শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

পোস্টাল ভোটে আগ্রহের শীর্ষে সাতকানিয়া-লোহাগাড়া, তলানিতে পটিয়া

রবিউল হোসেন | প্রকাশিতঃ ১২ জানুয়ারী ২০২৬ | ৬:৩৮ অপরাহ্ন


ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাকি আর মাত্র এক মাস। ভোটের মাঠে হিসাব-নিকাশ যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে, তখন নির্বাচনের ফলাফলে বড় নিয়ামক হয়ে উঠতে যাচ্ছে প্রবাসীদের ভোট। এবারের নির্বাচনেই প্রথমবারের মতো প্রবাসীরা নিজ অবস্থান থেকে ‘পোস্টাল ব্যালটে’ ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন। নির্বাচন কমিশনের ‘পোস্টাল বিডি’র মাধ্যমে দক্ষিণ চট্টগ্রামের ছয়টি সংসদীয় আসনে প্রায় ৪০ হাজার প্রবাসী ভোট দেওয়ার জন্য নিবন্ধন করেছেন। এর মধ্যে আগ্রহের তুঙ্গে রয়েছে চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসন, আর তালিকার একেবারে তলানিতে অবস্থান চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসনের।

জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে সম্মুখ সারিতে থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন প্রবাসীরা। তাই ভোটের মাঠে তাঁদের সমর্থন কোন দিকে যায়, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা।

নির্বাচন কমিশনের ‘পোস্টাল বিডি’ ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত আবেদনের সময়সীমা শেষে দক্ষিণ চট্টগ্রামের ছয়টি আসনে মোট ৩৮ হাজার ৩৭২ জন প্রবাসী ভোটার নিবন্ধন করেছেন। এর মধ্যে নিবন্ধনে এককভাবে আধিপত্য দেখিয়েছে চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসন। এই আসনে মোট ১৪ হাজার ৩০১ জন প্রবাসী ভোট দেওয়ার জন্য আবেদন করেছেন। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী) আসন, যেখানে নিবন্ধিত প্রবাসী ভোটারের সংখ্যা ৬ হাজার ৭৬৩ জন।

তালিকায় এরপর রয়েছে চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী-চান্দগাঁও) আসন, সেখানে আবেদন করেছেন ৫ হাজার ৬০৫ জন। চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ-সাতকানিয়া) আসনে ৫ হাজার ২৮৪ জন এবং চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) আসনে ৩ হাজার ২১৯ জন প্রবাসী ভোটার হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। বিপরীতে সবচেয়ে কম সাড়া মিলেছে চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসনে। এই আসনে নিবন্ধন করেছেন মাত্র ৩ হাজার ২০১ জন প্রবাসী।

নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী, প্রতীক বরাদ্দের পর প্রবাসীদের ঠিকানায় ব্যালট পেপার পাঠানো হবে। ভোটের আগেই ওই ব্যালট পুনরায় দেশে ফেরত পাঠাতে হবে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের দিন বা তার আগে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে ব্যালট পৌঁছালে সেগুলো মূল গণনায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

প্রবাসীদের ভোট নিজেদের বাক্সে টানতে প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপও কম ছিল না। বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াতের একাধিক প্রার্থী এর মধ্যে কয়েক দফা বিদেশ সফর করেছেন। প্রার্থীদের পাশাপাশি তাঁদের কর্মী-সমর্থকরাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জোর প্রচার চালাচ্ছেন। স্থানীয় বিশ্লেষকদের ধারণা, দক্ষিণ চট্টগ্রামের বেশ কিছু আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যেখানে এই ৪০ হাজার প্রবাসীর ভোট জয়-পরাজয়ের ব্যবধান গড়ে দিতে পারে।

দীর্ঘ ৫৪ বছরের অপেক্ষার অবসান হওয়ায় উচ্ছ্বসিত প্রবাসীরা। সৌদি আরব প্রবাসী ও পটিয়া আসনের ভোটার মোহাম্মদ মুরাদ বলেন, “২০১৮ সালে ভোটার হলেও কখনো ভোট দিতে পারিনি। ৫৪ বছরে অনেক শাসক এলেও কেউ প্রবাসীদের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দিতে পারেনি। ড. ইউনূস সরকারের সহযোগিতায় এবার আমরা ভোটাধিকার ফিরে পেয়েছি, এ জন্য কৃতজ্ঞতা জানাই।”

কাতার প্রবাসী শাহাদাত হোসেনও পটিয়া আসনের ভোটার। এবারই প্রথম প্রবাস থেকে তিনি ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। শাহাদাত বলেন, “ভোটার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হতে পেরে আমি গর্বিত। তবে ভোটপ্রক্রিয়া কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য করতে স্বচ্ছতা, নিরাপত্তা এবং নিরপেক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।”

বেশ কয়েকজন প্রবাসী জানিয়েছেন, কোন প্রতীকে ভোট দিচ্ছেন তা প্রকাশ হওয়ার আশঙ্কায় তাঁদের কেউ কেউ নিবন্ধন করেননি। তবে নির্বাচন কমিশন (ইসি) ভোটারদের গোপনীয়তার শতভাগ সুরক্ষা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে। ইসি জানিয়েছে, একই সঙ্গে রিয়েল-টাইম ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে ব্যালট কখন পৌঁছাবে, সেই তথ্যও নিবন্ধনকারীরা জানতে পারবেন। নিয়ম অনুযায়ী, প্রতীক বরাদ্দের পর প্রবাসীদের ঠিকানায় ব্যালট পেপার পাঠানো হবে। ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের দিন বা তার আগে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে ব্যালট পৌঁছালে সেগুলো মূল গণনায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হতে যাচ্ছে। সে ক্ষেত্রে সঠিকভাবে পোস্টাল ব্যালট প্রয়োগ হলে তা অনেক আসনেই জয়-পরাজয়ের নির্ণায়ক হয়ে দাঁড়াবে। প্রবাসীদের ভোট নিজেদের বাক্সে টানতে প্রার্থীরাও মরিয়া হয়ে প্রচার চালাচ্ছেন।

তবে পোস্টাল ভোটে কিছুটা জটিলতার আশঙ্কা করছেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা। এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, “পোস্টাল ভোটের একাধিক ধাপ আছে। সেগুলো ঠিকভাবে প্রয়োগ না হলে জটিলতা সৃষ্টি করবে। কারণ এগুলো অদৃশ্য। এখানে কারসাজির অভিযোগও উঠতে পারে। তবে আমি মনে করি নির্বাচন কমিশন সঠিকভাবে করবে। তবু ঝুঁকি থেকেই যায়।”