শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

কুয়ালালামপুর ডায়েরি: সাংবাদিকতা বাঁচাতে ‘পাবলিক ফান্ড’ প্রয়োজন

শরীফুল রুকন | প্রকাশিতঃ ২৬ নভেম্বর ২০২৫ | ২:৫০ অপরাহ্ন


কুয়ালালামপুর (মালয়েশিয়া) থেকে ফিরে : বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যমগুলো যখন টিকে থাকার লড়াইয়ে বিপর্যস্ত, তখন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ জোসেফ ই. স্টিগলিটজ শোনালেন এক সাহসের বাণী। সাফ জানিয়ে দিলেন, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা কোনো সাধারণ পণ্য নয়, এটি একটি অপরিহার্য ‘পাবলিক গুড’ বা জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট সেবা। তাই একে বাঁচিয়ে রাখতে হলে এখন আর কেবল বিজ্ঞাপনের দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না, প্রয়োজন সরকারি বা পাবলিক ফান্ডের ব্যবস্থা করা। কুয়ালালামপুরে ১৪তম গ্লোবাল ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম কনফারেন্সে (জিআইজেসি২৫) মূল বক্তা হিসেবে তিনি এই বৈপ্লবিক প্রস্তাব দেন।

স্টিগলিটজ বলেন, টেক জায়ান্ট বা প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো সংবাদমাধ্যমের বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ চুরি করে তাদের ব্যবসায়িক মডেল ধসিয়ে দিয়েছে। আর এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এই চুরির মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেবে, যা সংবাদমাধ্যমের অবশিষ্ট আয়ের উৎসটুকুও শেষ করে দিতে পারে। এই চুরির লাগাম টেনে ধরার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, অর্থনীতির নিয়ম অনুযায়ী পাবলিক গুড বা জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট পণ্য কেবল বেসরকারি অর্থায়নের ওপর নির্ভর করে টিকে থাকতে পারে না।

তাঁর মতে, যেহেতু ভালো সাংবাদিকতা থেকে পুরো সমাজ উপকৃত হয়, তাই এর দায়ভার রাষ্ট্রকেও নিতে হবে। তবে সরকারি টাকা নিলে কি স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হবে? এই শঙ্কা দূর করতে স্টিগলিটজ গবেষণার জন্য দেওয়া সরকারি অনুদানের উদাহরণ টানেন। তিনি বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলের আগে যুক্তরাষ্ট্রে এমন স্বাধীন প্রতিষ্ঠান ছিল যারা গবেষণার জন্য সরকারি তহবিল নিরপেক্ষভাবে বণ্টন করত। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার জন্যও ঠিক এমন একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কাঠামো তৈরি করা যেতে পারে, যা সাংবাদিকতাকে বাঁচিয়ে রাখবে।

দক্ষিণ এশিয়া এবং এশিয়ার সাংবাদিকদের জন্য স্টিগলিটজ কিছু সুনির্দিষ্ট স্টোরি আইডিয়া বা অনুসন্ধানের বিষয় বাতলে দেন, যা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি সিলিকন ভ্যালি ব্যাংকের পতনের কারণ উদ্ঘাটনে সাংবাদিকদের ভূমিকার প্রশংসা করে বলেন, সাংবাদিকদের এখন ভারত ও চীনের আর্থিক গতিবিধির দিকে নজর দেওয়া উচিত।

বিশেষ করে তিনি ভারত ও মরিশাসের মধ্যকার লেনদেনের ওপর জোর দেন। স্টিগলিটজ বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় মরিশাস একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ভারত থেকে টাকা মরিশাসে যাচ্ছে এবং আবার ভারতে ফিরে আসছে, যাকে বলা হয় ‘রাউন্ড ট্রিপিং’। এর পেছনের কারণ কী এবং কারা এর সঙ্গে জড়িত, তা অনুসন্ধানের জন্য একটি বড় বিষয় হতে পারে। এ ছাড়া বর্তমানে চীন এবং কেইম্যান আইল্যান্ডসের মধ্যে প্রচুর সন্দেহজনক লেনদেন চলছে, যা সাংবাদিকদের খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

পরামর্শ: অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে কথা বলুন

স্টিগলিটজ সাংবাদিকদের সতর্ক করে বলেন, জটিল অর্থনৈতিক বিষয়গুলো বোঝার জন্য কেবল বিজনেস রিপোর্টারদের ওপর নির্ভর না করাই ভালো। কারণ অনেক সময় বিজনেস রিপোর্টাররা করপোরেট বয়ান বা ‘ভাড়া খাটা পুঁজিবাদের’ বুলি দ্বারা প্রভাবিত থাকতে পারেন। এর বদলে তিনি অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন, যারা ঘটনার গভীরে গিয়ে বিশ্লেষণ করতে পারেন।

লুণ্ঠিত অর্থের ‘সেফ হ্যাভেন’ আসলে কারা?

বক্তৃতার পরের অংশে তিনি বৈশ্বিক আর্থিক কাঠামোর সমালোচনা করেন। স্টিগলিটজ বলেন, আমরা সাধারণত মনে করি দুর্নীতির টাকা অফশোর কোনো দ্বীপে লুকিয়ে রাখা হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, পশ্চিমা বিশ্বের তৈরি করা নিয়মগুলোই উন্নয়নশীল দেশ থেকে সম্পদ পাচারে সহায়তা করছে। তিনি বলেন, আমাদের এমন এক বৈশ্বিক আর্থিক কাঠামো রয়েছে যা মালয়েশিয়া বা মোজাম্বিকের মতো জায়গা থেকে অর্থ বের করে ‘সেফ হ্যাভেন’ বা নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করে। আর এই নিরাপদ আশ্রয় কেবল অফশোর ট্যাক্স প্যারাডাইসগুলোই নয়; বরং খোদ লন্ডন, নিউইয়র্ক এবং ফ্লোরিডাও এর অন্তর্ভুক্ত।

তিনি বলেন, বড় ব্যাংকগুলো দুর্নীতিতে সহায়তা করছে এবং ধরা পড়লে সামান্য শাস্তি দিয়েই পার পেয়ে যাচ্ছে। পশ্চিমা ব্যাংকগুলো যদি কেইম্যান আইল্যান্ডস বা ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসের মতো গোপন এলাকাগুলোর সঙ্গে লেনদেন বন্ধ করত, তবে অর্থ পাচারের এই স্বর্গরাজ্যগুলো মুহূর্তেই হারিয়ে যেত।

নোবেলজয়ী এই অর্থনীতিবিদ সাংবাদিকদের মনে করিয়ে দেন, সিলিকন ভ্যালি ব্যাংকের মতো ঘটনায় যখন নিয়ন্ত্রক সংস্থাও ব্যর্থ হয়েছিল, তখন অনুসন্ধানী সাংবাদিকরাই সত্য সামনে এনেছিলেন। তাই আগামী দিনের বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক দুর্নীতি রোধে সাংবাদিকদের আরও গভীরে গিয়ে প্রশ্ন তোলার আহ্বান জানান তিনি।