
২০ টাকা ফিতে রোগী দেখার ঘোষণা থাকলেও আড়ালে নেওয়া হয় হাজার হাজার টাকা। দাবি করা হয়, ‘এক ফুঁতেই’ সারবে সব রোগ। এভাবে সাধারণ মানুষের বিশ্বাসকে পুঁজি করে চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় রমরমা প্রতারণার ব্যবসা ফেঁদে বসার অভিযোগ উঠেছে এক ‘কবিরাজ’র বিরুদ্ধে।
অভিযুক্ত ওই ব্যক্তির নাম মো. শাহ নেওয়াজ বৈদ্য। তবে তার প্রকৃত নাম আবদুল গফুর। এক সময় দরিদ্র দিনমজুর পরিবারের সন্তান গফুর এখন ‘শাহ নেওয়াজ বৈদ্য’ নামেই এলাকায় পরিচিত।
উপজেলার আধুনগর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম আধুনগর বশির মিস্ত্রি পাড়ায় তার বাড়ি। স্থানীয়দের অভিযোগ, অলৌকিক ক্ষমতার মিথ্যা দাবি প্রচার করে এবং দালাল চক্রের মাধ্যমে তিনি বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন।
সরেজমিনে ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এক সময় গফুরের পরিবার দারিদ্র্যের মধ্যে দিন কাটালেও বর্তমানে তিনি বিত্তশালী। টিলা কেটে তৈরি করেছেন পাকা ভবন। গড়ে তুলেছেন গরুর খামার, কিনেছেন হালচাষের ট্রাক্টর ও কৃষিজমি। স্থানীয়দের প্রশ্ন, কোনো দৃশ্যমান বৈধ আয়ের উৎস ছাড়াই কীভাবে এত সম্পদের মালিক হলেন তিনি?
অভিযোগ রয়েছে, শাহ নেওয়াজ বৈদ্য পরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন এলাকায় দালাল নিয়োগ করেছেন। এসব দালাল নিজেরা তার চিকিৎসায় সুস্থ হয়েছেন—এমন মিথ্যা গল্প ছড়িয়ে লোহাগাড়া, সাতকানিয়া, চন্দনাইশ, বাঁশখালী এবং পার্শ্ববর্তী কক্সবাজার ও বান্দরবান থেকে সহজ-সরল মানুষকে তার কাছে নিয়ে আসেন। আগত রোগীদের বড় অংশই নারী।
জিন-ভূতের আছর, জাদুর টোনা, বান মারা, শিশুদের রোগ, হাঁপানি এমনকি ‘ভালোবাসার গোপনীয় কাজ’ হাসিল করে দেওয়ার কথা বলে চিকিৎসা দেন তিনি। প্রকাশ্যে ২০ টাকা ফি নেওয়ার কথা বলা হলেও, দালালদের মাধ্যমে ও রোগভেদে কৌশলে হাজার থেকে লাখ টাকা পর্যন্ত আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
প্রতারণার বিষয়টি সরেজমিনে দেখতে গত ৩ জানুয়ারি (শনিবার) এই প্রতিবেদক পরিচয় গোপন রেখে রোগী হিসেবে এক শিশুকে নিয়ে হাজির হন শাহ নেওয়াজ বৈদ্যের কাছে। বাড়ির পাশে বাঁশের বেড়া ও টিনের ছাউনিযুক্ত একটি ঘরে বসে রোগী দেখছিলেন তিনি।
প্রাথমিকভাবে ২০ টাকা ফি নেওয়ার পর ওই শিশু সম্পর্কে মনগড়া নানা কথা বলেন এই কবিরাজ। একপর্যায়ে তিনি জানান, শিশুটিকে জিনে ধরেছে এবং চিকিৎসার জন্য ২১ হাজার টাকা লাগবে। এ সময় তার সহকারী মো. আলম একটি কাগজে টাকার অংক ও প্রয়োজনীয় জিনিসের তালিকা লিখে দেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ভুক্তভোগী জানান, ঝাড়ফুঁক ও পানি পড়ায় জটিল রোগ ভালো হওয়ার কথায় বিশ্বাস করে তারা এসেছিলেন। কিন্তু হাজার হাজার টাকা খরচ করেও কোনো ফল পাননি। উল্টো প্রতারণার শিকার হয়েছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শাহ নেওয়াজ বৈদ্যের সহকারী ও কথিত দালাল মো. আলম দাবি করেন, গত সাত বছর ধরে ‘অজানা শক্তির আশীর্বাদে’ চিকিৎসা দিচ্ছেন শাহ নেওয়াজ। তিনি বলেন, “কবিরাজ ফুঁ দিয়েই জটিল রোগ ভালো করেন। তিনি কোনো টাকা দাবি করেন না, রোগীরা যা দেন তাই নেন।” তবে চিকিৎসার নামে ২১ হাজার টাকা দাবির বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে শাহ নেওয়াজ বৈদ্যের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয়। সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে চিকিৎসার নামে প্রতারণা ও অর্থ আদায়ের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো উত্তর না দিয়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে এসব পদ্ধতির কোনো স্থান নেই জানিয়ে লোহাগাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ইকবাল হোসাইন বলেন, “এগুলো মানুষের ধারণার ওপর ভিত্তি করে প্রতারণা ছাড়া আর কিছু নয়। ঝাড়ফুঁক বা অলৌকিক চিকিৎসার কোনো ভিত্তি নেই।”
এ ধরনের অপচিকিৎসার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত উল্লেখ করে সাধারণ মানুষকে এসব বিষয়ে সচেতন হওয়ার পরামর্শ দেন এই স্বাস্থ্য কর্মকর্তা।