চেকার এবং সংবাদ প্রকাশকের একটি বিশাল কনসোর্টিয়াম।

ডেটা লিডস-এর প্রোগ্রাম হেড সোনিয়া ভাস্কর জানান, নির্বাচনের সময় ডিপফেক এবং অনলাইন মিসইনফরমেশন শনাক্ত করতে তারা একযোগে কাজ করেছেন। এই উদ্যোগের ফলে ১০টিরও বেশি ভাষায় ৬,৬০০টিরও বেশি ফ্যাক্ট-চেক রিপোর্ট প্রকাশ ও প্রচার করা হয়। ‘দ্য কুইন্ট’, ‘বিশ্বাস নিউজ’, ‘বুম’, ‘ফ্যাক্টলি’ এবং ‘প্রেস ট্রাস্ট অফ ইন্ডিয়া’র মতো শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এই বিশাল যজ্ঞে নেতৃত্ব দেয়।

প্রযুক্তি নয়, সাংবাদিকতাই আসল হাতিয়ার

সেশনটিতে সঞ্চালনা করেন মেক্সিকোর ‘অ্যানিমেল পলিটিকো’র অনুসন্ধানী সাংবাদিক নায়েলি রোলদান। আলোচনায় উঠে আসে, এআই এবং প্রযুক্তির এই যুগে ভুয়া তথ্য শনাক্ত করার জন্য নানা টুল থাকলেও শেষ পর্যন্ত সাংবাদিকতার মৌলিক দক্ষতাই আসল ভরসা।

সোনিয়া ভাস্কর বলেন, “প্রযুক্তি খুব দ্রুত বদলাচ্ছে, শনাক্তকারী টুলগুলো কেবল তার পিছু নিচ্ছে। এগুলো আমাদের সাহায্য করতে পারে, কিন্তু ভুয়া তথ্য রোধে কোনো জাদুকরী সমাধান বা ‘সিলভার বুলেট’ নেই। দিনশেষে আমাদের সনাতন সাংবাদিকতার দক্ষতার ওপরই নির্ভর করতে হয়।”

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ‘গ্লোবাল রিস্ক রিপোর্ট ২০২৫’ অনুযায়ী, আগামী দুই বছরের জন্য বিশ্বজুড়ে শীর্ষ স্বল্পমেয়াদি ঝুঁকি হলো মিসইনফরমেশন এবং ডিসইনফরমেশন। জিআইজেসি২৫-এর এই সেশনটি প্রমাণ করল, এই ঝুঁকির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্রযুক্তি, সহযোগিতা এবং সাংবাদিকদের উদ্ভাবনী ক্ষমতাই আগামী দিনের পথ দেখাবে। ভেনেজুয়েলার ‘লা চামা’ থেকে ভারতের ‘শক্তি’—সবাই যেন সেই বার্তাই দিয়ে গেল কুয়ালালামপুরের এই বিশ্বমঞ্চে।