
রাজধানীর রাজপথ আজ কেবল পিচঢালা কালো রাস্তা ছিল না, তা পরিণত হয়েছিল মানুষের এক বিশাল সমুদ্রে। বুধবার বেলার কাঁটা যতই এগিয়েছে, সংসদ ভবন এলাকা ছাপিয়ে জনস্রোত আছড়ে পড়েছে আশপাশের প্রতিটি ধমনীতে। খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে আসা এই জনতার ঢল এতটাই তীব্র ছিল যে, অজস্র মানুষ তাদের প্রিয় নেত্রীকে শেষবারের মতো কাছ থেকে বিদায় জানানোর সুযোগটুকুও পাননি, অনেকেই পৌঁছাতে পারেননি মানিক মিয়া এভিনিউয়ের মূল চত্বরে। সংসদ ভবনের সামনের দুটি বিশাল মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে উপচে পড়া ভিড় ছড়িয়ে পড়েছিল ফার্মগেট, কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউ হয়ে কারওয়ান বাজার পর্যন্ত। অন্যদিকে ধানমন্ডির সোবহানবাগ মসজিদ থেকে শ্যামলীর শিশুমেলা এবং মিরপুর সড়কের দুপাশও ছিল শোকার্ত মানুষের দখলে।
এই বিশাল জনসমাগমের ক্যানভাসে ফুটে উঠেছে অকৃত্রিম ভালোবাসার চিত্র। যাত্রাবাড়ী থেকে ছুটে আসা আসিফ মাহমুদ কারওয়ান বাজার মেট্রো স্টেশনের নিচে দাঁড়িয়েই জানাজায় শরিক হন। আসিফ মাহমুদ বলেন, কেবল কারওয়ান বাজার মোড় ও এর আশেপাশেই প্রায় ৩০ হাজার মানুষ অশ্রুসজল চোখে দাঁড়িয়েছিলেন। দলীয় পরিচয় আর রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে এদিন মানুষ শ্রদ্ধা জানাতে এসেছিল একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদকে।
যেমনটি দেখা গেল ৭০ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা মিনহাজ উদ্দিনের কণ্ঠে। তিনি তার নাতিকে সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী করতে। বার্তা সংস্থা এএফপিকে মিনহাজ উদ্দিন বলেন, তিনি কখনোই খালেদা জিয়ার পক্ষে ভোট দেননি, কিন্তু তিনবারের এই প্রধানমন্ত্রীর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই তিনি ছুটে এসেছেন। তার ভাষায়, তিনি এমন একজন প্রবীণ রাজনীতিবিদকে শেষ বিদায় জানাতে এসেছেন, যার অবদান চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
নারী নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে খালেদা জিয়াকে স্মরণ করেন জানাজায় আসা শারমিনা সিরাজ। শোকাহত শারমিনা সিরাজ এএফপিকে বলেন, খালেদা জিয়া ছিলেন অনুপ্রেরণার উৎস এবং অদূর ভবিষ্যতে নারীদের এমন নেতৃত্বের আসনে কল্পনা করাও কঠিন। অংশগ্রহণকারীদের ধারণা, বিএনপির এই প্রয়াত চেয়ারপারসনকে বিদায় জানাতে কয়েক লাখ মানুষ সমবেত হয়েছিলেন। অনলাইন নিউজ পোর্টাল ‘দ্য ডিসেন্ট’-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সংসদ ভবন ও এর আশপাশের ৪ লাখ বর্গমিটার এলাকায় প্রতি বর্গমিটারে ৪ জন ধরলে প্রায় ১৬ লাখ, আর ৬ থেকে ৮ জন ধরলে যথাক্রমে ২৪ থেকে ৩২ লাখ মানুষের সমাগম হয়েছিল।
খালেদা জিয়ার এই শেষ যাত্রার দৃশ্যপট মনে করিয়ে দেয় বিশ্বের ইতিহাসের বৃহত্তম অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াগুলোর কথা। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস অনুযায়ী, ১৯৬৯ সালে ভারতের তামিলনাড়ুর প্রথম মুখ্যমন্ত্রী ও জনপ্রিয় নেতা কনজিভরম নটরাজন আন্নাদুরাইয়ের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় ১ কোটি ৫০ লাখ মানুষ জড়ো হয়েছিলেন। ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে ১৯৮৯ সালে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনির জানাজাও, যেখানে প্রায় ১ কোটি মানুষ অংশ নিয়েছিলেন এবং ভিড়ের চাপে কফিন মাটিতে পড়ে যাওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছিল।
১৮৬৫ সালে আব্রাহাম লিংকনের মরদেহ যখন ওয়াশিংটন থেকে ইলিনয়ে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন সেই দীর্ঘ পথে প্রায় ৭০ লাখ মানুষ দাঁড়িয়ে তাদের প্রিয় নেতাকে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়েছিলেন। ফরাসি ঔপন্যাসিক ভিক্টর হুগোর শেষযাত্রায় প্যারিসে ২০ লাখ এবং পোপ দ্বিতীয় জন পলের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় রোমে ৪০ লাখ মানুষের সমাগম হয়েছিল। আজকের এই দিনে ঢাকার রাজপথের দৃশ্যও যেন সেই ইতিহাসেরই এক অনবদ্য পুনরাবৃত্তি।
গবেষণাভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম ‘দ্য কনভারসেশন’ বা বিশেষজ্ঞরা ভিড় গণনায় ড্রোন বা সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণের কথা বললেও, আজকের এই জনসমুদ্রকে কেবল সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করা কঠিন। রং-বেরংয়ের দলীয় পতাকার বদলে আজ সবার হাতে ছিল কেবল দোয়ার হাত, আর মনে ছিল গভীর শ্রদ্ধা। একজন তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, একজন আপসহীন নেত্রী এবং কোটি মানুষের আস্থার প্রতীক খালেদা জিয়া আজ লাখো মানুষের অশ্রুজলে সিক্ত হয়ে পাড়ি জমালেন না ফেরার দেশে, রেখে গেলেন এক অমলিন ইতিহাস।