শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

রংপুর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের তিন ’লাভ’

| প্রকাশিতঃ ২৪ ডিসেম্বর ২০১৭ | ১০:৩৪ অপরাহ্ন

চট্টগ্রাম : রংপুর নির্বাচনে পরাজয়ের ’জয়’ নিয়ে দারুণ খোশমেজাজে আছে আওয়ামী লীগ। এখানে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হারলেও কৌশলগত কারণে জিতেছে আওয়ামী লীগ।

দলের সাধারণ সম্পাদক ভোট গণনার আগেই দলীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে রংপুর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পরাজিত হলেও ’গণতন্ত্র’ এবং ’রাজনীতি’র বিজয় হবে বলে মন্তব্য করেছিলেন। আওয়ামী লীগের অন্যতম মুখপাত্র ড. হাছান মাহমুদ নির্বাচনের ৪ দিন আগে বলেই দিলেন রংপুরে বিএনপির প্রার্থী তৃতীয় হবে।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, রংপুরে যেমনরকম নির্বাচন ও ফল আওয়ামী লীগ আশা করেছিল তা-ই হয়েছে। এই নির্বাচনকে ঘিরে কৌশলের রাজনীতিতে তিনভাবে ’লাভবান’ হয়েছে আওয়ামী লীগ।

প্রথমত, দেশের বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি শুরু থেকে বলে আসছে বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। তাই নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের দাাবিতে অনড় দলটি বলছে সরকার তাদের দাবি মেনে নিতে বাধ্য হবে। আর আওয়ামী লীগ প্রধান বলছেন, বিএনপি নাকে খত দিয়ে নির্বাচনে আসবে।

এরকম একটি পরিস্থিতিতে হাজির হয়েছে রংপুর সিটি নির্বাচন। এ নির্বাচন নিয়ে বিএনপি যেন প্রশ্ন তুলতে না পারে এবং বর্তমান সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব-তা প্রমাণ করা ছিল সবচেয়ে জরুরি। রংপুর নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার সেটি প্রমাণ করতে পেরেছে।

দ্বিতীয়ত, ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে জাতীয় পার্টির সঙ্গে আওয়ামী লীগের যে ঐক্য হয়েছিল আসন্ন অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনকে সামনে রেখে সেই ঐক্য ধরে রাখার জন্য রংপুর সিটি নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। রংপুরে লাঙ্গলের অবস্থা এমনিতেই ভালো। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে এখানে লাঙ্গলের প্রার্থীই জিতবে- ভোটের রাজনীতিতে নেমে নিশ্চিত হয়েছে আওয়ামী লীগ। তাই নির্বাচনে জবরদস্তি না করে মিত্রদল জাতীয়পার্টিকে রংপুরের মেয়র পদটি ’উপহার’ দেওয়ার পক্ষেই ছিল আওয়ামী লীগ ।

তৃতীয়ত, আওয়ামী লীগ যখন বুঝে গেল এখানে জিততে পারবে না তখন ভাবল, এখানে তারা দ্বিতীয় অবস্থানে থেকে বিএনপি তৃতীয় হোক। বিএনপি তৃতীয় হলে তাদের আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরবে। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে স্থানীয় সরকার থেকে জাতীয় নির্বাচন সবক্ষেত্রে ভূমিধস বিজয় হবে বলে বিএনপি যে অহংবোধ প্রকাশ করে আসছিল তাতেও কিছুটা ভাটা পড়বে। আওয়ামী লীগের চাওয়াটাই যেন এক্ষেত্রে পূরণ হয়েছে। তারা এখানে দ্বিতীয় হলো। পক্ষান্তরে বিএনপি তৃতীয় হয়েছে অত্যন্ত শোচনীয়ভাবে। জাতীয় পার্টির মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা এবং বিএনপির কাওছার বাবলার ভোটের ব্যবধান ১ লাখ ৩০ হাজার, আর আওয়ামী লীগের সাথে বিএনপি প্রার্থীর ব্যবধান তাও ৩২ হাজার ভোটের। আওয়ামী লীগের কাছে এ যেন প্রত্যাশার চেয়েও বেশি প্রাপ্তি। এই বিপুল ব্যবধানে পরাজয়ে একদিকে বিএনপির আত্মবিশ্বাস ও মনোবল যেমন দুর্বল হবে তেমনি এই নির্বাচন থেকে বড় একটি ’বার্তা’ পাবে বিএনপি।

