চট্টগ্রাম: পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু হত্যার ঘটনায় কামরুল ইসলাম সিকদার ওরফে মুছাকে পুলিশ আটক করেছে দাবি করে তার সন্ধান চেয়েছেন স্ত্রী পান্না আক্তার। সোমবার চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ দাবি জানান।
মুছাকে গ্রেফতারের বর্ণনা দিয়ে পান্না আক্তার জানান, মুছা, পান্না ও তাদের দুই ছেলে এবং মুছার বড় ভাই সাইদুল ইসলাম সিকদার নগরীর বন্দর এলাকায় এক আত্মীয়ের বাসায় গিয়েছিলেন। ২২ জুলাই সকাল ৭টার দিকে তাদের নজরবন্দি করে পুলিশ। সকাল ৯টার দিকে একদল পুলিশ ওই বাসা থেকে মুছা ও তার ভাইকে নিয়ে যায়। এরপর বাকিদের ছেড়ে সকাল ১১টার দিকে পুলিশ ওই বাসা ত্যাগ করে।
অভিযানে অংশ নেয়াদের মধ্যে বন্দর থানার ওসি একেএম মহিউদ্দিন সেলিম এবং পুলিশ পরিদর্শক (ইমিগ্রেশন) নেজাম উদ্দিনকে চিনতে পেরেছেন বলেও জানান মুছার স্ত্রী পান্না আক্তার।
তবে মুছাকে আটকের বিষয়টি অস্বীকার করে বন্দর থানার ওসি একেএম মহিউদ্দিন সেলিম ও পরিদর্শক নেজাম উদ্দিন। একেএম মহিউদ্দিন সেলিম বলেন, ‘আমি তো এই মামলা তদন্ত করছিনা, আমি কেন মুছাকে গ্রেফতার করতে যাব?’ নেজাম উদ্দিন বলেন, ‘মামলা তদন্তের সাথে আমি যুক্ত নই। বিমানবন্দরে আমার পোস্টিং। অভিযানে যাওয়ার প্রশ্নই উঠে না।’
সংবাদ সম্মেলনে পান্না বলেন, আটকের ১০ দিন পর গত শুক্রবার মুছার বড় ভাই সাইদুল ইসলাম সিকদারকে রাঙ্গুনিয়া থানার একটি মামলায় গ্রেফতার দেখিয়েছে পুলিশ। কিন্তু গত ১৩ দিন ধরে মুছার কোন খোঁজ পাচ্ছি না। আমি রাঙ্গুনিয়া ও বাকলিয়া থানায় জিডি করতে গিয়েছিলাম। কিন্তু তারা আমার জিডি গ্রহণ করেনি। মুছাকে আটকের পর পুলিশ কয়েকদিন আমাদেরকে নজরবন্দী করে রেখেছিল।
কান্নাজড়িত কন্ঠে পান্না আক্তার বলেন, মুছা দোষ করলে অবশ্যই দোষী হবে, সাজা পাবে। তাকে আইনের কাছে সোপর্দ করা হোক। তাকে আদালতে হাজির করা হোক। বিচারে যেটা হবে সেটা আমরা মেনে নেব। কিন্তু তাকে মেরে ফেলার কথা আসছে কেন? মুছার ভাগ্যে কি ঘটেছে আমাদের জানান। আমি স্ত্রী হিসেবে আমার স্বামীকে জীবিত ফেরত চাই। আমার ধারণা সে বেঁচে আছে। অনেকে বলছে তাকে মেরে ফেলা হয়েছে, আমি এটা বিশ্বাস করি না।
মিতু হত্যাকান্ডের সময় মুছা নিজের বাসায় ছিল দাবি করে পান্না আক্তার বলেন, এসময় সে বসে বসে টিভি দেখছিল। আমি রমজানের বাজার গুছিয়ে রাখছিলাম। সে খুব নরমাল ছিল। এখন শুনছি মুছা নাকি খুনের নির্দেশদাতা। মুছা কেন খুন করতে যাবে? তার কি স্বার্থ? মুছাকে আদালতে হাজির করা হোক। তারপর সবকিছু পরিস্কার হবে।
মুছার বিষয়ে পুলিশের কাছে জানতে চাইলে, কেউ কেউ বলেন, সে দেশের বাইরে চলে গেছে। সে কিভাবে বিদেশ যাবে? পাসপোর্ট-ভোটার আইডি কার্ড তো আমার কাছে রয়ে গেছে- যোগ করেন মুছার স্ত্রী পান্না আক্তার।
সিসিটিভি ফুটেজে মুছাকে ঘটনাস্থলে মুছাকে দেখা গেছে- এ তথ্যটি তুলে ধরা হলে পান্না বলেন, এটা সন্দেহ। মুছা কিনা নিশ্চিত নয় পুলিশ। তবে মুছা বিএনপি করত, এটাই তার দোষ।
মুছা ২০০৩ সাল থেকে প্রশাসনের সোর্স হিসেবে কাজ করছিল জানিয়ে পান্না আক্তার বলেন, মুছা আগে গাছের ব্যবসা করলেও এখন বালুর ব্যবসায় সম্পৃক্ত। তিনি ২০০২ সালে সৌদি আরব থেকে ফেরেন। ২০০৩ সাল থেকে সোর্স হিসেবে কাজ করায় অনেক অফিসারের সঙ্গেই মুছার ভাল সম্পর্ক ছিল। তবে পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের সোর্স হিসেবে মুছা কাজ করত কিনা সেটা আমার জানা নেই। আমি বাবুল আক্তারকে চিনি না। কখনও তার নাম শুনিনি। কখনও তার সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। বাবুল আক্তারের বিষয়ে কখনও আমার স্বামী আমাকে কিছু বলেনি। বাবুল আক্তারের সঙ্গে যদি আমার স্বামীর ভাল সম্পর্কই থাকে তাহলে তার স্ত্রীকে সে মারবে কেন?
এদিকে মিতু হত্যা মামলায় গ্রেফতার ওয়াসিম ও আনোয়ার ২৬ জুন আদালতে জবানবন্দিতে জানিয়েছেন, মুছা হত্যাকান্ডের পরিকল্পনাকারী। হত্যাকান্ডের আগের দিন তারা মুছার বাসায় ছিলেন। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে পান্না আক্তার বলেন, আমরা ফ্যামিলি বাসায় থাকি। তিন রুমের বাসার এক রুমে দুই ছেলে, এক রুমে আমরা এবং একসাথে ড্রইং ও ডাইনিং রুম। সেখানে বাইরের কোনো লোক গিয়ে থাকার অবস্থা নেই।
ছেলের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে বাবুল আক্তার মুছার বাসায় অতিথি হয়ে গিয়েছিলেন কিনা, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা ঘরোয়াভাবে জন্মদিন করেছি। ভালভাবে আত্মীয়স্বজনদেরও বলিনি। প্রশাসনের কাউকে বলিনি।
মিতু হত্যায় জড়িত সন্দেহে যে পাঁচজনের ওপর দেশ ছাড়ায় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে পুলিশ তাদের মধ্যে মুছাও আছেন। অপর চারজন হলেন- নুরুল ইসলাম ওরফে রাশেদ, নবী, শাহজাহান ও কালু।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন- মুছার দুই শিশু সন্তান শামসুদ্দোহা সিকদার সানি ও নূরুদ্দোহা সিকদার সানজু এবং শ্বশুর ফারুক সিকদার।