শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

চকরিয়ায় ইজারার শর্ত ভেঙে বালু উত্তোলন, মাসে কোটি টাকার বালু লুট

এম. জিয়াবুল হক | প্রকাশিতঃ ৭ ডিসেম্বর ২০২৫ | ৯:২৮ অপরাহ্ন


কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার উত্তর হারবাং এলাকায় সরকারি ইজারার আড়ালে অবাধে চলছে বালু লুট। সরকারিভাবে মাত্র দুটি বালু মহাল ইজারা দেওয়া হলেও একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট খালের আটটি পয়েন্টে সেলো মেশিন বসিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে। এতে প্রতি মাসে কোটি টাকার বালু লুট হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অবাধে বালু উত্তোলনের ফলে শত শত একর ফসলি জমি খালে বিলীন হচ্ছে, যা নিয়ে চরম আতঙ্কে রয়েছেন স্থানীয় কৃষকরা।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের এপ্রিল মাসে ১৪৩২ বাংলা সনের জন্য উত্তর হারবাং এলাকায় দুটি বালু মহাল এক বছরের জন্য ইজারা দেয় জেলা প্রশাসন। অভিযোগ উঠেছে, ইজারাদাররা সরকারি নীতিমালা লঙ্ঘন করে নির্ধারিত সীমানার বাইরে গিয়ে বালু উত্তোলন করছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি মহালের দোহাই দিয়ে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা সাজ্জাদ হোসেন, বিএনপি নেতা দাবিদার খানে আলম, রাজিব, রাসেল ও ফারুক আহমদের নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট উত্তর হারবাং সাবানঘাটা, সেগুনবাগান, গয়ালমারা, কাট্টলি, কোরবানিয়া ঘোনা, করমুহরী পাড়ার সালাহউদ্দিন আহমদ ব্রিজ সংলগ্ন এলাকা এবং পাহাড় ঘেঁষা ছড়াখালের অন্তত আটটি পয়েন্টে সেলো মেশিন বসিয়ে বালু তুলছেন।

এছাড়া উত্তর হারবাং ব্রিকফিল্ড এলাকায় নুরুল আলম চেয়ারম্যানের ছেলে মানিক এবং কোরবানিয়াঘোনা অংশে মাহাবুব আলমের নেতৃত্বে অপর একটি চক্র একইভাবে বালু উত্তোলন করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এলাকাবাসী জানান, এই সিন্ডিকেট আগে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকলেও বর্তমানে বিএনপির নাম ভাঙিয়ে দাপট দেখাচ্ছে। প্রতিবাদ করলে তারা মামলা ও হামলার হুমকি দেয়।

উপজেলা ভূমি অফিসের কর্মকর্তারা জানান, সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী ইজারা দেওয়া নির্ধারিত এলাকার বাইরে বালু উত্তোলন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এছাড়া বালু উত্তোলনে সেলো মেশিন বা ড্রেজার ব্যবহার করা যাবে না। শ্রমিক দিয়ে বেলচা দিয়ে বালু তুলে মহালে মজুদ করার নিয়ম থাকলেও হারবাংয়ে তা মানা হচ্ছে না।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ছড়াখালের বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে মেশিন দিয়ে তোলা বালু সাবানঘাটা ও সেগুনবাগান এলাকায় মজুদ করা হচ্ছে। সেখান থেকে প্রতিদিন ১০০ থেকে ১৫০টি ভারী যানবাহনে করে বালু চট্টগ্রাম শহর ও উপজেলার বিভিন্ন স্থানে পাচার করা হচ্ছে। ভারী যানবাহনের চাপে গ্রামীণ ও সংরক্ষিত বনাঞ্চলের সড়কগুলো ভেঙে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

বালু উত্তোলনের ফলে খালের দুই তীরের ফসলি জমি ও বসতবাড়ি ভাঙনের কবলে পড়েছে। স্থানীয় কৃষকরা জানান, আবাদি জমি খালে তলিয়ে যাওয়ায় রকমারি সবজি খেত ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ইজারাদার পক্ষের অংশীদার খানে আলম বলেন, সরকারি ইজারাকৃত মহালের জায়গা থেকে প্রত্যাশিত বালু পাওয়া যাচ্ছে না। তাই বিনিয়োগকৃত পুঁজি তোলার জন্য একাধিক পয়েন্ট থেকে বালু তোলা হচ্ছে।

এ বিষয়ে চকরিয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রূপায়ন দেব বলেন, সরকারি মহালের বাইরে একাধিক পয়েন্ট থেকে বালু উত্তোলনের কোনো সুযোগ নেই। নীতিমালায় বিষয়টি পরিষ্কারভাবে বলা আছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা মিললে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

চট্টগ্রাম দক্ষিণ বনবিভাগের (চুনতি ও পদুয়া রেঞ্জ) সহকারী বন সংরক্ষক মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, বালু উত্তোলন ও পরিবহনের জায়গা বনভূমির মধ্যে পড়লে তদন্ত সাপেক্ষে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে কি না, তা দেখভালের জন্য বনবিভাগ তৎপর রয়েছে।