শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

সাগর-পাহাড়ের মিতালিতে স্বীকৃতির আনন্দ

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ৯ জানুয়ারী ২০২৬ | ১:০১ অপরাহ্ন


শহরের যান্ত্রিক কোলাহল, নিউজরুমের ব্যস্ততা আর ডেডলাইনের তাড়া—সবকিছু পেছনে ফেলে একুশে পত্রিকা পরিবার মেতেছিল অন্যরকম এক উৎসবে। গত ৬ জানুয়ারি শীতের সকালে চট্টগ্রাম স্টেশনে যখন ‘পর্যটক এক্সপ্রেস’ হুইসেল বাজাল, তখন সবার চোখেমুখে ছিল মুক্তির আনন্দ। গন্তব্য বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার। ঘড়ির কাটায় তখন সকাল ১১টা ৪০ মিনিট। ট্রেনের ঝকঝকাঝক শব্দের সাথে তাল মিলিয়ে শুরু হলো একুশে পরিবারের আনন্দ ভ্রমণ, যা কেবল ভ্রমণ ছিল না; ছিল হৃদ্যতা, স্মৃতিচারণ আর কাজের স্বীকৃতির এক মিলনমেলা।

দুপুর ২টা ২০ মিনিটে ট্রেন যখন কক্সবাজার স্টেশনে থামল, তখনো রোদের তেজ কমেনি। স্টেশন থেকে সোজা সুগন্ধা বিচের কাছে বিখ্যাত আল গণি হোটেলে। সেখানে আগে থেকেই অপেক্ষা করছিলেন একুশে পত্রিকার সম্পাদক নজরুল কবির দীপু। সঙ্গে ছিলেন তাঁর দুই ঘনিষ্ঠ বন্ধু—বিএফইউজের যুগ্ম মহাসচিব মহসীন কাজী এবং হোটেল কক্স টুডের ডেপুটি ম্যানেজার আবদুল নাদিম। দুপুরের খাবারটা হলো একেবারে জম্পেশ। মেন্যুতে ছিল কোরাল মাছ, মুচমুচে লইট্টা ফ্রাই, মুরগির মাংস আর জিভে জল আনা নানা পদের ভর্তা। পেট পুরে খেয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুলে সবাই রওনা হলাম সৈকত পাড়ার এক সরকারি গেস্ট হাউজের উদ্দেশ্যে।

গেস্ট হাউজটি যেন এক টুকরো স্বর্গ। উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত এই নিবাস থেকে একদিকে দেখা যায় অসীম সমুদ্রের নীল জলরাশি, আর অন্যদিকে পাহাড়ের গায়ে জড়িয়ে থাকা সবুজের সমারোহ। সাগর ও পাহাড়ের এই দ্বৈত মায়ায় মুগ্ধ হতে সময় লাগল না কারো। তবে চমক তখনও বাকি ছিল।

জানা গেল, আমাদের আগেই কক্সবাজার পৌঁছে সম্পাদক মহোদয় নিজ হাতে বাজার করেছেন। মুরগি, গরুর মাংস, টাটকা সবজি—সবই কেনা হয়েছে তাঁর তত্ত্বাবধানে। রাতে গেস্ট হাউজের ঘরোয়া পরিবেশে সেই রান্না যখন পরিবেশন করা হলো, তখন মনে হলো কোনো পেশাদার রাঁধুনি নয়, বরং পরম মমতায় তৈরি হয়েছে এই খাবার। সবজি ভাজি, ডাল, আর বিশেষ করে গরুর মাংস ও মুরগির পদের স্বাদ ছিল অমৃতের মতো। একেবারে পিকনিকের আমেজে রাতের খাবার শেষ হলো।

রাত ৯টায় পাহাড়ের চূড়ায়, গেস্ট হাউজের মিলনায়তনে শুরু হলো একুশে পরিবারের জাঁকজমকপূর্ণ ‘সেরা ইমপ্যাক্ট জার্নালিস্ট সম্মাননা ও বর্ষসেরা সাংবাদিকদের স্বীকৃতি’ প্রদান অনুষ্ঠান। প্রাণবন্ত এই অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন একুশে পত্রিকার স্টাফ রিপোর্টার আবছার রাফি। এই পর্বটি ছিল কর্মীদের জন্য আবেগ ও অনুপ্রেরণার। অনুষ্ঠানে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসের ‘ইমপ্যাক্ট অ্যাওয়ার্ড’ তুলে দেওয়া হয় এম. জিয়াবুল হকের হাতে। ‘স্পেশাল ইমপ্যাক্ট অ্যাওয়ার্ড’ গ্রহণ করেন এস এম আক্কাছ, মো. আলাউদ্দীন ও মোহাম্মদ বেলাল উদ্দিন।

বছরের সেরা কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ‘বেস্ট রিপোর্টার অ্যাওয়ার্ড’ পান আবছার রাফি এবং ‘বেস্ট সহ-সম্পাদক অ্যাওয়ার্ড’ অর্জন করেন আবদুল আলী।

এছাড়া ‘বেস্ট করেসপন্ডেন্ট’ হিসেবে অ্যাওয়ার্ড পান মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন, জিন্নাত আয়ুব, মোহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসেন, ফুয়াদ মোহাম্মদ সবুজ, মো. আলাউদ্দীন, মো. রবিউল হোসেন, মোহাম্মদ আলাউদ্দিন ও জাকির হোসেন।

পুরস্কারগুলো তুলে দেন সম্পাদক নজরুল কবির দীপু ও বিএফইউজের যুগ্ম মহাসচিব মহসীন কাজী। এ সময় একুশে পত্রিকার প্রধান প্রতিবেদক শরীফুল রুকন এবং যুগান্তরের কক্সবাজার প্রতিনিধি জসিম উদ্দিনসহ একুশে পত্রিকার সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে সাংবাদিকতায় বিশেষ নেতৃত্বের জন্য মহসীন কাজীকে ‘জার্নালিস্টিক লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান করা হয়। এছাড়া একুশে পত্রিকার প্রধান প্রতিবেদক শরীফুল রুকনকে দেওয়া হয় বিশেষ সম্মাননা। কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিত ‘গ্লোবাল ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম কনফারেন্স ২০২৫’-এ অংশগ্রহণের মাধ্যমে একুশে পত্রিকাকে বৈশ্বিক মঞ্চে তুলে ধরার স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে এই সম্মাননা জানানো হয়।

সম্মাননা গ্রহণ ও প্রদানের এক পর্যায়ে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে মহসীন কাজী বলেন, “যে প্রক্রিয়া অনুসরণ করে একুশে পত্রিকা ইমপ্যাক্ট অ্যাওয়ার্ড দিচ্ছে এবং ইমপ্যাক্ট ট্র্যাকার চালু করেছে, এটা বাংলাদেশে প্রথম। ইমপ্যাক্ট ট্র্যাকারের মাধ্যমে সংবাদের প্রভাব বোঝা ও দেখার পদ্ধতিটা অসাধারণ। এর ফলে একুশে পত্রিকার সাংবাদিকদের কাজের গতি যেমন অনেক বেড়ে যাবে, তেমনি একুশে পত্রিকার সুনামের পাশাপাশি ইমপ্যাক্ট তৈরি করা সাংবাদিকের সুনামও বাড়বে।”

অতীত স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, “আজাদ তালুকদার, আমি ও নজরুল কবির দীপু নব্বইয়ের দশকে এক সাথে সাংবাদিকতা শুরু করেছিলাম। পরে নজরুল ব্যবসার দিকে মনোযোগ দিলেও সাংবাদিকতা একেবারে ছাড়েননি। নজরুল না হলে একুশে পত্রিকা চালিয়ে নেওয়া আজাদের পক্ষে খুবই কঠিন হতো। একুশে পত্রিকার সম্পাদকীয় পরামর্শক হিসেবে নজরুল ভালো কাজগুলোর সাথে যুক্ত ছিলেন। আজাদের অকাল প্রয়াণের পর তাঁরই ইচ্ছায় নজরুল একুশে পত্রিকার পুরোপুরি ভার নেন। এখন পত্রিকা পরিচালনা করা অনেক চ্যালেঞ্জিং বিষয়, নজরুল এই কঠিন কাজটি ভালোভাবে করে যাচ্ছেন এবং নিয়মিত কলাম লেখা থামাননি।”

