শনিবার, ১৩ জুলাই ২০২৪, ২৯ আষাঢ় ১৪৩১

বিএনপির নাশকতার মামলার আসামী যুবলীগ নেতা!

প্রকাশিতঃ ২০ ফেব্রুয়ারী ২০১৮ | ৫:৩৬ অপরাহ্ন

ব্যবসায়িক প্রতিপক্ষের প্ররোচনায় থানা হাজতে চোখ উপড়ে ফেলার চেষ্টা করেন যে এসআই, সেই তিনিই বিএনপির নাশকতার মামলায় আসামী করেন যুবলীগ নেতা মোরশেদকে। ছবি : সংগৃহিত

আবু আজাদ : বোয়ালখালী উপজেলায় এক যুবলীগ নেতাকে বিএনপির নাশকতা চেষ্টার মামলায় আসামী করে নির্যাতন ও টাকা আদায়ের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে পুলিশের এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।

এ ঘটনায় ওই যুবলীগ নেতা বোয়ালখালী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আরিফুর রহমানের বিরুদ্ধে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন।

বোয়ালখালী উপজেলার আহলা-কড়লডেঙ্গা ইউনিয়ন যুবলীগের যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক মো: নিজাম উদ্দিন মোরশেদ (৩৩) লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করেন, গত ৩ জানুয়ারী সন্ধ্যা সাতটার দিকে বোয়ালখালী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আরিফুর রহমান প্রতিপক্ষের দায়ের করা একটি মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তারের জন্য তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে যায়। এসময় সেখানে তাঁকে সবার সামনে মারধর করা হয়। একপর্যায়ে এসআই আরিফ তাঁকে থানায় তুলে নিয়ে রাতভর নির্যাতন করে পরদিন আদালতে চালান করেন।

শুক্রবার নিজাম উদ্দিন একুশে পত্রিকাকে জানান, তিনি পেশায় একজন ব্যবসায়ী। স্থানীয় আহলা দাশেরদীঘির পাড় এলাকায় তার একটি মিষ্টির দোকান রয়েছে। যা তিনি ভাড়ায় নিয়েছেন। দীর্ঘ পনের বছর যাবত তিনি ব্যবসা পরিচালনা করলেও সম্প্রতি দোকান-মালিক শামসুল ইসলাম তাকে অন্যায়ভাবে দোকান ছেড়ে দিতে বলেন। এ ঘটনার প্রেক্ষিতে তিনি পটিয়া ১ম সহকারী জজ আদালতে একটি ঘরভাড়া মিছ মামলা (৯/২০১৬) দায়ের করেন। এরপর থেকে আদালতের নির্দেশে তিনি দোকান-ঘরের ভাড়া আদালতের মাধ্যমে পরিশোধ করছেন। সম্প্রতি শামসুল ইসলামের স্ত্রী রওশন আক্তার-এর দায়ের করা একটি মিথ্যা মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করে থানা হাজতে তার উপর অমানুষিক নির্যাতন চালান এসআই আরিফুর রহমান।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘এসআই আরিফুর রহমান আমার প্রতিপক্ষেরে মাধ্যমে প্রভাবিত হয়ে আমাকে বিএনপির নাশকতার মামলায় আসামী করেছে। সারাজীবন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির হয়ে কাজ করেছি। গত ১৫ বছর যাবত স্থানীয় ‘শেখ রাসের স্মৃতি সংসদে’র প্রচার সম্পাদক পদে আছি। অথচ গত ৭ ফেব্রুয়ারী বোয়ালখালী হাজী মোহাম্মদ নুরুল হক ডিগ্রি কলেজে বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা নাশকতা চেষ্টা মামলায় আসামী করা হয়েছে আমাকেই! মূলত প্রতিপক্ষের দ্বারা প্ররোচিত হয়ে তিনি আমাকে নাশকতার মামলায় আসামী করেছেন। এসময় তিনি এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ী পুলিশের শাস্তি চান।’

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বোয়ালখালী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আরিফুর রহমান একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘ভাই উনি বিএনপির লোক। তাই তাকে আসামী করা হয়েছে।’

তিনি বিএনপির লোক এধরনের কোনো তথ্যপ্রমাণ আছে কিনা জানতে চাইলে এসআই আরিফুর নিরুত্তর থাকেন। এরপর সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া শুধু বিএনপির লোক বলেই কাউকে নাশকতার মামলার আসামী করা যায় কিনা ? এমন প্রশ্নের জবাবে আরিফুর ‘এজহার দেখেন..’ বলে মুঠোফোনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

জানা যায়, ইউনিয়ন যুবলীগের যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক মো. নিজাম উদ্দিন মোরশেদ দীর্ঘ পনের বছর যাবত স্থানীয় আহলা দাশের দীঘির পার এলাকায় ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন। আহাদিয়া সুইটস নামে তার একটি মিষ্টি ও খাবারের দোকান রয়েছে। যা তিনি স্থানীয় শামসুল ইসলামের কাছ থেকে ভাড়ায় নিয়েছেন। দীর্ঘ পনের বছর যাবত তিনি ব্যবসা পরিচালনা করলেও সম্প্রতি দোকান-মালিক তাকে অন্যায়ভাবে দোকান ছেড়ে দিতে বলেন। এর প্রেক্ষিতে তিনি পটিয়া ১ম সহকারী জজ আদালতে একটি ঘরভাড়া মিছ মামলা (৯/২০১৬) দায়ের করেন। এরপর থেকে আদালতের নির্দেশে তিনি দোকানঘরের ভাড়া আদালতের মাধ্যমে পরিশোধ করছেন।

এরপর থেকে দোকান মালিক পক্ষ বিভিন্ন সময় তাকে হুমকি-ধমকি দিয়ে আসছিলেন। যার প্রেক্ষিতে ২০১৭ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর বোয়ালখালী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরী করেন মোরশেদ। পরে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে (দক্ষিণ) একটি মিছ মামলা দায়ের করেন। এসময় আদালত দোকান ঘরটি নিজাম উদ্দিনের দখলে আছে বলে প্রতিবেদন দেয়।

এর আগে দোকান মালিক শামসুল ইসলামের স্ত্রী রৌশন জামান গত ২০১৭ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম মুখ্য মহানগর আদালতে নিজাম উদ্দিন মোরশেদের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেন। পরে ওই মামলায় মোরশেদকে গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে গিয়ে রাতভর নির্যাতনের পর পরদিন আদালতে চালান করে। ওইদিনই মোরশেদ আদালত থেকে জামিনে এসে ৬ জানুয়ারি বিরোধপুর্ণ দোকানঘরটি বন্ধ করে পাশের আরেকটি দোকানঘরে তার ব্যবসা শুরু করেন। কিন্তু আদালতে মামলা চলমান থাকায় বিরোধপুর্ণ দোকানঘরটি বন্ধ রাখেন। যদিও তিনি আদালতে নিয়মিত দোকানের ভাড়া পরিশোধ করছেন।

এদিকে গত ৬ ফেব্রুয়ারী বোয়ালখালী হাজী মোহাম্মদ নুরুল হক ডিগ্রি কলেজে বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে তার দায়ের করা নাশকতা চেষ্টা মামলায় নিজাম উদ্দিনকে আসামী করেন। স্থানীয়রা বলছেন, এসআই আরিফুর রহমান এ নাশকতা চেষ্টা মামলার বাদী হওয়ায় নিজাম উদ্দিন মোরশেদকে ওই মামলার আসামী করার সুযোগটি কাজে লাগিয়েছেন।

এদিকে আহলা-কড়লডেঙ্গা ইউনিয়নের স্থানীয় বাসিন্দা বোয়ালখালী উপজেলা যুবলীগের সহ সভাপতি আবু জাহেদের কাছে জানতে চাইলে একুশে পত্রিকাকে তিনি বলেন, ‘নিজাম উদ্দিন মোরশেদ যুবলীগের একজন একনিষ্ঠ কর্মী। বর্তমানে তিনি আহলা-করলডেঙ্গা ইউনিয়ন যুবলীগের যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক পদে আছেন।’ তাকে বিএনপি কর্মী বানিয়ে নাশকতার মামলায় আসামী করা দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেন তিনি।

চট্রগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোসলেম উদ্দিন আহমেদ একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে নিজামকে চিনি। সে আমাদের দলীয় কর্মী। এমন ঘটনা দু:খজনক। ব্যক্তিগত বিরোধের জেরে দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা-নির্যাতন মেনে নেওয়ার মত নয়। বিষয়টা আমি দেখছি।’

এদিকে বোয়ালখালী থানার ওসি হিমাংশু দাশ রানা একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘নাশকতার মামলায় যাদের আসামী করা হয়েছে, নির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতেই করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ নেতারাই তাকে (মোরশেদ) বিএনপি কর্মী বলে আমাদের কাছে তথ্য দিয়েছে। এর ভেতর যদি কোনো নিরপরাধ কেউ থেকে থাকে তা আমরা দেখব। তার কোনো সমস্যা হবে না।’

এসময় পুলিশের বিরুদ্ধে টাকা দাবি ও মারধরের বিষয়ে অনুষন্ধান চলছে বলে জানান ওসি।

একুশে/এএ/এটি