সাফওয়ান আরহাম মাহমুদ : তখন আমি অনেক ছোট। স্কুল থেকে ফিরে দেখি বাসায় অনেক লোকের ভিড়। চাচা-ফুফুসহ অনেক আত্মীয়স্বজন এসেছেন। সিঁড়ি দিয়ে লোকজন ওঠানামা করছেন। দাদাভাইয়ের রুমের সামনে অনেকেই দাঁড়িয়ে আছেন, দরজা বন্ধ।
কী হয়েছে বুঝতে না পেরে আম্মুকে খুঁজছিলাম। আম্মুর রুমে গিয়ে দেখি আম্মুর মন খুবই খারাপ। কী হয়েছে জিজ্ঞেস করাতে আম্মু কিছু না বলে আমাকে জড়িয়ে ধরলো। আমি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। কিন্তু আমার অনেক কান্না পাচ্ছিলো।
আর মনে হচ্ছিল দাদাভাইয়ের কিছু হয়েছে। আমি দাদাভাইয়ের রুমে যেতে চাচ্ছিলাম। কিন্তু কেউ আমােক সেদিকে যেতে দিচ্ছিল না। তখন আমি মন খারাপ করে কাপড় বদলে আসলাম। সবাই শুধু দাদাভাইকে নিয়ে কথা বলছিলো। এর মধ্যে আব্বু চলে আসলো।
আমার মনে অনেক প্রশ্ন। ইচ্ছে করলো আব্বুকে জিজ্ঞেস করি। কিন্তু আব্বুর মুখের দিকে তাকিয়ে কিছুই বলতে পারিনি। সবার মতো আব্বুরও অনেক মন খারাপ। আম্মুর সাথে দাদাভাইকে নিয়ে কথা বলছেন, তখন জানতে পারলাম দাদাভাই অসুস্থ, হাসপাতালে আছেন। সেদিন আমি আব্বুর সব কথা শুনতে পারিনি বা শুনলেও ছোট বলে বুঝে উঠতে পারিনি যে আমার দাদাভাই মারা গিয়েছেন।
আমি কখনও আমার আব্বুকে কাঁদতে দেখিনি। সেদিন আব্বু অনেক কান্না করেছিল। সবার কান্না দেখে আমিও অনেক কেঁদেছিলাম।
এখন আমি বুঝতে পারি। তাই যতবার দাদাভাইয়ের কথা মনে হয় ততবার মন খারাপ হয়, চোখে পানি চলে আসে। দাদাভাইয়ের সাথে আমার অনেক স্মৃতি। স্কুল থেকে এসে দাদাভাইয়ের সাথে খেলা করতাম। খেলা শেষে যখন উপরে যেতাম তখন দাদাভাই আমার হাত ধরে সিঁড়িতে উঠতেন। আমি শক্ত করে দাদাভাইয়ের হাত ধরে থাকতাম। দুপুরে খাওয়ার পর দাদাভাইয়ের হাত-পা টিপে দিতাম। প্রতিদিন দাদাভাই আমাকে গল্প শোনাতেন। গল্প শুনতে শুনতে আমি দাদাভাইয়ের সাথে ঘুমিয়ে যেতাম।

মনে পড়ে সানগ্লাস পরে দাদাভাইয়ের সামনে হাজির হতাম, তাঁর কোলে বসে গল্প শুনতাম। আমাদের একটি ছাগল ছিল। সে ছিল খুব রাগি। সে সব সময় আমাকে চড়াত, আমি তাতে মজা পেতাম আর দাদাভাইকে দেখাতাম।
দাদাভাইয়ের কথা খুব মনে পড়ে। যখন গ্রামে যাই দাদাভাইয়ের কবরের কাছে দাঁড়াই। তখন মনে হয় এত তাড়াতাড়ি কেন দাদাভাই চলে গেলেন! তখন আমার অনেক কান্না পায়।
দাদাভাইকে অনেক ভালবাসি। যতদিন বেঁচে থাকবো ভালোবাসব। দাদাভাইয়ের স্থান আমার কাছে সবার উপরে। সবাই বলে, আমি নাকি দাদাভাইয়ের মত দেখতে। আমার সেটা খুব ভালো লাগে।
[রাজধানীর স্কলাস্টিকা স্কুলের ৪র্থ শ্রেণীর শিক্ষার্থী সাফওয়ান আরহাম মাহমুদ চট্টগ্রামের খ্যাতনামা আইনজীবী প্রয়াত নুরুচ্ছফা তালুকদারের পৌত্র এবং সাবেক মন্ত্রী, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ-এর একমাত্র ছেলে। ২ ফেব্রুয়ারি ছিল অ্যাডভোকেট নুরুচ্ছফা তালুকদারের ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১১ সালের এইদিনে তিনি যখন প্রয়াত হন, সাফওয়ান আরহাম মাহমুদ-এর বয়স তখন সাড়ে চার বছর।
বলাবাহুল্য, বোধ-বুদ্ধি-স্মৃতিশক্তি ডানা মেলার সময়টাতে দাদাভাইয়ের সান্নিধ্য, বন্ধুপ্রতীম সঙ্গ পেয়েছে আরহাম। দাদার ষষ্ঠ প্রয়াণ দিবসে সেই সুখ-সান্নিধ্যের স্মৃতিগুলো তিন পৃষ্ঠার কাগজে লিখে একুশে পত্রিকার কাছে পাঠিয়েছে শিশু আরহাম। পাঠকদের জন্য তা হুবহু প্রকাশ করা হলো।]