অ্যাওয়ার্ড পর্বের সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী মুহূর্তটি ছিল সম্পাদক নজরুল কবির দীপুর বক্তব্য। তিনি গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করেন তাঁর বাল্যবন্ধু ও একুশে পত্রিকার প্রয়াত সম্পাদক আজাদ তালুকদারকে। ভারাক্রান্ত কণ্ঠে তিনি বলেন, ঢাকার হাসপাতালে মৃত্যুর আগে আজাদ তালুকদার তাঁর হাত ধরে বলেছিলেন, “দোস্ত, আর কিছু না পারিস, অন্তত আমার এই পত্রিকাটাকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করিস।”

বন্ধুর সেই অন্তিম অনুরোধ রক্ষা করতেই গত আড়াই বছর ধরে তিনি এই গুরুদায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। তিনি অকপটে স্বীকার করেন, নানা ব্যস্ততার কারণে হয়তো সবসময় সময় দিতে পারেন না, কিন্তু হৃদয়ের সবটুকু দিয়ে তিনি পত্রিকাটিকে আগলে রেখেছেন।

নিজের হাতের আঙুলের সঙ্গে টিমের সদস্যদের তুলনা করে তিনি বলেন, “আপনারা আমাকে নয়, একুশে পত্রিকাকে ভালোবাসুন। আপনারা এক থাকলে এই পত্রিকা অনেক দূর যাবে।” তাঁর এই কথায় সবার চোখে ছিল আবেগের ছটা আর মনে ছিল নতুন করে কাজ করার প্রত্যয়।

পরদিন ৭ জানুয়ারি সকাল ১১টায় আমরা গেস্ট হাউজ ছেড়ে চেক-ইন করলাম তারকামানের হোটেল ‘দ্য কক্স টুডে’-তে। জরুরি কাজে সম্পাদক মহোদয় ও মহসীন কাজী ভাইদের বিদায় জানিয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম অজানাকে জানার উদ্দেশ্যে।

জিপ গাড়ি নিয়ে সোজা রামু চা বাগান স্টেশনের উত্তর পাশে ‘হোটেল রাজ মহল’-এ। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পাশে, ঘরোয়া পরিবেশে হাঁস, কবুতর আর দেশি মুরগির মাংসের জন্য এই এলাকার হোটেলগুলোর বেশ নামডাক। দুপুরের খাবারে হাঁস ও গরুর মাংসের স্বাদ ছিল ভোলার মতো নয়।

এরপর আমরা ঘুরে দেখলাম ঐতিহাসিক রাংকূট বনাশ্রম বৌদ্ধ বিহার। মৌর্য সম্রাট অশোকের স্থাপিত এই বিহারটি ইতিহাসের এক নীরব সাক্ষী।

বিকেলের গন্তব্য ছিল পাটুয়ারটেক সৈকত। পাথুরে সৈকত আর স্বচ্ছ নীল জলরাশি দেখে মনে হচ্ছিল এ যেন আরেক সেন্টমার্টিন। সমুদ্রের গর্জন, প্রবাল পাথর আর সূর্যাস্তের সোনালী আভা—সব মিলিয়ে সময়টা ছিল স্বপ্নের মতো। সবাই মেতেছিলেন ছবি তোলা আর হাসি-ঠাট্টায়। সন্ধ্যায় ফিরে এলাম কক্স টুডেতে। রাতে সৈকতে হাঁটা আর কেনাকাটার মধ্য দিয়ে শেষ হলো দ্বিতীয় দিন।

৮ জানুয়ারি সকালটা শুরু হলো কক্স টুডের সুইমিং পুলে জলকেলির মাধ্যমে। এরপর ফেরার পালা। বেলা সাড়ে ১২টার ট্রেনে যখন আমরা চট্টগ্রামের পথ ধরলাম, তখন সবার হৃদয়ে জমা হয়েছে একরাশ সুখস্মৃতি। এই ভ্রমণ শুধু ক্লান্তিই দূর করেনি, একুশে পরিবারকে বেঁধেছে আরও নিবিড় বন্ধনে। সাগর-পাহাড়ের এই স্মৃতি আর কাজের স্বীকৃতি বুকে নিয়ে নতুন উদ্যমে সংবাদের পেছনে ছুটবে একুশে পত্রিকার প্রতিটি প্রাণ।