শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

এরশাদ থেকে হাসিনা আমল: এক নজরে খালেদা জিয়ার বন্দিজীবন

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ | ৭:৩৬ পূর্বাহ্ন


সদ্য প্রয়াত বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া তাঁর ৮০ বছরের জীবনে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে মঈন-ফখরুদ্দিন সরকার এবং সর্বশেষ শেখ হাসিনা সরকারের আমলে তাঁকে বারবার কারাভোগ করতে হয়েছে। এর পাশাপাশি শেষ জীবনে তিনি লড়াই করেছেন লিভার সিরোসিস, কিডনি ও হৃদরোগসহ একাধিক জটিল রোগের সঙ্গে।

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, ৮০ বছর বয়সী খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছিলেন। এর মধ্যে লিভার সংক্রান্ত জটিলতা, কিডনি সমস্যা, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, আথ্রাইটিস ও ইনফেকশনজনিত সমস্যা ছিল অন্যতম। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে গত ২৩ নভেম্বর তাঁকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরপর ২৭ নভেম্বর ফুসফুসে সংক্রমণ দেখা দিলে তাঁকে কেবিন থেকে ‘ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটে’ (সিসিইউ) স্থানান্তর করা হয়। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার সকালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

এরশাদবিরোধী আন্দোলন ও তিনবার আটক

১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই রাজপথে সরব ছিলেন খালেদা জিয়া। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি তিন দফায় আটক হন। ১৯৮৩ সালের ২৮ নভেম্বর, ১৯৮৪ সালের ৩ মে এবং ১৯৮৭ সালের ১১ নভেম্বর তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে ওই সময় তাঁকে বেশিদিন আটক থাকতে হয়নি।

ওয়ান-ইলেভেন ও সাব-জেলে ১ বছর

২০০৭ সালে রাজনৈতিক সহিংসতা ও অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণে নির্বাচন বিলম্বিত হলে ক্ষমতায় আসে সেনাবাহিনী সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। ওই সরকারের আমলে দুই সন্তানসহ দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হন খালেদা জিয়া। ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ভোরে তৎকালীন ক্যান্টনমেন্টের মইনুল হক রোডের বাসা থেকে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। পরে সিএমএম আদালতে আইনজীবীরা জামিনের আবেদন করলে তা নামঞ্জুর করে তাঁকে জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় স্থাপিত বিশেষ সাব-জেলে পাঠানো হয়।

জেলে থাকা অবস্থায় ২০০৭ সালের ১৪ অক্টোবর ঈদুল ফিতর পালন করেন তিনি। ঈদের দিন তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী ও সন্তানসহ পরিবারের ১০ সদস্য তাঁর সঙ্গে দেখা করেন এবং নতুন কাপড় ও উন্নত খাবার পৌঁছে দেন। ওই সময় তাঁর দুই সন্তানও কারাগারে বন্দি ছিলেন। এরপর ২০০৭ সালের ২১ ডিসেম্বর কোরবানির ঈদও ওই সাব-জেলেই কাটে তাঁর।

২০০৮ সালের ১৮ জানুয়ারি খালেদা জিয়ার মা দিনাজপুরের বাসায় মৃত্যুবরণ করলে তিনি ৬ ঘণ্টার জন্য প্যারোলে মুক্তি পেয়ে মইনুল রোডের বাসায় মায়ের লাশ দেখতে যান। অবশেষে সাব-জেলে ৩৭২ দিন কাটানোর পর ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তিনি জামিনে মুক্তি পান।

হাসিনা আমল: ১৭ বছরের সাজা ও গৃহবন্দিত্ব

রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় খালেদা জিয়া কারাভোগ ও গৃহবন্দি ছিলেন শেখ হাসিনা সরকারের আমলে। ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়। পরে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলাসহ মোট ১৭ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয় তাঁকে। শুরুতে পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডের কারাগারে এবং পরে স্বাস্থ্যগত কারণে বিএসএমএমইউ হাসপাতালে বন্দি ছিলেন তিনি।

প্রায় দুই বছরের বেশি সময় কারাগারে থাকার পর ২০২০ সালের ২৫ মার্চ সরকার নির্বাহী আদেশে শর্তসাপেক্ষে তাঁর সাজা স্থগিত করে গুলশানের বাসায় থাকার অনুমতি দেয়। তবে এটি পূর্ণাঙ্গ মুক্তি ছিল না, বরং আইনি শর্তের বেড়াজালে তিনি কার্যত গৃহবন্দি ছিলেন। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত তাঁকে এই অবস্থায় রাখা হয়।

পরবর্তীতে জুলাই বিপ্লবের পর বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাহী আদেশে খালেদা জিয়ার দণ্ড মওকুফ করে তাঁকে মুক্তি দেন। এরপর ২০২৪ সালের ২৭ নভেম্বর তিনি দুর্নীতি মামলা থেকে খালাস পান। কিন্তু মুক্তির স্বাদ পুরোপুরি উপভোগ করার আগেই অসুস্থতা তাঁকে কাবু করে ফেলে এবং শেষ পর্যন্ত না ফেরার দেশে পাড়ি জমান সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী।