শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

নিম্নমানের কাগজে আবারও পাঠ্যবই মুদ্রণ

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ৭ ডিসেম্বর ২০২৫ | ৪:২১ অপরাহ্ন


প্রতিবছরের মতো এবারও বছরের শুরুতে শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দেওয়ার মহাযজ্ঞ চলছে। তবে ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের এই মহৎ উদ্যোগকে ঘিরে সক্রিয় হয়ে উঠেছে একটি অসাধু মুদ্রণ সিন্ডিকেট। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) কঠোর নির্দেশনা উপেক্ষা করে রিসাইকলড ও নিম্নমানের কাগজে বই ছাপার অভিযোগ উঠেছে। মানদণ্ড অনুযায়ী জিএসএম ও ব্রাইটনেস বজায় না রেখে, পেশিশক্তি ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে কোটি কোটি টাকা।

২০২৬ শিক্ষাবর্ষের জন্য প্রাথমিকের ৯ কোটি এবং মাধ্যমিক ও ইবতেদায়ির ২১ কোটিসহ মোট ৩০ কোটি বই ছাপার কাজ চলছে। এর মধ্যে প্রায় এক-দশমাংশেরও বেশি কাজ বাগিয়ে নিয়েছে একটি নির্দিষ্ট পারিবারিক বলয়। অগ্রণী, কর্ণফুলী, কচুয়া ও আনোয়ারা প্রিন্টিং প্রেস—এই চারটি প্রতিষ্ঠানের মালিক পরস্পর দুই ভাই ও তাঁদের ভগ্নিপতি। প্রায় তিন কোটিরও বেশি বই ছাপার এই কার্যাদেশের অর্থমূল্য ২০০ কোটি টাকার ওপরে।

এনসিটিবির নির্দেশনা ছিল কার্যাদেশ পাওয়ার পরপরই চুক্তি সম্পাদন করে কাজ শুরু করা। কিন্তু এই চারটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দুটি প্রতিষ্ঠান ইচ্ছাকৃতভাবে সময়ক্ষেপণ করে গত ৪ ডিসেম্বর একেবারে শেষ মুহূর্তে এসে চুক্তি সই করে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে জাতীয় নির্বাচন ও রাজনৈতিক ব্যস্ততার সুযোগ নিয়ে আগামী ফেব্রুয়ারি-মার্চ পর্যন্ত তারা বই সরবরাহের কাজ টেনে নিয়ে যাবে। ওই সময় প্রশাসনের নজরদারি কম থাকবে, ফলে নিম্নমানের বই গছিয়ে দেওয়া সহজ হবে বলে মনে করছে এই চক্রটি।

এনসিটিবির স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী, প্রাথমিক ও ইবতেদায়ির চার রঙের বইয়ের জন্য ৮০ জিএসএম কাগজ ও ৮৫ ব্রাইটনেস এবং মাধ্যমিকের জন্য ৭০ জিএসএম ও ৮৫ ব্রাইটনেস বাধ্যতামূলক।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বর্তমান বাজারে এনসিটিবির মানদণ্ড অনুযায়ী কাগজের প্রতি টনের দাম প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা। অথচ অভিযুক্ত প্রেসগুলো ‘ম’ এবং ‘র’ আদ্যক্ষরের দুটি মিল থেকে মাত্র ৯০ হাজার টাকায় কাগজ সংগ্রহ করছে। এই সস্তা কাগজে ৬০-৭০ শতাংশ ভার্জিন পাল্পের পরিবর্তে ব্যবহৃত হচ্ছে ৩০-৪০ শতাংশ রিসাইকলড পাল্প।

ফলাফলস্বরূপ, ইবতেদায়ির বইতে ৮০ জিএসএমের স্থলে মিলছে ৬৫ থেকে ৭০ জিএসএম। একইভাবে মাধ্যমিকের বইতে ৭০ জিএসএমের পরিবর্তে পাওয়া যাচ্ছে ৬০ থেকে ৬৩ জিএসএম। ব্রাইটনেসও ৮০-এর ওপরে উঠছে না। দেশের বিভিন্ন জেলা, বিশেষ করে চট্টগ্রাম, বরিশাল, গাজীপুর ও ময়মনসিংহ অঞ্চলের একাধিক উপজেলায় সরবরাহকৃত লটে এই অসঙ্গতি ধরা পড়েছে।

