
ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে কারওয়ান বাজারে দেশের শীর্ষ দুই গণমাধ্যম ‘প্রথম আলো’ ও ‘দ্য ডেইলি স্টার’ এবং ধানমন্ডিতে সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ‘ছায়ানট’-এর কার্যালয়ে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। এছাড়া ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়িতে ফের ভাঙচুর চালানো হয়েছে।
বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে কারওয়ান বাজারে হামলা শুরু হয়। শুক্রবার (১৯ ডিসেম্বর) সকালেও প্রথম আলোর চারতলা ভবনটি থেকে ধোঁয়া উড়তে দেখা গেছে।
গণমাধ্যমে নজিরবিহীন হামলা
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বৃহস্পতিবার রাতে একদল হামলাকারী প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার অফিসে ভাঙচুর চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। এ সময় ভেতরে আটকা পড়া সংবাদকর্মীদের ফায়ার সার্ভিস ক্রেনের সাহায্যে উদ্ধার করে। আগুন নেভানোর পর দেখা যায়, প্রথম আলোর চারতলা ভবনটি প্রায় পুরোটাই পুড়ে গেছে। ডেইলি স্টার অফিসের নিচতলা ও দোতলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হামলাকারীরা অফিসের ভেতরে লুটতরাজ চালিয়েছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
শুক্রবার সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, প্রথম আলোর ভবনটি পুড়ে কালচে হয়ে গেছে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা সেখানে কাজ করছেন। ডেইলি স্টার অফিসের ভেতরে ভাঙা জিনিসপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। ভবনের সামনে র্যাব ও পুলিশ সদস্যদের অবস্থান দেখা গেলেও সেনাবাহিনীর উপস্থিতি ছিল না, যদিও রাতে সেনা মোতায়েন করা হয়েছিল।
ঘটনার সময় সেখানে উপস্থিত হওয়া সম্পাদক পরিষদের সভাপতি নূরুল কবীরকেও হেনস্তা করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
প্রথম আলোর প্রকাশনা বন্ধ, ডেইলি স্টারে লুটপাট
প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ বলেন, “পুরো ঘটনায় আমরা খুবই মর্মাহত। সাংবাদিকতার জন্য এটা একটা আঘাত।”
তিনি জানান, হামলায় তাদের বিদ্যুৎ সংযোগসহ ব্যাপক অবকাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে। অনলাইনে খবর প্রকাশ সাময়িক স্থগিত আছে। প্রথমবারের মতো পত্রিকাটির প্রকাশনাও বন্ধ রাখা হয়েছে।
দ্য ডেইলি স্টারের কর্মীরা জানান, হামলাকারীরা ভবনের প্রায় প্রতিটি তলায় ভাঙচুর ও লুটপাট চালিয়েছে। এক কর্মী বলেন, “আমার ক্যামেরা, ডিভাইস, হার্ডড্রাইভ সব লুট করে নিয়ে গেছে। সারা জীবনের কাজের স্মৃতি ওগুলোয় সংরক্ষিত ছিল।” আতঙ্ক কাটিয়ে কর্মীরা এখনো স্বাভাবিক হতে পারেননি।
ছায়ানট ও ধানমন্ডি ৩২-এ হামলা
রাত ১টার দিকে ধানমন্ডিতে ছায়ানট ভবনে ভাঙচুর ও আগুন দেওয়া হয়। হামলার পর ছায়ানট কর্তৃপক্ষ ফেসবুকে দেওয়া এক ঘোষণায় পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সব কার্যক্রম ও ক্লাস স্থগিত করেছে।
এদিকে, আগে দুবার গুড়িয়ে দেওয়া ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়িতে আবারও হামলা হয়েছে। শুক্রবার সকাল সাড়ে ৮টাতেও টেলিভিশনের লাইভে দেখা গেছে, কয়েকজন যুবক ইট দিয়ে বাড়ির অবশিষ্ট দেয়াল ভাঙছেন।
চট্টগ্রাম ও রাজশাহীতে সহিংসতা
কেবল ঢাকা নয়, সহিংসতা ছড়িয়েছে ঢাকার বাইরেও। চট্টগ্রামে ভারতীয় সহকারী হাইকমিশন কার্যালয়ের সামনে ইনকিলাব মঞ্চের কর্মসূচি শেষে ভবনটিতে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। পুলিশ টিয়ারশেল ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এছাড়া রাত সোয়া ১১টার দিকে চট্টগ্রামে সাবেক মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর বাসায় আগুন দেওয়া হয়। রাজশাহীতেও আওয়ামী লীগের পার্টি অফিস গুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
সহিংসতার প্রেক্ষিতে ইনকিলাব মঞ্চ তাদের ফেসবুক পেজে লিখেছে, “ওসমান হাদিকে যারা খুন করেছে তাদের হাতে দেশকে তুলে দিয়েন না। ভাঙচুর আর আগুন সন্ত্রাসের মধ্য দিয়ে তারা বাংলাদেশকে অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করতে চায়। ৩২ আর ৩৬ এক জিনিস না, এটা আপনাদের বুঝতে হবে।”
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ফেসবুকে লিখেছেন, “দুষ্কৃতিকারীরা আবারও দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টিসহ নৈরাজ্যের মাধ্যমে ফায়দা হাসিলের অপতৎপরতায় লিপ্ত হয়েছে। হাদি নিহতের ঘটনা সেই অপতৎপরতারই বহিঃপ্রকাশ।”
জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান ফেসবুকে সবাইকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, “বর্তমান পরিস্থিতিতে আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে সর্বোচ্চ ধৈর্য ও প্রজ্ঞার পরিচয় দেওয়ার তৌফিক দান করুন। দেশটা আমাদের সকলেরই অস্তিত্বের অংশ।”
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয়ে জানতে ধানমন্ডি ও তেজগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (ওসি) সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা ফোন ধরেননি।