
দূর থেকে ভেসে আসা শাহী সুবাসে জিভে জল আসা স্বাভাবিক। চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার মোড়ে মোড়ে রঙিন শামিয়ানা টাঙিয়ে সাজানো বিশাল সব ডেকচি থেকে সেই সুবাসই ছড়াচ্ছে। ‘ওরশ বিরিয়ানি’, ‘ঐতিহ্যবাহী মেজবানি’ কিংবা ‘কাচ্চি’—সাইনবোর্ডে নামগুলো বেশ গালভরা।
কিন্তু ধোঁয়া ওঠা এই গরম ভাতের প্লেটে আদতে কী পরিবেশন করা হচ্ছে? অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এক ভয়ানক তথ্য। স্বাদ আর সুগন্ধের মোড়কে সাধারণ মানুষকে যা খাওয়ানো হচ্ছে, চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় তা ‘স্লো পয়জন’ বা ধীর গতির বিষ।
সরেজমিনে উপজেলার চাতরী চৌমুহনী, কালাবিবির দিঘির মোড়, টানেল মোড়, চায়না রোডের মাথা এবং কাফকো সেন্টার এলাকা ঘুরে দেখা যায় উৎসবমুখর পরিবেশ। রাস্তার ধুলোবালি আর অস্বাস্থ্যকর পরিবেশেই চলছে দেদারসে বিক্রি। মূলত কম দামে মুখরোচক খাবার পেয়ে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সাধারণ পথচারীরা ভিড় জমাচ্ছেন এসব দোকানে।
মশলা নয়, জাদুটা বোতলে
বিরিয়ানি বা মেজবানি মাংসের আসল স্বাদ নির্ভর করে দামী মশলার ওপর। এলাচ, দারুচিনি, জয়ফল কিংবা গোলাপের পাপড়ির বর্তমান বাজারদর আকাশছোঁয়া। তাহলে কম দামে কীভাবে এই খাবার বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা? এই প্রশ্নের উত্তর মিলেছে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাবুর্চির কথায়। ওই দোকানের রান্নার কাজের সঙ্গে যুক্ত ওই ব্যক্তি অকপটে জানান ভেতরের খবর।
মালিকপক্ষের কড়া নির্দেশের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাজারে ভালো মানের মশলার দাম অনেক বেশি। সেই মশলা ব্যবহার করলে ব্যবসায় লাভ থাকে না। তাই তারা বেছে নিয়েছেন ‘বিকল্প’ পথ। আসল মশলার বদলে ব্যবহার করা হচ্ছে বোতলজাত কেমিক্যাল ও কেওড়া জল। এক ফোঁটা কেমিকেলেই পুরো ডেকচি ভরে যায় শাহী গন্ধে। খরচ বাঁচে, কিন্তু ক্রেতা বুঝতেও পারেন না তিনি আসলে কী খাচ্ছেন।

‘ম্যানেজ’ সংস্কৃতি ও ম্যানেজারের স্বীকারোক্তি
বিষয়টি নিয়ে সরাসরি কথা বলতে গেলে বেরিয়ে আসে এই বাণিজ্যের পেছনের ‘সাহস’ এর উৎস। আকাশ ওরশ বিরিয়ানির ম্যানেজার মোহাম্মদ জাহাঙ্গীরের কাছে খাবারে কেমিক্যাল ব্যবহারের বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়। প্রশ্ন শুনে তিনি বিষয়টি এক প্রকার স্বীকারই করে নেন, তবে তার উত্তর ছিল অত্যন্ত কৌশলী এবং ইঙ্গিতপূর্ণ।
মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর বলেন, “ভাই এখানে সব সাংবাদিকরাই আসেন, আপনিও আসেন। ঘুরে দেখে যান।”
তার এই বক্তব্যে মূলত সাংবাদিকদের ‘ম্যানেজ’ করার এক অঘোষিত সংস্কৃতির ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তিনি কেমিক্যাল ব্যবহারের অভিযোগ অস্বীকার করেননি, আবার কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যাও দেননি। বরং ‘সবাই আসে’ বলে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, এই অনিয়মটাই এখানে নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
লিভার ও কিডনি বিকল হওয়ার ঝুঁকি
এই সস্তা ও কেমিক্যালযুক্ত খাবার শরীরের কী ক্ষতি করছে, তার ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছেন আনোয়ারা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মকর্তা ডা. মাহতাব উদ্দীন চৌধুরী। তিনি জানান, খাবারের স্বাদ বা সুবাস বাড়াতে যেসব সিনথেটিক কেমিক্যাল ব্যবহার করা হচ্ছে, তা আদতে বিষ।
ডা. মাহতাব উদ্দীন চৌধুরী সতর্ক করে বলেন, “এসব রাসায়নিক উপাদান শরীরে প্রবেশ করলে ধীরে ধীরে লিভার ও কিডনির কার্যক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। বিশেষ করে শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদে ক্যানসারের ঝুঁকি তৈরির জন্য এসব কেমিক্যাল সরাসরি দায়ী। এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য এক মারাত্মক হুমকি।”
আইন ও অধিকারের লঙ্ঘন
আইন অনুযায়ী খাবারে এসব উপাদান ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ফয়েজ উল্যাহ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, নিরাপদ খাদ্য আইন অনুযায়ী খাবারে কেওড়া জল বা কৃত্রিম সুগন্ধি ব্যবহার সম্পূর্ণ অবৈধ।
মোহাম্মদ ফয়েজ উল্যাহ বলেন, “যত্রতত্র গড়ে ওঠা এসব দোকানে প্রাকৃতিক মশলার বদলে সস্তা কেমিক্যাল ব্যবহারের প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কেওড়া জল বা রং কোনো খাদ্য উপাদান নয়। এটি সরাসরি আইনের লঙ্ঘন এবং দণ্ডনীয় অপরাধ।”
অন্যদিকে, কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) চট্টগ্রাম বিভাগের সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বিষয়টিকে দেখছেন মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “টাকা দিয়ে খাবার কিনে মানুষ আসলে বিষ কিনছে। এটি ভোক্তার অধিকার ক্ষুণ্ন করা। অবিলম্বে এসব কেমিক্যালজাত খাবার বাজার থেকে প্রত্যাহার করতে হবে এবং তদারকি জোরদার করতে হবে।”
প্রশাসনের নীরবতা
এত বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং অনিয়ম চোখের সামনে চললেও স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। আনোয়ারা উপজেলা জুড়ে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা এসব দোকান ও জনস্বাস্থ্যের হুমকির বিষয়ে আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাহমিনা আকতারকে অবগত করা হয়। কিন্তু বিস্ময়করভাবে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। প্রশাসনের এই নীরবতা অসাধু ব্যবসায়ীদের আরও বেপরোয়া করে তুলছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।