বৃহস্পতিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৫ ফাল্গুন ১৪২৬

হিজড়া-ঢেড়া ছাড়তে চায় মাহি

প্রকাশিতঃ সোমবার, মার্চ ৫, ২০১৮, ১২:২২ পূর্বাহ্ণ

ওমর ফারুক : চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের প্রবেশপথ শাহ আমানত সেতু এলাকা। তার একটু পশ্চিমে কয়েকশ’ গজ গেলে ভেড়া মার্কেট। কর্ণফুলী নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে উঠা শ্রমিক কলোনির ঝুপড়িতে বসে লবণ-মরিচ দিয়ে ভাত খাচ্ছেন ১৯ বছর বয়সী মাহি হিজড়া। অপরিচিত লোক দেখে নিজেকে লুকানোর চেষ্টা করেন। পাশে গিয়ে সাংবাদিক পরিচয় দেয়ার পর আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। শুরু করেন হিজড়াজীবনের গল্প।

মাসে দুই হাজার টাকায় ভেড়া কলোনির একটি ঝুপড়ি ঘরে বসবাস করছে মাহি। অমাবশ্যায় কর্ণফুলী নদীর পানি বাসায় ঢুকে টইটম্বুর। ঘরটিতে কয়েকটি রঙিন জামা-কাপড় ছাড়া কিছু নেই। ১০ বছর বয়সে সম্ভ্রান্ত পরিবারে বেড়ে উঠা মাহিকে নিষ্ঠুরভাবে দূরে ঠেলে দেয়।
কুমিল্লার মুরাদনগর থেকে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী থানার মইজ্জ্যার টেক এলাকায় সমলিঙ্গদের (হিজড়া) সঙ্গে তার জায়গা হয়। এসব কথা বলতে গিয়ে আবেগে আপ্লুত হন মাহি।

কুমিল্লার মুরাদনগর এলাকার মুহাম্মদ ইউসুফের ৬ সন্তানের মধ্যে মাহি চতুর্থ। ছেলে হয়ে জন্ম নেয়া মাহি শার্ট-প্যান্ট পরে স্থানীয় ব্র্যাক স্কুলে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করে। ছেলে হিসেবে জন্ম নিলেও ছোটবেলা থেকে মেয়েদের কাপড় পরতে ভাল লাগতো, মেয়েদের সঙ্গে মিশতে পছন্দ করতো। এজন্য তাঁর ভাই, বাবা-মায়ের মার খেতে হয়েছে অনেক। বয়স যখন সাত, তখন থেকে তার হাটাচলা মেয়েদের মত। মাহি উপলদ্ধি করে সে অন্যদের থেকে আলাদা। তখন সে বিষণ্নতায় ভোগে। বয়স যখন ১০, মাহি তখন বুঝতে স্বাভাবিক জীবন, ঘরসংসার তার জন্য নয়। তাই তিনি পরিবার ছেড়ে যোগ দেন অন্যান্য হিজড়াদের সঙ্গে।

২০০৮ সালের এক সকালে পরিবারের সদস্যদের হাতে নির্যাতিত হওয়ার পর মাত্র ১০ টাকা নিয়ে কুমিল্লা থেকে ট্রেনে করে চট্টগ্রাম ষোলশহর রেল স্টেশনে পৌঁছেন তিনি। সেখানে দেখা হয় স্বগোত্রীয় কয়েকজনের সঙ্গে। তারা তাঁকে মইজ্জ্যারটেক নিয়ে যায়। সেখানে ৯ জন হিজড়ার সঙ্গে শুরু হয় তার নতুন জীবন, নতুন অধ্যায়।

