শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

ফটিকছড়ি বিএনপিতে দীর্ঘদিনের বরফ গলে ঐক্যের কোলাকুলি

‘ব্যক্তি নয়, প্রতীকই মুখ্য’—এক মঞ্চে দাঁড়িয়ে ঘোষণা বাহার-আলমগীরের
এস এম আক্কাছ | প্রকাশিতঃ ৪ জানুয়ারী ২০২৬ | ১১:৫৮ পূর্বাহ্ন


রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই—এই আপ্তবাক্যটিই যেন নতুন করে প্রমাণিত হলো চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ডামাডোলের মাঝেই দীর্ঘদিনের বিভেদের দেয়াল ভেঙে চুরমার হয়ে গেল এক নিমিষেই। যে মঞ্চে এতদিন শুধুই পাল্টাপাল্টি শক্তির মহড়া চলত, সেই মঞ্চেই এবার দেখা গেল হৃদ্যতার এক বিরল দৃশ্য। একসময়ের তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বী দুই শীর্ষ নেতা যখন একে অপরকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন, তখন উপস্থিত হাজারো নেতাকর্মীর চোখেমুখে ছিল স্বস্তির ছাপ আর করতালিতে মুখর হয়ে উঠল পুরো এলাকা।

শনিবার (৩ জানুয়ারি) বিকেলে ফটিকছড়ি বিএনপি আয়োজিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মাগফেরাত কামনায় দোয়া মাহফিলে এই নাটকীয় ঐক্যের সূচনা হয়। নির্বাচনের আগমুহূর্তে এই ঐক্য ফটিকছড়ি বিএনপির জন্য এক বড় টনিক হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করছেন তৃনমূলের কর্মীরা।

দেড় দশকের বিভেদের অবসান

ফটিকছড়ি বিএনপির এই বিভক্তি একদিনের নয়। এর শেকড় বেশ গভীর। দলীয় সূত্রে জানা যায়, ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর থেকেই এখানে বিএনপি কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। শুরুতে তৎকালীন উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক সালাহ উদ্দিন ও সদস্য সচিব সৈয়দ ওমর ফারুকের মধ্যকার দূরত্ব দিয়ে এই অনৈক্যের শুরু। জেলা নেতারা বহুবার চেষ্টা করেও সেই ফাটল জোড়া লাগাতে ব্যর্থ হন।

পরবর্তীতে নেতৃত্বের ব্যাটন হাতবদল হয়ে চলে যায় অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা কর্নেল (অব.) আজিম উল্লাহ বাহার ও মাঠের লড়াকু নেতা সরোয়ার আলমগীরের হাতে। দীর্ঘ সময় ধরে এই দুই নেতা নিজেদের বলয় নিয়ে আলাদাভাবে দলীয় কর্মসূচি পালন করে আসছিলেন। ফলে ফটিকছড়ির রাজনীতিতে বিএনপির শক্তি ক্ষয়ে যাচ্ছিল অভ্যন্তরীণ কোন্দলে। একাধিকবার জেলা নেতাদের উপস্থিতিতে বৈঠক হলেও বরফ গলেনি।

যেভাবে মিলল দুই মেরু

নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর দুই নেতাই দলের মনোনয়ন চেয়েছিলেন। তবে কেন্দ্র শেষ পর্যন্ত সরোয়ার আলমগীরকে বেছে নেয়। অন্যদিকে কর্নেল বাহারও ছিলেন শক্ত অবস্থানে। এমন পরিস্থিতিতে শঙ্কা ছিল সংঘাতের। কিন্তু শনিবারের দোয়া মাহফিল সব শঙ্কা উড়িয়ে দিল।

মঞ্চে দাঁড়িয়ে আবেগমখা কণ্ঠে ধানের শীষের প্রার্থী সরোয়ার আলমগীর বলেন, “সব ভেদাভেদ ভুলে গেলাম। আমি এখানে অতীতের কোনো বিষয় আনতে চাই না। আশা করি কর্নেল আজিম উল্লাহ বাহারের নেতৃত্বে সবাই ঐক্যবদ্ধ কাজ করে ধানের শীষের প্রার্থীকে অবশ্যই বিজয়ী করবেন।”

তাঁর এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে মাইক্রোফোন হাতে নেন উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কর্নেল (অব.) আজিম উল্লাহ বাহার। তিনি বলেন, “আমাদের দু’জনের ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক দীর্ঘদিনের। সে হিসেবে সরোয়ার আলমগীর আমার ছোট ভাই। আমাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা ছিল, আমিও মনোনয়ন চেয়েছিলাম। কিন্তু দল যাকে মনোনয়ন দিয়েছে, আমরা সবাই এখন তাঁর।”

কর্মীদের উদ্দেশ্যে স্পষ্ট বার্তা দিয়ে তিনি বলেন, “এখন আর কোনো ভেদাভেদ নেই। একটাই লক্ষ্য—ধানের শীষকে বিজয়ী করা। ব্যক্তি আলমগীর নয়, ধানের শীষে ভোট দিন।”

নেতাকর্মীদের মাঝে নতুন প্রাণচাঞ্চল্য

দুই নেতার এই কোলাকুলি এবং ঐক্যবদ্ধ ঘোষণা মুহূর্তেই পাল্টে দিয়েছে ফটিকছড়ির ভোটের মাঠের হিসাব-নিকাশ। উপস্থিত নেতাকর্মীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে নতুন উদ্দীপনা।

এই মিলনমেলা প্রসঙ্গে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা ও বিচারপতি ফয়সাল মাহমুদ ফয়েজী বলেন, “এই খবর দলের জন্য দারুণ এক বার্তা। ফটিকছড়িতে এবার দলের সবাই এক ও অভিন্ন। এই ঐক্যই ধানের শীষের বিজয় নিশ্চিত করবে।”

শনিবারের বিকেলের এই দৃশ্যপট বলছে, ফটিকছড়ি বিএনপিতে এখন আর কোনো ‘গ্রুপিং’ নেই, আছে কেবল বিজয়ের লক্ষ্য। এখন দেখার বিষয়, নেতাদের এই মঞ্চের ঐক্য ভোটের মাঠে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে।