এক নবীন সহকারী জজের আকুতি…
আইনের ছাত্রদের জীবনের স্বপ্নের পরীক্ষা বিজেএস পরীক্ষা। সেই স্বপ্নপূরণের আশা নিয়ে ১০ম বিজেএস পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলাম। এটি ২০১৫ সালের নিয়োগ। অথচ সার্কুলার হয় এক বছর পরে অর্থাৎ ২০১৬ সালের মার্চ মাসের ৩ তারিখ। পদসংখ্যা ১১৫। প্রিলিমিনারি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় ২০১৬ সালের ২০ মে। প্রিলিমিনারির ফল প্রকাশিত হয় ২১ মে। লিখিত পরীক্ষা শুরু হয় ৩০ জুলাই ২০১৬ এবং সমাপ্ত হয় ৯ আগস্ট ২০১৬।
মাত্র ১২৪৮ পরীক্ষার্থীর খাতা মূল্যায়ন করে ফল প্রকাশিত হয় তিন মাস পর ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ভাইভা শুরু হয় ২৭ ডিসেম্বর ১৬, শেষ হয় ২২ জানুয়ারি ২০১৭। ফল প্রকাশিত হল ২৯ জানুয়ারি ২০১৭।
২০৭ জনকে বাংলাদেশে জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন থেকে সহকারী জজ হিসেবে সুপারিশপত্র ঘোষণা করা হয়। মেডিকেল টেস্ট হয় ৫ ও ৬ মার্চ ২০১৭। তারপর থেকে নিয়োগের জন্য দিনের পর দিন প্রহর গুণছি। মেধা ও পরিশ্রম দিয়ে বিজয়ী হয়ে আজ ভাগ্যচক্রে ঘুরছি।
২০১৭ সাল শেষ হল, এলো ২০১৮ সাল। আমাদের দিন পরিবর্তন হল না। আমরা ২০১৫ সালেই পড়ে রইলাম। চাকরি নামক ”প্রহসন” আমাদের জীবন থেকে কেড়ে নিল তিনটি বছর। আমরা মানবেতর জীবনযাপন করছি। চরম অবমাননাকর সময় পার করছি। নির্মম, নিষ্ঠুর আজ আমাদের পরিণতি।
আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও মাননীয় আইনমন্ত্রীর সদয় হস্তক্ষেপ কামনা করি। মহামান্য সুপ্রীম কোর্ট এর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
সংশ্লিষ্ট সকল কর্মকর্তাবৃন্দের নিকট দয়া ভিক্ষা চাচ্ছি। আমরা আর পারছি না। অপেক্ষার সময় কাটতেই চায় না। আমাদের জীবনের মুল্যবান সময় যেমন একদিকে নষ্ট হচ্ছে। তেমনি রাষ্ট্র আমাদের সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে । যে স্পিরিট এবং প্রেরণার জোয়ার আমাদের মাঝে ছিল তা দিন দিন কমে যাচ্ছে।
দয়া করে আমাদের বাঁচান, কতগুলো মেধাবী সন্তানকে বাঁচান। আমাদের পরিবারের আয়ের উৎস হিসেবে আমরা অবতীর্ণ হতে গিয়ে উল্টো আমরা এখন পরিবারের বোঝা। কারণ আমাদের সামাজিক স্ট্যাটাস বেড়েছে কিন্তু আয় বাড়েনি। এমতাবস্থায় রাষ্ট্রের নিকট আকুল আবেদন, প্লিজ ভবিষ্যৎ জজ সাহেবদের পরিবারগুলোকে বাচান।
আমরা পরিবারের সদস্যের নিকট প্রশ্নবিদ্ধ। সমাজের মানুষের বিদ্রুপের শিকার। বন্ধু মহলে হেয়প্রতিপন্ন হচ্ছি। দয়া করে আমাদের সম্মানটুকু রক্ষা করুন।
ভাইভা রেজাল্টের পর ৪-৬ মাস সময় মেনে নেওয়া যায়। একজন শিক্ষার্থী অনার্স শেষ করেই যদি সহকারী জজ হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়, তবে তার জন্য পরিবেশ পরিস্থিতি বোঝা অতটা সম্ভব হয়ে উঠে না। মেন্টাল ম্যাচুরিটির জন্য ৪-৬ মাস যথেষ্ট । কিন্তু তাই বলে ১২-১৪ মাস সময়টা আসলেই অনেক কঠিন।
আমার পরিচিত অনেকে এখন এমনভাবে কথা বলে বা এমনভাবে তাকায় যেন আমাদের চাকরি হয়নি। আমরা যেন একটা মিথ্যা প্রচার করেছি। যদিও আমার ক্ষেত্রে আমাকে অবিশ্বাস করার মত পরিচিতজনের সংখ্যা হাতেগোণা দু’একজন। কিন্তু আমার অনেক ব্যাচমেটদের ক্ষেত্রে এ সংখ্যাটা আশংকাজনক।
সত্যি কথা বলতে কী , বিয়ের পিঁড়িতে বসতে গেলেও মেয়ের বাবা বলে, ”ছেলের তো এখনো চাকরি হয়নি।” সত্যিই তো আমাদের তো এখনো চাকরি হইনি।
আমার সহ্যশক্তি প্রবল। আমি সহজে হতাশ হয়ে পড়ি না। তারপরও আমি মাঝেমাঝে হতাশ হয়ে পড়ি। এভাবে কতদিন বসে থাকা যায়। গেজেট হবে হবে এই আশায় কোনো প্রতিষ্ঠানেও যোগদান করি নাই। অনেকেই এখনো বেকার হিসেবে বাবার টাকায় দিন কাটাচ্ছি।
২৯ জানুয়ারি আমাদের সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার এক বছর পূর্ণ হবে। আল্লাহ আমাদের সহায় হন। আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও মাননীয় আইনমন্ত্রীর সদয় হস্তক্ষেপ কামনা করি। মহামান্য সুপ্রীম কোর্ট-এর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
-নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক