
ওমানের সালালাহ শহর। পাহাড় আর সমুদ্রের মিতালীতে এক অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি। সেই সৌন্দর্য উপভোগ করতে আর হজরত আইয়ুব (আ.)-এর মাজার জিয়ারত করতে মাস্কাট থেকে ছুটে গিয়েছিল একটি সুখী পরিবার। কিন্তু কে জানত, ফেরার পথেই মরুভূমির বুক চিরে আসা একটি উট তাদের সেই আনন্দযাত্রাকে চিরবিষাদে রূপ দেবে! নিমিষেই চুরমার হয়ে যাবে ফটিকছড়ির প্রবাসী পরিবারটির সাজানো স্বপ্ন।
শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) স্থানীয় সময় রাত আটটা। সালালাহর পাহাড়ঘেরা পথ ধরে ফিরছিল গাড়িটি। চালকের আসনে ছিলেন পরিবারের একমাত্র ছেলে ওমান প্রবাসী মুহাম্মদ সাকিবুল হাসান (সবুজ)। গাড়িতে ছিলেন তার মা, বোন, স্ত্রী, শিশুকন্যা আর বোনের স্বামী। হাসি-আনন্দে যখন সময় কাটছিল, ঠিক তখনই সালালার তাম্বেত এলাকায় অন্ধকারের বুক চিরে হঠাৎ গাড়ির সামনে চলে আসে একটি বিশাল উট।
মুহূর্তের সেই ধাক্কায় দুমড়ে-মুচড়ে যায় প্রাইভেট কারটি। ঘটনাস্থলেই স্তব্ধ হয়ে যায় তিনজনের হৃদস্পন্দন। নিহত হন মা বিলকিস আক্তার, চালকের আসনে থাকা একমাত্র ছেলে মুহাম্মদ সাকিবুল হাসান এবং মেয়ের জামাই মুহাম্মদ দিদার। বিলকিস আক্তার ফটিকছড়ি উপজেলার সুন্দরপুর ইউনিয়নের ছোট ছিলোনিয়া গ্রামের প্রবাসী মো. শফিউর আলমের স্ত্রী। নিহত দিদারের বাড়ি হারুয়ালছড়ি ইউনিয়নে।
এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় ভাগ্যক্রমে প্রাণে বেঁচে গেলেও গুরুতর আহত হয়ে এখন হাসপাতালের বিছানায় কাতরাচ্ছেন সাকিবের বোন, স্ত্রী এবং তাদের ছোট্ট শিশুটি। সালালার একটি হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন তারা, অন্যদিকে স্বজনরা প্রহর গুনছেন এক অজানা আশঙ্কায়।
পরিবারের এমন বিয়োগান্তক পরিণতি কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না ওমানে থাকা সাকিবের চাচা মো. জাহাঙ্গীর। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, পরিবারটি হজরত আইয়ুব (আ.)-এর মাজার জিয়ারত শেষে ফিরছিল। ভাবি, ভাতিজা আর মেয়ের জামাই—সবাই একসঙ্গে এভাবে চলে যাবে, তা কখনো কল্পনাও করিনি।
মরুভূমির এই হাহাকার আছড়ে পড়েছে হাজার মাইল দূরে চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতেও। ছোট ছিলোনিয়া গ্রামে এখন শুধুই নিস্তব্ধতা আর কান্নার রোল। পরিবারের একমাত্র ছেলে সাকিবের মৃত্যুতে নির্বাক হয়ে পড়েছেন স্বজন ও প্রতিবেশীরা।
সুন্দরপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মো. শহিদুল আজম শোক প্রকাশ করে বলেন, একই পরিবারের তিনজনের এমন মর্মান্তিক মৃত্যু পুরো এলাকার জন্য এক বিশাল আঘাত। আমরা গভীরভাবে শোকাহত।
আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ দেশে আনার প্রস্তুতি চলছে। কিন্তু কফিনে মোড়ানো সেই দেহগুলো যখন ফিরবে, তখন কি আর সেই হাসিমুখগুলো দেখা যাবে? সালালাহর পথে সেই উটের ধাক্কা কেবল একটি গাড়িকেই চুরমার করেনি, ধ্বংস করে দিয়েছে একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ, রেখে গেছে শুধুই দীর্ঘশ্বাস।