শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

‘বোনের রক্ত বৃথা যেতে দেব না’

কাঁটাতারে বিদ্ধ ফেলানীর স্মৃতি বুকে নিয়েই সীমান্ত রক্ষায় ভাই আরফানের শপথ
মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন | প্রকাশিতঃ ১৪ জানুয়ারী ২০২৬ | ৫:৫৪ অপরাহ্ন


পনেরো বছর আগের কথা। কুড়িগ্রাম সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়ায় ঝুলে ছিল এক কিশোরীর নিথর দেহ। সেই দৃশ্য দেখে কেঁদেছিল বিশ্ববিবেক, কেঁপে উঠেছিল পুরো বাংলাদেশ। ফেলানী খাতুন নামের সেই কিশোরীর মর্মান্তিক মৃত্যুর স্মৃতি আজও অনেকের হৃদয়ে দগদগে। সেই বিষাদময় অতীতকে শক্তিতে রূপান্তর করে এবার সীমান্ত রক্ষার মহান ব্রত নিলেন ফেলানীরই ছোট ভাই আরফান হোসেন।

বুধবার (১৪ জানুয়ারি) চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার বাইতুল ইজ্জতে বর্ডার গার্ড ট্রেনিং সেন্টার অ্যান্ড কলেজে অনুষ্ঠিত বিজিবির ১০৪তম রিক্রুট ব্যাচের সমাপনী কুচকাওয়াজে দৃপ্ত পায়ে মার্চ পাস্ট করেছেন আরফান হোসেন। বিজিবি সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার সময় তার চোখেমুখে ছিল স্বজন হারানোর বেদনা, আর হৃদয়ে ছিল মাতৃভূমির সীমান্ত আগলে রাখার ইস্পাতকঠিন প্রতিজ্ঞা।

শপথ গ্রহণ শেষে আরফান হোসেনের কণ্ঠে ঝরল আবেগঘন এক প্রত্যয়। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “২০১১ সালে আমার বয়স ছিল মাত্র সাত-আট বছর। তখনই আমার বড় বোন ফেলানী খাতুনকে বিএসএফ গুলি করে হত্যা করে কাঁটাতারে ঝুলিয়ে রাখে। সেই দৃশ্য আমি ভুলিনি। সেই দিন থেকেই আমার মা-বাবার স্বপ্ন ছিল—আমি যেন দেশের জন্য, সীমান্তের জন্য কাজ করি। আজ আমি বিজিবির সৈনিক, আমার মা-বাবার সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে।”

বুকের ভেতর জমে থাকা কান্না চেপে রেখে নবীন এই সৈনিক বলেন, “যে সীমান্তে আমার বোনকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল, আজ সেই সীমান্ত রক্ষার দায়িত্ব আমার কাঁধে। আমি প্রতিজ্ঞা করছি, আমার বোনের রক্ত বৃথা যেতে দেব না। আমি চাই না, আমার বোনের মতো আর কোনো মেয়ে এভাবে প্রাণ হারাক। জীবন দিয়ে হলেও আমি চেষ্টা করব—কোনো মা-বাবাকে যেন তাদের সন্তান হারাতে না হয়।”

জানা গেছে, নাখারগঞ্জ হাইস্কুল থেকে ২০২২ সালে এসএসসি এবং ২০২৪ সালে স্থানীয় ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন আরফান হোসেন। তিন ভাই ও দুই বোনের সংসারে তিনি বেড়ে উঠেছেন অভাব আর শোকের ছায়ায়। গত বছর বিজিবির নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেখে আবেদন করেন তিনি। এরপর চার মাসের কঠোর প্রশিক্ষণ শেষে আজ তিনি দাঁড়িয়েছেন ‘বীর উত্তম মজিবুর রহমান প্যারেড গ্রাউন্ডে’।

এক সময় যে সীমান্ত আরফান হোসেনের পরিবারকে উপহার দিয়েছিল শুধুই লাশ আর কান্না, আজ সেই সীমান্তেই প্রহরী হিসেবে দাঁড়ালেন তিনি। ফেলানীর রক্তাক্ত স্মৃতির ওপর দাঁড়িয়ে ভাই আরফান হোসেনের এই শপথ যেন সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরীদের জন্য এক নতুন অনুপ্রেরণা।