নিম্নমানের কাজের প্রমাণ ঢাকতে এই সিন্ডিকেট পেশিশক্তির আশ্রয় নিচ্ছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। অগ্রণী ও কর্ণফুলী প্রেসের অবস্থান নোয়াখালীতে হওয়ায়, সেখানে পরিদর্শনে গিয়ে এনসিটিবি ও ইন্সপেকশন এজেন্টের কর্মকর্তারা বাধার মুখে পড়ছেন। অভিযোগ রয়েছে, পরিদর্শকদের আগে থেকে প্রস্তুত রাখা ভালো মানের কাগজ স্যাম্পল হিসেবে নিতে বাধ্য করা হয়।

সম্প্রতি এনসিটিবির একজন কর্মকর্তা সরেজমিনে পরিদর্শন শেষে ফেরার পথে নোয়াখালীতেই হামলার শিকার হন। তাঁর হাত থেকে কাগজের স্যাম্পল ও নথিপত্রভর্তি ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়া হয়। এই ঘটনার পর থেকে অন্য কর্মকর্তারা ওই প্রেসগুলোতে পরিদর্শনে যেতে নিরাপত্তা শঙ্কায় ভুগছেন। এমনকি এনসিটিবির অভ্যন্তরীণ কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীও এই সিন্ডিকেটের হয়ে কাজ করছেন এবং ভুয়া রিপোর্ট প্রদানে সহায়তা করছেন বলে সূত্র জানিয়েছে।

এই সিন্ডিকেটের উত্থান ও দাপটের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রশ্রয়। অভিযোগ রয়েছে, বিগত সরকারের প্রভাবশালী মহলের প্রত্যক্ষ মদদে এই প্রেসগুলো নিম্নমানের বই ছাপার ‘লাইসেন্স’ পেয়েছিল। সাবেক এক প্রধানমন্ত্রীর পিয়ন এবং তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রীদের ঘনিষ্ঠভাজনদের ম্যানেজ করে গত আট বছরে তারা প্রায় ২৪০০ কোটি টাকার কাজ করেছে। নিম্নমানের বই সরবরাহ করে এই অর্থের বিশাল একটি অংশ লোপাট করা হয়েছে। সরকার পরিবর্তনের পরও তাদের দৌরাত্ম্য কমেনি।

মুদ্রণ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাগজের জিএসএম কম হলে বইয়ের স্থায়িত্ব কমে যায়। ৬০ জিএসএমের কাগজ সাধারণত ছয় মাসের বেশি টেকে না, যা শিক্ষার্থীদের সারা বছরের লেখাপড়া ব্যাহত করবে। অন্যদিকে, ব্রাইটনেস কম হলে অক্ষর অস্পষ্ট দেখায়, যা কোমলমতি শিক্ষার্থীদের চোখের ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করে এবং দীর্ঘমেয়াদি চোখের সমস্যার কারণ হতে পারে।

বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি তোফায়েল খান বলেন, “প্রাথমিকের বইয়ের মান কিছুটা ভালো হলেও মাধ্যমিক ও ইবতেদায়ির ক্ষেত্রে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। যারা জেনেশুনে নিম্নমানের কাগজ ব্যবহার করছে এবং অতীতেও পার পেয়ে গেছে, তাদের বিরুদ্ধে এখনই কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিলে এই অপতৎপরতা বন্ধ হবে না।”

এনসিটিবির সচিব অধ্যাপক মো. সাহতাব উদ্দিন জানান, তারা সাধ্যমতো ব্যবস্থা নিচ্ছেন, তবে শতভাগ সাফল্য এখনো নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। মানহীন বই বা কাগজ ধরা পড়লে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিলেও, সিন্ডিকেটের শিকড় অনেক গভীরে হওয়ায় মানসম্মত পাঠ্যবই নিশ্চিত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।