রংপুর নির্বাচন সামনে রেখে এই ত্রিমুখী রাজনৈতিক ’লাভ’ নিশ্চিত করার জন্য শুরু থেকেই সরকারি দল আওয়ামী লীগ পা ফেলেছে অত্যন্ত কৌশলে।

অন্যান্য সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মতো রংপুর নির্বাচনে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের মরিয়া হতে দেখা যায়নি। নারায়নগঞ্জ কিংবা কুমিল্লা সিটি নির্বাচনের মতো কেন্দ্রীয় নেতাদের এখানে কোনো দৌড়ঝাঁপ ছিল না। কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক আফজাল হোসেন, যুবলীগের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক ছাড়া আর কোনো কেন্দ্রীয় নেতাকে দলের প্রার্থী শরফুদ্দিন আহমদ ঝন্টুর পক্ষে ভোট চাইতে দেখা যায়নি। এমনকি স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারাও ছিলেন ’ধরি মাছ না ছুই পানি’ অবস্থানে। ফলে নির্বাচনী মাটে অনেকটা অসহায় ও কোণঠাসা হয়ে পড়েন আওয়ামী লীগ প্রার্থী ঝন্টু। একপর্যায়ে তিনি বুঝে নিয়েছিলেন, শিকারের বন্দুকটা তার কাধেই ভর করেছে।

কুমিল্লা ও নারায়নগঞ্জের নির্বাচনের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, এই দুটি নির্বাচনকে ঘিরে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের রীতিমতো মিলনমেলা বসেছিল। কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের দাপুটে নেতারা মরিয়া হয়েও কুমিল্লায় দলের প্রার্থী আনজুম সুলতানা সীমাকে জেতাতে পারেননি। দলীয় প্রার্থীর জয়লাভের পর বিএনপি থেকে বলা হয়েছিল, বিএনপি প্রার্থী মনিরুল ইসলাম সাক্কু কেবল একজন সীমাকে হারাননি, হারিয়েছেন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতার পাশাপাশি সরকারকেও।

রাজনৈতিক বোদ্ধামহল মনে করেন, রংপুরে একজন শরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টু হেরেছেন, বলির পাঁঠা হয়েছেন। কিন্তু তাকে সামনে রেখে তার দল জিতেছে, সরকার জিতেছে। জিতেছে নির্বাচন কমিশন। বলাবাহুল্য, বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে এটি দ্বিতীয় বৃহত্তম স্থানীয় সরকার নির্বাচন। এর আগে তাদের অধীনে অনুষ্ঠিত প্রথম নির্বাচন নারায়নগঞ্জে জয়লাভ করে আওয়ামী লীগ প্রার্থী ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। ওই নির্বাচনে দলের প্রার্থী অ্যাডভোকেট শাখাওয়াত হোসেনের পরাজয়কে মেনে নেয়নি বিএনপি। বলেছিল, সরকারি দলের প্রার্থীকে জেতাতে স্থূল কারচুপি হয়েছে।

সেক্ষেত্রে রংপুর নির্বাচন নিয়ে প্রকৃতপক্ষে এধরনের প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই বিএনপির কাছে। যদিও বিএনপির ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অভিযোগ- এই যাত্রায় দেশের মানুষ তেমন একটা আমলে নেয়নি।

এতে করে সরকারের ভাবমূর্তির পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনের ভাবমূর্তি রক্ষা পেয়েছে। যার পথ ধরে দলীয় সরকারের অধীনে আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠানে একধাপ এগিয়ে গেলো সরকার।
আজাদ তালুকদার : সম্পাদক, একুশে পত্রিকা