শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

৩ মাসে নিষ্পত্তির আইন, অথচ ১১ মাসেও তদন্ত শেষ করেননি বোয়ালখালীর এসিল্যান্ড

মোহাম্মদ বেলাল উদ্দিন | প্রকাশিতঃ ১৪ জানুয়ারী ২০২৬ | ১২:১০ পূর্বাহ্ন


ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনের ৮ ধারা অনুযায়ী মামলা দায়েরের তিন মাসের মধ্যে বিচার নিষ্পত্তির বাধ্যবাধকতা থাকলেও চট্টগ্রামের বোয়ালখালীতে ১১ মাসে তদন্তই শেষ হয়নি। আদালতের আদেশ উপেক্ষা করে মাসের পর মাস তদন্ত প্রতিবেদন আটকে রেখেছেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ড কানিজ ফাতেমা।

আইনানুযায়ী, নির্ধারিত সময়ে কাজ না করলে বা অবহেলা করলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। খোদ বিভাগীয় কমিশনারও জানিয়েছেন, গাফিলতি প্রমাণ হলে এসিল্যান্ডকে শোকজ করা হবে।

আইন কী বলছে?

ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩-এর ৮(৪) ধারায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, কোনো আবেদন প্রাপ্তির পর হতে ৩ (তিন) মাসের মধ্যে তা নিষ্পত্তি ও প্রযোজ্য ক্ষেত্রে দখল পুনরুদ্ধার করতে হবে। একই ধারায় আরও বলা হয়েছে, “কোনো কর্মকর্তা বা কর্তৃপক্ষ উহাতে অসহযোগিতা বা অবহেলা করিলে তাহার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাইবে”।

অথচ বোয়ালখালীতে এসিল্যান্ড কানিজ ফাতেমা এই আইনের তোয়াক্কা না করে ১১ মাসেও একটি মামলার (পিটিশন মামলা নং ০৫/২০২৫) তদন্ত প্রতিবেদন দেননি।

চোখের সামনেই ঘটনাস্থল, তবু তদন্তে অনীহা

গত ১১ মাসে যিনি একবারও তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেননি, মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) বিকেলে সাংবাদিকের একটি ফোন কলের পরই পাল্টে যায় দৃশ্যপট। অথচ অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এসিল্যান্ডের দায়িত্বহীনতার বিস্ময়কর চিত্র।

সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য হলো, বিরোধপূর্ণ ওই ভূমির অবস্থান এসিল্যান্ডের সরকারি বাসভবন থেকে মাত্র ১০০ হাত এবং তার কার্যালয় থেকে আনুমানিক ৫০০ হাত দূরে। প্রতিদিন দাপ্তরিক কাজে ও ব্যক্তিগত প্রয়োজনে তিনি সকাল-বিকেল একাধিকবার এই বিরোধপূর্ণ জায়গার পাশ দিয়ে যাতায়াত করেন। চোখের সামনেই ঘটনাস্থল থাকার পরও তিনি গত ১১ মাসে একবারের জন্যও গাড়ি থামিয়ে তদন্ত করার প্রয়োজন বোধ করেননি বা প্রতিবেদন দাখিল করেননি।

ফোনের পরই ‘নাটকীয়’ দৌড়ঝাঁপ

গত ১১ মাসে যিনি একবারও ঘটনাস্থলে তদন্ত করতে যাননি, মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) বিকেলে একুশে পত্রিকার সাংবাদিকের একটি ফোন কলের পরই পাল্টে যায় দৃশ্যপট।

প্রতিবেদক যখন মঙ্গলবার বিকেলে এসিল্যান্ড কানিজ ফাতেমার বক্তব্য নেওয়ার জন্য ফোন করেন, তখন তিনি বিষয়টি সম্পর্কে ‘কিছুই জানেন না’ বলে ভান করেন। তিনি দাবি করেন, ডকেট নম্বর ছাড়া ফাইল খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয় এবং হাজার হাজার রিপোর্টের ভিড়ে এটি মনে রাখা কঠিন।

অথচ ফোন রাখার ঠিক পরপরই তিনি কানুনগো ও সহকর্মীদের নিয়ে তড়িঘড়ি করে ঘটনাস্থলে ছুটে যান। স্থানীয়রা প্রশ্ন তুলেছেন, যে রাস্তা দিয়ে এসিল্যান্ড প্রতিদিন চলাচল করেন, সেই রাস্তার ধারের জমি চিনতে বা ফাইল খুঁজে পেতে তার ১১ মাস সময় লাগল কেন? সাংবাদিক ফোন করার পরই কি তার মনে পড়ল এটি তার বাসভবনের মাত্র ১০০ হাত দূরে?

অভিযোগ উঠেছে, নিজের দীর্ঘদিনের গাফিলতি ও আইনি দায় এড়াতেই তড়িঘড়ি করে এই তদন্ত-নাটকের অবতারণা করেছেন তিনি।

মামলার প্রেক্ষাপট ও হয়রানি

মামলার নথিপত্রে দেখা যায়, বোয়ালখালী উপজেলার পূর্ব গোমদণ্ডী এলাকার আবদুল মাবুদ চৌধুরী বাদী হয়ে ২০২৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আদালতে মিস মামলা (ভূমি অপরাধ) দায়ের করেন। আদালত বোয়ালখালীর এসিল্যান্ডকে সরেজমিনে তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেন। আইনের ৮(৩) ধারা অনুযায়ী সরেজমিনে তদন্ত বাধ্যতামূলক।

বাদী আবদুল মাবুদ চৌধুরী অভিযোগ করেন, “রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর স্থানীয় বিএনপি নামধারী কিছু নেতার প্রভাবে এসিল্যান্ড প্রতিবেদন দিচ্ছেন না। গত বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর আমি আদালতে তাগিদ পিটিশনও দিয়েছি, কিন্তু এসিল্যান্ড আইনের তোয়াক্কা করছেন না।”

তিনি আরও বলেন, “আইন বলছে ৩ মাসে বিচার পাওয়ার কথা, আর আমি ১১ মাস ধরে এসিল্যান্ড অফিসের বারান্দায় ঘুরছি। সাংবাদিক ফোন করার পর এখন তিনি দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন।”

বিভাগীয় ব্যবস্থা ও উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ে মামলা নিষ্পত্তি না করা এবং আদালতের আদেশ পালন না করা ‘পেশাগত অসদাচরণ’ ও ‘অবহেলা’ হিসেবে গণ্য হতে পারে। ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনের ৮(৪) ধারা অনুযায়ী ভুক্তভোগী এখন এসিল্যান্ডের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন করতে পারেন।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন বলেন, “উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ না থাকলে নির্ধারিত সময়ে প্রতিবেদন জমা দেওয়া উচিত ছিল। সরকার পরিবর্তনের পর কেউ ভয়ে কাজ করবে না, এমন নির্দেশনা নেই। আমরা নিরপেক্ষভাবে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছি।”

এসিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “অবশ্যই সুযোগ আছে। ভুক্তভোগী যদি আমাদের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন, তবে আমরা ওই কর্মকর্তাকে (এসিল্যান্ড) শোকজ করব। সদুত্তর না মিললে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

আইনজ্ঞদের মতে, প্রতিদিন ঘটনাস্থলের পাশ দিয়ে যাতায়াত করার পরও ১১ মাস তদন্ত না করা কেবল অবহেলা নয়, বরং এটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অসদাচরণ। এখন দেখার বিষয়, দীর্ঘসূত্রতার জন্য দায়ী এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রশাসন কী ব্যবস্থা নেয়।