শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

৬৭ বছরেও মেলেনি বয়স্ক ভাতা, সরকারি নথিতে ‘৬৫’ হওয়ার অপেক্ষায় খোকন

এম মোয়াজ্জেম হোসেন কায়সার | প্রকাশিতঃ ১২ জানুয়ারী ২০২৬ | ৬:১৯ অপরাহ্ন


পরনে লুঙ্গি আর শার্ট, শরীরটা শীর্ণকায়, হাঁটেন কোমর ঝুঁকিয়ে। দেখলেই বোঝা যায়, বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন। চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার বিভিন্ন চায়ের দোকানে প্রায়ই দেখা মেলে তাঁর। কখনো এক কাপ চা হাতে নীরবে বসে থাকেন, আবার কখনো বা আনমনে তাকিয়ে থাকেন শূন্যে। তিনি খোকন নাথ। রাঙ্গুনিয়ার পারুয়া ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের নাথপাড়ার বাসিন্দা মৃত মহেন্দ্র নাথের ছেলে। প্রকৃত বয়স ৬৭ পেরোলেও সরকারি নথির জটিলতায় এখনো তিনি প্রবীণ হিসেবে স্বীকৃতি পাননি।

জীবনের গল্প বলতে গিয়ে খোকন নাথ জানান, মাত্র ১৬ বছর বয়সে বাবাকে হারানোর পর সংসারের হাল ধরতে হয়েছিল তাঁকে। দুই বোন ও চার ভাইয়ের সংসারে সবার ছোট হয়েও কাঁধে তুলে নিতে হয়েছিল বড় দায়িত্ব। ফলে মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোনোর আগেই থেমে যায় লেখাপড়া। শুরু হয় জীবনসংগ্রাম।

বিয়ের পরও পিছু ছাড়েনি দুর্ভাগ্য। প্রথম দুই সন্তান—এক কন্যা ও এক পুত্র জন্মের পরপরই মারা যায়। সেই শোক কাটিয়ে ওঠার পর জন্ম নেওয়া দুই কন্যাকে বিয়ে দিয়েছেন। তাঁরা এখন নিজেদের সংসার নিয়ে ব্যস্ত।

জীবিকার তাগিদে ১৯৯২ সালে পাড়ি জমান প্রবাসে। সেখানে ১৭ বছর কাটালেও বৈধ কাগজপত্রের অভাবে এবং নানা প্রতিকূলতায় শক্ত কোনো ভিত গড়তে পারেননি। ২০১০ সালে প্রায় শূন্য হাতেই দেশে ফেরেন। দেশে ফিরে রংমিস্ত্রির কাজ শুরু করেন। কিন্তু বয়সের ভারে শরীর এখন আর চলে না। পরিবারে সদস্য বলতে তিনি ও তাঁর ৫৫ বছর বয়সী অসুস্থ স্ত্রী। দুজনের অসুস্থতায় নিয়মিত কাজ করাও তাঁর পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

সরকারি সহায়তার বিষয়ে জানতে চাইলে দীর্ঘশ্বাস ফেলে খোকন নাথ বলেন, “চালের একটা কার্ড আছে, তাও টাকা দিয়ে কিনে খেতে হয়। কয়েক বছর আগে মেম্বারের (জনপ্রতিনিধি) কাছে গিয়েছিলাম। তখন বলেছিল, আইডি কার্ডে বয়স ৬৫ হয়নি, তাই বয়স্ক ভাতা দেওয়া যাবে না।”

বাস্তব বয়স আর কাগজের বয়সের এই ফারাকই এখন খোকন নাথের জীবনের সবচেয়ে বড় বিড়ম্বনা। প্রকৃত বয়সে তিনি ৬৭ পেরিয়েছেন, অথচ জাতীয় পরিচয়পত্রে এখনো ৬৫ বছর পূর্ণ হওয়ার অপেক্ষায় আছেন। সাম্প্রতিক সময়ে হয়তো কাগজে-কলমে বয়স ৬৫ ছুঁয়েছে, তবু তিনি নিশ্চিত নন কবে মিলবে সেই কাঙ্ক্ষিত ভাতা।

খোকন নাথ আক্ষেপ করে বলেন, “আমি দিনমজুর মানুষ। শরীর ভাঙলেও কাজ থামানো যায় না। মেয়েরা মাঝেমধ্যে সহযোগিতা করে ঠিকই, কিন্তু তাদেরও তো সংসার আছে।”

জীবনের এই শেষ প্রান্তে এসে অবসরে যাওয়ার খুব ইচ্ছে তাঁর। কিন্তু অবসর মানে যে থেমে যাওয়া, সেটুকু সামর্থ্যও তাঁর নেই। তাই ৬৭ বছর বয়সে দাঁড়িয়েও খোকন নাথকে অপেক্ষা করতে হচ্ছে—কাগজে-কলমে ৬৫ বছর হওয়ার জন্য।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য মাহবুব বলেন, “খোকন নাথ খুবই অসহায়। শুনেছি তাঁর স্ত্রীও দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। আগে তাঁকে বয়স্ক ভাতার আওতায় আনার চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু তখন জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী বয়স ৬৫ না হওয়ায় তা সম্ভব হয়নি।” খোকন নাথের নামে একটি চালের কার্ড রয়েছে বলেও জানান তিনি।