
সরকার পতনের পর থেকে আত্মগোপনে থাকা চট্টগ্রাম উত্তর জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মো. এরাদুল হক নিজামী ভুট্টোকে বাঁচাতে এবার ঢাল হয়ে দাঁড়ানোর অভিযোগ উঠেছে খোদ চট্টগ্রাম জেলা রেজিস্ট্রার খন্দকার জামিলুর রহমানের বিরুদ্ধে। হত্যাসহ একাধিক মামলার আসামি এবং দীর্ঘ সময় ধরে কর্মস্থলে অনুপস্থিত এই কর্মচারীকে বরখাস্তের বদলে দেওয়া হয়েছে সুবিধাজনক বদলি এবং দীর্ঘমেয়াদি ছুটি।
অভিযোগ উঠেছে, নিজের এক সময়ের বিশ্বস্ত ‘সহকারী’কে আইনের হাত থেকে বাঁচাতেই খন্দকার জামিলুর রহমানকে বিশেষ মিশনে চট্টগ্রাম জেলা রেজিস্ট্রার পদে পদায়ন করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে চট্টগ্রাম সদর সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের অফিস সহকারী এরাদুল হক নিজামী ভুট্টো লাপাত্তা। অথচ তাকে পলাতক না দেখিয়ে লোহাগাড়ার আধুনগর সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে বদলি করা হয়। সেখানেই শেষ নয়, বদলির পর ছুটির আবেদনও করা হয়েছে ভুট্টোর পক্ষ থেকে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, খন্দকার জামিলুর রহমান আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দীর্ঘ সময় চট্টগ্রাম সদরের সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, বিগত সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট এই কর্মকর্তা দলীয় প্রভাব কাজে লাগিয়ে বরাবরই ভালো ও সুবিধাজনক জায়গায় পোস্টিং বাগিয়ে নিতেন। অতীতে তিনি যখন দাপটের সাথে সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে কর্মরত ছিলেন, তখনই মো. এরাদুল হক নিজামী ভুট্টো তার সহকারী হিসেবে কাজ করতেন।
দাপ্তরিক নথিপত্রে সহকারী হলেও অনানুষ্ঠানিকভাবে ভুট্টো ছিলেন জামিলুরের ‘ক্যাশিয়ার’। সেই পুরোনো সখ্যের জেরেই বর্তমান পরিস্থিতিতে ভুট্টোকে রক্ষা করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন জেলা রেজিস্ট্রার। বিধি অনুযায়ী দীর্ঘদিন অনুপস্থিত কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা ও বরখাস্তের বিধান থাকলেও, এক্ষেত্রে ‘লঘু পাপে গুরু দণ্ড’ তো দূরের কথা, উল্টো ‘পুরস্কার’ হিসেবে শহর থেকে সুবিধাজনক স্থানে বদলি করা হয়েছে।
এই অনিয়মের চিত্র কেবল বদলি বা ছুটির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। খোদ সরকারি তথ্য বাতায়নেও (ওয়েবসাইট) লুকোচুরি খেলছেন জেলা রেজিস্ট্রার। চট্টগ্রাম জেলা রেজিস্ট্রারের অফিসিয়াল প্রোফাইলে যোগাযোগের জন্য যে মুঠোফোন নম্বরটি (০১৭৫১০৬৯৬৯৬) দেওয়া আছে, সেটি খন্দকার জামিলুর রহমানের নয়।
সেবাগ্রহীতারা অভিযোগ করেছেন, জরুরি প্রয়োজনে ওই নম্বরে ফোন করলে ওপাশ থেকে জানানো হয় এটি জেলা রেজিস্ট্রারের নম্বর নয়। একটি দায়িত্বশীল সরকারি পদে থেকে ওয়েবসাইটে ভুল নম্বর দিয়ে রাখা নিজেকে আড়াল করার কৌশল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিশেষ করে যখন দপ্তরের রেকর্ড রুম থেকে নথি চুরির মতো স্পর্শকাতর ঘটনা ঘটছে এবং দপ্তরপ্রধান হিসেবে তিনি কোনো জবাবদিহিতা করছেন না। সম্প্রতি চট্টগ্রাম জেলা রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ের রেকর্ড রুম থেকে গুরুত্বপূর্ণ বালাম ও নথি চুরির ঘটনায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়। ওই ঘটনায় নকল নবিশ লাইক আলী বিশ্বাস হাতেনাতে ধরা পড়ার পর তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলেও আড়ালে থেকে যায় মূল হোতারা। অভিযোগ রয়েছে, চুরির ঘটনার সময় রেকর্ড রুমের চাবি যাদের জিম্মায় ছিল, সেই সাব-রেজিস্ট্রার আব্দুস সোবহান এবং রেকর্ড কিপার অঞ্জনা সেনের ভূমিকা রহস্যজনক হলেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং নথি চুরির ঘটনা ধামাচাপা দিতেই তড়িঘড়ি করে ছুটিতে গিয়েছিলেন জেলা রেজিস্ট্রার খন্দকার জামিলুর রহমান।
সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, খন্দকার জামিলুর রহমান ও আব্দুস সোবহানের মতো শীর্ষ কর্মকর্তাদের উদাসীনতা এবং অঞ্জনা সেনের মতো দায়িত্বশীলদের অদক্ষতার সুযোগেই রেকর্ড রুম থেকে নথিপত্র গায়েব হচ্ছে, যা ভূমির মালিকদের জন্য অশনিসংকেত। সচেতন মহলের মতে, যদি ওয়েবসাইটটিতে নথি সংরক্ষণ ও ট্র্যাকিংয়ের আধুনিক ব্যবস্থা বা স্বচ্ছ জবাবদিহিতা থাকত, তবে এই অনিয়ম অনেকটাই কমে যেত।
এর আগে গত ডিসেম্বরে তৎকালীন জেলা রেজিস্ট্রার মিশন চাকমা দাবি করেছিলেন, ভুট্টো চিকিৎসা ছুটিতে আছেন। তবে অনুসন্ধানে দেখা গিয়েছিল, কোনো চিকিৎসাপত্র ছাড়াই সেই ছুটির গল্প সাজানো হয়েছিল। এখন নতুন জেলা রেজিস্ট্রার খন্দকার জামিলুর রহমান সেই একই পথ ধরে ভুট্টোকে আধুনগরে পাঠিয়ে এবং ছুটির আবেদন গ্রহণ করে কার্যত তাকে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও বিভাগীয় তদন্ত থেকে নিরাপদ দূরত্বে রাখার ব্যবস্থা করেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, মূলত ভুট্টোকে সেইফ প্যাসেজ দিতেই জামিলুর রহমানকে এখানে আনা হয়েছে। আধুনগরে বদলি মূলত একটি আইওয়াশ, যাতে তিনি শহরের বাইরে নিরাপদে থাকতে পারেন।
সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা অনুযায়ী, ফৌজদারি মামলার আসামি এবং দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত ব্যক্তির বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা থাকলেও, জেলা রেজিস্ট্রারের এমন ভূমিকা প্রশাসনের স্বচ্ছতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
এসব গুরুতর অনিয়ম ও যোগসাজশের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে নিজের দায় এড়ানোর চেষ্টা করেন চট্টগ্রাম জেলা রেজিস্ট্রার খন্দকার জামিলুর রহমান। হত্যা মামলার আসামি ও দীর্ঘদিন পলাতক কর্মচারীকে বরখাস্ত না করে উল্টো বদলি করার যৌক্তিকতা জানতে চাইলে তিনি কৌশলে নিজের কাঁধ থেকে দায় ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করেন। তিনি দাবি করেন, পুরো বিষয়টি আইজিআর (মহা-পরিদর্শক, নিবন্ধন) এর নির্দেশেই হয়েছে। অর্থাৎ, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দোহাই দিয়ে তিনি এই বেআইনি প্রক্রিয়াকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন এবং নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের প্রয়াস চালিয়েছেন।
আধুনগরে যোগদানের পর এরাদুল হক নিজামী ভুট্টোকে ৩০ দিনের ছুটি দেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে খন্দকার জামিলুর রহমান বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, ভুট্টো ছুটির আবেদন করেছেন, কিন্তু তা মঞ্জুর করা হয়নি। অথচ একজন ফেরারি আসামি কীভাবে কর্তৃপক্ষের কাছে ছুটির আবেদন করতে পারেন এবং সেই আবেদন গ্রহণ করা হয়, সে বিষয়ে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
এছাড়া অতীতে সাব-রেজিস্ট্রার থাকাকালে মো. এরাদুল হক নিজামী ভুট্টো তার ‘ক্যাশিয়ার’ হিসেবে কাজ করতেন—এমন অভিযোগ উঠলে তিনি তা সরাসরি অস্বীকার করেন। দপ্তরে কোনো ক্যাশিয়ার থাকে না বলে দাবি করে তিনি অতীতের সেই ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিষয়টি এড়িয়ে যান।
অন্যদিকে, সরকারি ওয়েবসাইটে ভুল নম্বর দিয়ে নিজেকে আড়াল করার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে খন্দকার জামিলুর রহমান অদ্ভুত যুক্তি দেখান। তিনি বলেন, অফিসের বিষয়গুলো অফিস রক্ষণাবেক্ষণ করে এবং ওয়েবসাইটে প্রদর্শিত নম্বরটি আগের জেলা রেজিস্ট্রারের। দপ্তরপ্রধান হিসেবে নিজের সঠিক তথ্য হালনাগাদ না করে তিনি অফিসের ওপর দায় চাপানোর অপচেষ্টা করেন।