শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

নোয়াখালী-১: ব্যারিস্টার খোকনের প্রতিদ্বন্দ্বী সবাই নতুন, সম্পদের পাহাড়ে জহিরুল তবে আয়করে ‘অসঙ্গতি’

সিআইপি হয়েও ১ হাজার ৬০০ টাকা কর দিলেন ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী জহিরুল!
সাজ্জাদুল ইসলাম | প্রকাশিতঃ ২ জানুয়ারী ২০২৬ | ১০:৩০ পূর্বাহ্ন


আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নোয়াখালী-১ (চাটখিল-সোনাইমুড়ী আংশিক) আসনে বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী ও সাবেক সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকনের বিপরীতে লড়ছেন সাতজন নতুন মুখ। গত সোমবার (২৯ ডিসেম্বর) ছিল মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন। এদিন পর্যন্ত এই আসনে একজন স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ মোট আটজন প্রার্থী চূড়ান্ত মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন।

নির্বাচন কমিশনে দাখিলকৃত হলফনামা বিশ্লেষণে দেখা যায়, অভিজ্ঞতায় মাহবুব উদ্দিন খোকন এগিয়ে থাকলেও সম্পদের দিক দিয়ে চমক দেখিয়েছেন ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী জহিরুল ইসলাম। তবে জহিরুলের আয়কর প্রদানে বড় ধরনের অসঙ্গতি পরিলক্ষিত হয়েছে।

এই আসনে চূড়ান্ত প্রার্থীরা হলেন—বিএনপি মনোনীত ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনোনীত জহিরুল ইসলাম, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত মাওলানা মো. ছাইফ উল্যাহ, জাতীয় পার্টি মনোনীত মো. নুরুল আমিন, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ মনোনীত মো. মশিউর রহমান, বাংলাদেশ কংগ্রেস মনোনীত মো. মমিনুল ইসলাম, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) মনোনীত রেহানা বেগম এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী মুহাম্মদ ইফতেখার উদ্দিন। নবম জাতীয় সংসদে নোয়াখালী-১ আসন থেকে নির্বাচিত হওয়া মাহবুব উদ্দিন খোকন ছাড়া বাকি সাতজনই প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষাগত যোগ্যতায় সবার চেয়ে এগিয়ে আছেন ‘ব্যারিস্টার-অ্যাট-ল’ ডিগ্রিধারী মাহবুব উদ্দিন খোকন। তাঁর বিরুদ্ধে ৪৬টি মামলা থাকলেও অধিকাংশ প্রত্যাহার হয়েছে এবং বাকিগুলো উচ্চ আদালতের নির্দেশে স্থগিত বা জামিনে রয়েছে। আইন পেশা ও বাড়ি ভাড়া থেকে তাঁর বার্ষিক আয় ১ কোটি ১৩ লাখ ৬ হাজার ১২৮ টাকা। তিনি ২ কোটি ৩২ লাখ ৯২ হাজার ৭০৪ টাকার স্থাবর এবং প্রায় ৫ কোটি টাকার অস্থাবর সম্পদ দেখিয়েছেন। মজার বিষয় হলো, ২০১৮ সালের মতো এবারও তিনি মাত্র ১৫ হাজার ৭৫০ টাকার স্বর্ণের মালিকানা দেখিয়েছেন। তিনি চলতি অর্থবছরে ১৫ লাখ ৯০ হাজার ১১১ টাকা কর প্রদান করেছেন।

অন্যদিকে, ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী জহিরুল ইসলাম সম্পদের দিক দিয়ে বেশ এগিয়ে। ৪৪ বছর বয়সী এই প্রার্থী যুক্তরাজ্য প্রবাসী ছিলেন এবং নির্বাচনে অংশ নিতে গত ১২ ডিসেম্বর যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন। রেমিট্যান্স পাঠানোর স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি সিআইপি (বাণিজ্যিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি) মর্যাদা পেয়েছেন। তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৯ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে অস্থাবর সম্পদ ৮ কোটি ৩ লাখ ৮৭ হাজার টাকা এবং স্থাবর সম্পদ ৪ কোটি ৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এছাড়া বিদেশ থেকে তিনি বছরে ৫ কোটি ৩৩ লাখ টাকার বেশি রেমিট্যান্স পান।

তবে জহিরুল ইসলামের হলফনামায় আয়ের সঙ্গে কর প্রদানের তথ্যে গরমিল পাওয়া গেছে। তিনি দেশের ব্যবসা থেকে বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন ২৩ লাখ ৫০ হাজার ৬৬১ টাকা এবং ব্যাংক সুদ বাবদ আয় ৯ হাজার ৮০৫ টাকা। অথচ চলতি অর্থবছরে তিনি আয়কর দিয়েছেন মাত্র ১ হাজার ৬১৭ টাকা। তিনি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার (আফতাবনগর) করদাতা হিসেবে ট্যাক্স জোন-১৯ এর অধীনে নিবন্ধিত। আয়কর আইন ও ২০২৫ সালের অর্থ অধ্যাদেশ অনুযায়ী, সিটি করপোরেশন এলাকার করদাতাদের ন্যূনতম কর ৫ হাজার টাকা হওয়ার কথা থাকলেও তিনি তা পরিশোধ করেননি বলে হলফনামায় প্রতীয়মান হয়।

জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. ছাইফ উল্যাহ পেশায় শিক্ষক এবং কামিল পাশ। তাঁর বিরুদ্ধে থাকা ৬টি মামলার মধ্যে ৩টিতে খালাস এবং বাকিগুলো থেকে প্রত্যাহার বা অব্যাহতি পেয়েছেন। তাঁর বার্ষিক আয় ৯ লাখ ৩৬ হাজার টাকা এবং স্থাবর-অস্থাবর মিলে ১ কোটি ৩৫ লাখ টাকার সম্পদ রয়েছে। তিনি কর দিয়েছেন ৫ হাজার ৬০৯ টাকা।

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) প্রার্থী রেহানা বেগম এই আসনের একমাত্র নারী প্রার্থী। ৭০ বছর বয়সী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী এই প্রার্থীর বার্ষিক আয় ১ কোটি ১১ লাখ ২১ হাজার টাকা। তাঁর ১ কোটি ৪৯ লাখ টাকার অস্থাবর এবং ২২ লাখ টাকার স্থাবর সম্পত্তি রয়েছে।

জাতীয় পার্টির ৬২ বছর বয়সী প্রার্থী অ্যাডভোকেট মো. নুরুল আমিনের বার্ষিক আয় ৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা। তাঁর ৫৭ লাখ টাকার সম্পদ রয়েছে এবং তিনি ৫৫ হাজার ৮৩৮ টাকা কর দিয়েছেন। স্বতন্ত্র প্রার্থী ৩৬ বছর বয়সী মুহাম্মদ ইফতেখার উদ্দিনের বার্ষিক আয় ১৬ লাখ ৫৭ হাজার টাকা হলেও তাঁর ২৯ লাখ ২৪ হাজার টাকার ঋণ রয়েছে।

এছাড়া ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের মো. মশিউর রহমান পেশায় ব্যবসায়ী। তাঁর বার্ষিক আয় ৩ লাখ ৪৮ হাজার টাকা এবং সম্পদ প্রায় ৪১ লাখ টাকার। বাংলাদেশ কংগ্রেসের মো. মমিনুল ইসলামের বার্ষিক আয় ৯০ হাজার টাকা এবং সম্পদ অতি সামান্য।

চাটখিল উপজেলার ৯টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা এবং সোনাইমুড়ী উপজেলার ৭টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত এই আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৪৮ হাজার ৭২২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৩১ হাজার ৪৫৪ জন এবং নারী ভোটার ২ লাখ ১৭ হাজার ২৬৮ জন। মোট ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ১৪১টি।

নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আগামী ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত মনোনয়নপত্র বাছাই চলবে। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ২০ জানুয়ারি এবং ২১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হবে। ২২ জানুয়ারি থেকে ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল পর্যন্ত চলবে আনুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণা।