শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

খালেদা জিয়া: জেল-জুলুম ও ত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল এক নাম

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ | ৬:২৫ অপরাহ্ন


বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিত বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আর নেই। মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। জীবনের দীর্ঘ সময় রাজনীতি, সংগ্রাম, জেল-জুলুম এবং শারীরিক অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে তিনি না ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন। মৃত্যুকালে তিনি রেখে গেছেন এক বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ইতিহাস।

রাজনীতিবিদদের জীবনে উত্থান-পতন, মামলা-মোকদ্দমা, গ্রেপ্তার ও কারাবাস স্বাভাবিক ঘটনা হলেও খালেদা জিয়ার জীবন ছিল আরও বেশি নাটকীয় ও সংগ্রামমুখর। তিনি যেমন স্বামী ও সন্তান হারানোর গভীর শোক সহ্য করেছেন, তেমনি দীর্ঘ রোগযন্ত্রণাও ভোগ করেছেন। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বামী জিয়াউর রহমান যখন রণাঙ্গনে, তখন দুই শিশু সন্তানকে নিয়ে তিনি কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হন এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে বন্দি জীবন কাটান। পরবর্তীতে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে তিনি হয়ে ওঠেন জননন্দিত নেত্রী।

শৈশব ও পারিবারিক জীবন

খালেদা জিয়ার জন্ম ১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুরে। তাঁর বাবা ইস্কান্দার মজুমদারের বাড়ি ফেনী জেলার পরশুরামের শ্রীপুর গ্রামে এবং মা তৈয়বা বেগমের জন্ম পঞ্চগড় জেলার বোদা উপজেলার চন্দনবাড়িতে। তিন কন্যা ও দুই পুত্রের মধ্যে খালেদা জিয়া ছিলেন তৃতীয়। জন্মের পর তাঁর নাম রাখা হয়েছিল খালেদা খানম। দেখতে অত্যন্ত সুন্দর ছিলেন বলে পরিবারের সদস্যরা তাঁকে ‘পুতুল’ বলে ডাকতেন। তিনি দিনাজপুর সরকারি স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন এবং দিনাজপুর সুরেন্দ্রনাথ কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন।

১৯৬০ সালের ৫ আগস্ট সেনাবাহিনীর তৎকালীন তরুণ ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। বিয়ের পর তিনি খালেদা জিয়া নামেই পরিচিতি পান। জিয়া-খালেদা দম্পতির দুই ছেলে—তারেক রহমান (জন্ম ১৯৬০) এবং আরাফাত রহমান কোকো (জন্ম ১৯৭০)। ছোট ছেলে কোকো ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি মালয়েশিয়ায় হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। ১৯৮১ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হলে মাত্র ৩৬ বছর বয়সে খালেদা জিয়া অকাল বৈধব্য বরণ করেন।

রাজনীতিতে আগমন ও আপসহীন নেতৃত্ব

জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিএনপি যখন সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি খালেদা জিয়া দলের প্রাথমিক সদস্যপদ গ্রহণ করেন। ১৯৮৩ সালে তাঁর নেতৃত্বে ৭ দলীয় ঐক্যজোট গঠিত হয়। ১৯৮৬ সালে জাতীয় নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্তে অটল থেকে তিনি ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিতি পান। ১৯৮৭ সাল থেকে তিনি এরশাদ হটাও এক দফার আন্দোলন শুরু করেন। দীর্ঘ ৯ বছরের আপসহীন আন্দোলনের পর ১৯৯০ সালে এরশাদের পতন হয়।

নির্বাচনী সাফল্য ও প্রধানমন্ত্রীত্ব

১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি জয়লাভ করে। ১৯৯১ সালের ২০ মার্চ তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের কাছে শপথ নেন। এরপর ১৯৯৬ ও ২০০১ সালেও তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৬ ও ২০০৯ সালে তিনি জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ছিলেন। ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত তিনি মোট ২৩টি সংসদীয় আসনে নির্বাচন করে সবকটিতেই জয়লাভ করেন। তাঁর জীবনীকার মাহফুজ উল্লাহর মতে, তিনি ছিলেন অত্যন্ত পরিশ্রমী এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে সারা দেশে প্রায় ১৪ হাজার কিলোমিটার পথ ভ্রমণ করেছিলেন।

কারাবাস ও নির্যাতন

খালেদা জিয়ার জীবনে কারাবাস ও মানসিক নির্যাতন বারবার এসেছে। ১৯৭১ সালের ২ জুলাই থেকে মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি ঢাকা সেনানিবাসে বন্দি ছিলেন। ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সময় ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর তাঁকে গ্রেপ্তার করে সংসদ ভবন এলাকায় সাব-জেলে রাখা হয়। ২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর তাঁকে দীর্ঘদিনের স্মৃতিবিজড়িত সেনানিবাসের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয়। সর্বশেষ ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি দুর্নীতির মামলায় তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়। ২০২০ সালের ২৫ মার্চ তিনি নির্বাহী আদেশে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পান।

বিদায়

চলতি বছরের জানুয়ারিতে লন্ডনে চিকিৎসার পর তিনি কিছুটা সুস্থ হলেও শেষ পর্যন্ত বার্ধক্য ও জটিল রোগের কাছে হার মানলেন। গত ২৩ নভেম্বর এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তির পর আর বাড়ি ফেরা হলো না তাঁর।