ছল্লা (ভিক্ষা) করে, নেচে-গেয়ে প্রতিদিন যা পাওয়া যায় তার অর্ধেক নিয়ে যায় গুরু মা, বাকি টাকা দিয়ে চলে নিজের জীবন। মাহি জানান, নিজের বাড়ি ছেড়ে চলে আসার পর পরিবারের কেউ খবর রাখেনি। গত ৯ বছরে তাঁর তিন ভাই মুহাম্মদ রনি, মুহাম্মদ রুবেল ও ফরহাদের বিয়ে হয়। বিয়েতে পাননি দাওয়াতও। ছোট বোন মাহিন প্রায় সময় ফোন করে মা’র সঙ্গে যোগাযোগ করে দিলেও নানা কারণে পরিবার নিয়ে থাকার ইচ্ছা সম্ভব হচ্ছে না। বাড়িতে বেশ কয়েকবার গেলেও ভাইয়েরা তাকে বাড়িতে না আসতে নির্যাতন চালায়। মাহি বলেন, আমরা (হিজড়া) পরিবার-পরিজনের কাছে ডাস্টবিনের ময়লার মতো। তিনি বলেন, আমাদের ভোটাধিকার নেই। সম্পত্তির অধিকার নেই, কোথাও গ্রহণযোগ্যতা নেই। সমাজ আমাদের মেনে নেয় না। আমার জন্য ভাই-বোনেরাও সমাজে মুখ দেখাতে পারে না।

ছোটবেলা থেকে খুব ইচ্ছে ছিল পড়ালেখা শেষ করে পুলিশের চাকরি নিব। অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়বো। কিন্তু স্কুলের সহপাঠী ও শিক্ষকদের অসহযোগিতার কারণে পঞ্চম শ্রেণীতে বন্ধ হয়ে যায় পড়াশোনা। তারপর আর স্কুলে যাওয়া হয়নি। এভাবে পড়াশোনার সমাপ্তির কথা জানিয়ে মাহি বলেন, আমাদের কেউ বাসা ভাড়া দিতে চায় না। গণপরিবহনে যাত্রীরা আমাদের পাশ থেকে উঠে যায়। খাবার দোকানে ঢুকলে অন্য ক্রেতারা বের হয়ে যায়। পথ চলতে ব্যঙ্গবিদ্রুপের শিকার হই। নানাভাবে আমরা অবহেলা ও বয়কটের পাত্র হই। যেন আমরা মানুষ না, ভিন গ্রহের অলক্ষী প্রাণী।

মাহি বলেন, আমার ইচ্ছা করে মা-বাবা ও পরিবারের সঙ্গে থাকতে। তারা আমাকে রাখতে চায়, কিন্তু বিবাহিত ভাই এবং সমাজের মানুষের ভয়ে তারা আমাকে রাখে না। মাঝে মধ্যে মনে হয় আত্মহত্যা করি।

মাহির মা সুফিয়া বেগমের (৬০) সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রতিবেদককে বলেন, ‘যে গর্ভে সন্তান ধারণ করে, তিনিই বোঝেন সন্তান দূরে থাকার কী যন্ত্রণা। আমাদের সমাজের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি, তাদের অন্যায় প্রভাবের কারণে নিজের সন্তানকে নিজের কাছে রাখতে পারি না।

শুধু মাহি নন, হিজড়া জনগোষ্ঠীর জন্য এ এক কঠিন বাস্তবতা। শুধু রাস্তায় অনেক সময় অবজ্ঞা কিংবা অবহেলা নয়, এই হিজড়া জনগোষ্ঠী তাদের পরিবার থেকেও বিচ্ছিন্ন। সমাজে লোকলজ্জার কারণে পরিবারগুলোও তাদের হিজড়া সন্তানকে ঠেলে দেয় রাস্তার অনিশ্চিত ভাবষ্যতের দিকে। রাস্তাঘাটে হাত পেতে কিংবা বিভিন্ন দোকানে গিয়ে দু’এক টাকা আদায় করেই হিজড়াদের জীবন চলে। পরিবার কিংবা সমাজ কোথাও তাদের ঠাঁই নেই।

চট্টগ্রাম ফাইট ফর উইমেন রাইটসের সভাপতি নারী নেত্রী অ্যাডভোকেট রেহানা বেগম রানু বলেন, তৃতীয় লিঙ্গ স্বীকৃতি পেলেও হিজড়া জনগোষ্ঠিকে নিয়ে আমাদের সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। এখনো বেশিভাগ মানুষই তাদের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেন। তাদেরকে নানাভাবে হেয় করেন। বাসা-বাড়ি থেকে শুরু করে অফিস-আদালত কিংবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কোথাও তাদেরকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করা হয় না এবং তাদের প্রবেশাধিকারও সীমিত। হিজড়া বলে মানুষ তাদের খারাপ চোখে দেখেন এবং অস্পৃশ্য কিছু মনে করেন।