শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

গুমের শিকার ৬৮% বিএনপি ও ২২% জামায়াত, নির্দেশদাতা শেষ হাসিনা: তদন্ত রিপোর্ট

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ৫ জানুয়ারী ২০২৬ | ১১:৪৫ পূর্বাহ্ন


ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের গত দেড় দশকের শাসনামলে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে গুমের ঘটনার প্রমাণ পেয়েছে এ সংক্রান্ত ‘কমিশন অব ইনকোয়ারি’। কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গুমের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে যারা এখনো নিখোঁজ, তাদের ৬৮ শতাংশই বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী এবং ২২ শতাংশ জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী। এছাড়া গুমের শিকার ব্যক্তিদের অনেককে আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই গোপনে ভারতে হস্তান্তর বা ‘রেন্ডিশন’-এর প্রমাণ পাওয়ার কথাও জানিয়েছে কমিশন।

রোববার (৪ জানুয়ারি) বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে এই চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেন কমিশন প্রধান ও অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী। এ সময় কমিশনের সদস্য বিচারপতি মো. ফরিদ আহমেদ শিবলী, মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন, নাবিলা ইদ্রিস ও সাজ্জাদ হোসেন উপস্থিত ছিলেন। সরকারের পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান ও প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব সিরাজউদ্দিন মিয়া।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত আওয়ামী লীগের শাসনামলে মোট ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগ কমিশনে জমা পড়ে। যাচাই-বাছাই শেষে ১ হাজার ৫৬৯টি অভিযোগ সংজ্ঞা অনুযায়ী গুম হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এর মধ্যে ২৮৭টি অভিযোগ ‘মিসিং অ্যান্ড ডেড’ বা নিখোঁজ ও মৃত ক্যাটাগরিতে পড়েছে। কমিশন স্পষ্ট করে বলেছে, এসব ঘটনা ছিল সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপরাধ বা ‘পলিটিক্যালি মোটিভেটেড ক্রাইম’।

কমিশন তাদের তদন্তে হাই প্রোফাইল গুমের ঘটনায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তাঁর প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল তারিক আহমেদ সিদ্দিক এবং তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ পেয়েছে। এসব হাই প্রোফাইল ভুক্তভোগীদের মধ্যে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলম, সালাহউদ্দিন আহমেদ, হুম্মাম কাদের চৌধুরী, সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান এবং জামায়াত নেতা সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহিল আমান আযমী ও মীর কাসেম আলীর ছেলে ব্যারিস্টার আহমদ বিন কাসেম (আরমান) অন্যতম।

কমিশনের সদস্য নাবিলা ইদ্রিস জানান, গুমের প্রকৃত সংখ্যা ৪ থেকে ৬ হাজার হতে পারে। ভুক্তভোগীদের অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাদের মাধ্যমে আরও ভিক্টিমের খোঁজ পাওয়া যায়, যারা ভয়ে যোগাযোগ করেননি বা দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। তিনি আরও জানান, গুমের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে যারা জীবিত ফিরেছেন, তাদের ৭৫ শতাংশ জামায়াত-শিবিরের এবং ২২ শতাংশ বিএনপির নেতাকর্মী।

প্রতিবেদনে গুমের পর লাশ ফেলার স্থান সম্পর্কেও রোমহর্ষক তথ্য উঠে এসেছে। কমিশন জানিয়েছে, তদন্ত অনুযায়ী বরিশালের বলেশ্বর নদীতে সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড ও লাশ গুমের ঘটনা ঘটেছে। শত শত গুমের শিকার ব্যক্তিকে হত্যা করে এই নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বুড়িগঙ্গা নদী ও মুন্সিগঞ্জেও লাশ গুম করার প্রমাণ পাওয়া গেছে। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস আয়নাঘরের পাশাপাশি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও লাশ গুমের এসব স্থান ম্যাপিং করার নির্দেশনা দিয়েছেন।

কমিশনের প্রতিবেদন গ্রহণ করে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, এটি একটি ঐতিহাসিক কাজ। আপনারা যে ঘটনা বর্ণনা করলেন, তা এক কথায় ‘পৈশাচিক’। বাংলাদেশের সব প্রতিষ্ঠানকে দুমড়ে-মুচড়ে দিয়ে গণতন্ত্রের লেবাস পরে মানুষের ওপর কী পৈশাচিক আচরণ করা যেতে পারে, এই রিপোর্ট তারই ডকুমেন্টেশন। তিনি বলেন, যারা এই ভয়ংকর ঘটনা ঘটিয়েছে তারা আমাদের মতোই মানুষ এবং নৃশংসতম ঘটনা ঘটিয়ে তারা সমাজে স্বাভাবিক জীবনযাপন করছে। জাতি হিসেবে এই ধরনের নৃশংসতা থেকে আমাদের চিরতরে বেরিয়ে আসতে হবে।

গত ২৭ আগস্ট অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে এই পাঁচ সদস্যের কমিশন গঠন করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। এর আগে ১৪ ডিসেম্বর ও ৪ জুন কমিশন দুটি অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন জমা দিয়েছিল। চূড়ান্ত প্রতিবেদনে কমিশন গুমের শিকার ব্যক্তিদের সুরক্ষায় জাতীয় মানবাধিকার কমিশন পুনর্গঠন এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশ বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছে।