শনিবার, ২৭ নভেম্বর ২০২১, ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

এ অমানবিকতার দায় কে নেবে?

প্রকাশিতঃ বুধবার, এপ্রিল ১৮, ২০১৮, ৭:২৬ অপরাহ্ণ

চট্টগ্রাম : নোয়াখালীর এক মাকে নগরীর বেসরকারি‘চাইল্ডকেয়ার’হাসপাতাল থেকে প্রথমে মেয়ে শিশুর বদলে ছেলে শিশুর লাশ প্রদান। পরে সেই মাকে জীবিত মেয়ে সন্তান প্রদানের মত চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে।

তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সমঝোতার কারণে বিষয়টি আইন আদালতে না গড়ালেও এই ঘটনায় নগরজুড়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা নিয়ে। নাগরিকরা ফেসবুকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে আইনগত কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার পাশাপাশি সকল হাসপাতালে এই ধরণের ঘটনার পুনরাবৃত্তি যাতে না হয় সেজন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে কঠোর হবার দাবি জানিয়েছেন।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক ডা. একিউএম সিরাজুল ইসলাম বিস্ময় প্রকাশ করে একুশে পত্রিকা বলেন, ‘প্রথমে নবজাতকের লাশ বদলের ঘটনা তারপর আবার জীবিত শিশু দেওয়া। এই ধরণের ঘটনায় আমি বিস্মিত। একজন চিকিৎসক হিসেবে এ নিয়ে মন্তব্য করার ভাষাও খোঁজে পাচ্ছি না। শুধু একটি কথাই বলবো, এই ঘটনার তদন্তপূর্বক দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক দায়ীদের বিরুদ্ধে।’

আরো : অবশেষে মেয়েকে ফিরে পেলেন রোকসানা

ফাইট ফর উইম্যান রাইটস’র সভাপতি অ্যাডভোকেট রেহানা বেগম রানু একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘একজন মা তার সন্তান প্রসবের পর তার নবজাতককে কাছে পাওয়ার বিষয়টি তার মানবিক ও রাষ্ট্রীয় অধিকার। কিন্তু চাইল্ডকেয়ার হাসপাতাল শিশুটি আর তার মায়ের সাথে যে ঘটনা করেছে তা সত্যিই অমানবিক ক্ষমার অযোগ্য আইন বর্হিভূত কাজ। এই বিষয়টির মাধ্যমে আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অব্যবস্থাপনার চিত্রই কার্যত ফুটে উঠেছে। আমি এ ধরণের কাজে সম্পৃক্ত সকলকে আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানাচ্ছি।’

চাইল্ডকেয়ার হাসপাতালের এ ধরণের কর্মকাণ্ডে ক্ষোভ প্রকাশ করে মানবধিকার সংগঠক আজহার উদ্দীন বলেন, ‘চাইল্ডকেয়ার হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল হিসেবে। কিন্তু তারা শিশুদের বিশেষ যত্নের পরিবর্তে মূলত অযত্নই করলো, তা এ ঘটনার মধ্য দিয়ে। দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করার দাবি জানাচ্ছি।’

এছাড়াও ফেসবুকে নাগরিকরা এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে চাইল্ডকেয়ার হাসপাতালের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানের দাবি জানিয়ে পোস্ট দিয়েছেন।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. আজিজুর রহমান সিদ্দিকী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘ঘটনাটি সতিই অপ্রত্যাশিত। যা হয়েছে, দার জন্য দায়ীদের অবশ্যই তদন্তের মুখোমুখি হতে হবে। আগামীকাল (বৃহস্পতিবার)অফিস আওয়ারে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। তারা তদন্ত পূর্বক ব্যবস্থা নেবেন। বিষয়টি নিয়ে আমাদের
বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক স্যারের সাথে আলাপ হয়েছে।’

রোকসানা আক্তার বলেন, চাইল্ড কেয়ার আমার সঙ্গে যা করেছে তা যেন আর কোনো মায়ের সঙ্গে করতে না পারে, সেজন্য হাসপাতালটি বন্ধ করে দেওয়া উচিত সরকারের। ওদের আইসিইউতে কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা নেই। তারা হয়তো আমার বুকের ধনকে মোটা অঙ্কের টাকা খেয়ে বিক্রি করে দিতে চেয়েছিল। যদি আমাকে অন্য কোনো কন্যার মরদেহ দেওয়া হতো আমি বুঝতেই পারতাম না। এ ঘটনায় জড়িত চাইল্ড কেয়ারের সবার শাস্তি চাই।

পুলিশ সূত্র জানায়, এক সপ্তাহ আগে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের বাসিন্দা ও এক দুবাই প্রবাসীর স্ত্রী রোকসানা আক্তার এক মেয়ে নবজাতকের জন্ম দেন। নিউমোনিয়া আক্রান্ত হওয়ায় আধাঘন্টার মধ্যেই বাচ্চাটিকে নোয়াখালী মা ও শিশু হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। ছয় ঘন্টা পর সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ যে কোনো উন্নত হাসপাতালে নবজাতকটিকে রেফার করা হয়।

এরপর ওই বাচ্চাকে আনা হয় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে একদিন রাখার পর শুক্রবার তাকে ভর্তি করা হয় চাইল্ড কেয়ার হাসপাতালে। এরপর গত মঙ্গলবার সকাল সাড়ে নয়টার দিকে চাইল্ড কেয়ার কর্তৃপক্ষ জানায়, ওই নবজাতক মারা গেছেন। এরপর বেগমগঞ্জে শিশুটিকে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে গিয়ে দাফনের প্রস্তুতি নিতে গিয়ে তারা দেখতে পান নবজাতক ছেলেসন্তান।

এরপর ওই নবজাতককে নিয়ে মঙ্গলবার গভীর রাতে তারা পাঁচলাইশ থানায় এসে অভিযোগ করেন। পুলিশের তৎপরতার ফলে ভোররাতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, তাদের ভুল হয়েছে। ওই ছেলে নবজাতকটি ছিল আরেকজনের। পরে মৃত ছেলেটিকে তাদের বুঝিয়ে দেওয়া হয়।
রোকসানার কন্যাসন্তানটি বেঁচে আছে।

আরো : নবজাতক মেয়ের বদলে মৃত ছেলে, নিচ্ছেন না বাবা-মা

পাঁচলাইশ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ওয়ালী উদ্দিন আকবর বলেছেন, মারাত্মক ধরনের নিউমোনিয়া আক্রান্ত নবজাতকটিকে প্রথমে নোয়াখালী মা ও শিশু হাসপাতালে নেয়া হয়েছিল, তারা ওই নাবজাতকের লিঙ্গ পরিচয় লিখেনি। এরপর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে তারাও লিঙ্গ পরিচয় উল্লেখ করেনি। তবে শেভরণে ওই বাচ্চার একটি পরীক্ষা করানো হলে সেখানে মেয়ে লেখা হয়। অভিযোগের প্রেক্ষিতে ওই বাচ্চা ও মায়ের ডিএনএ টেস্ট করার উদ্যোগও আমরা নিয়েছিলাম। এরইমধ্যে বুধবার ভোররাতে জানতে পারি, চাইল্ড কেয়ার হাসপাতালে ভুলে বাচ্চা বদল হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত প্রকৃত মেয়েবাচ্চাকে তার মায়ের হাতে তুলে দিয়েছি আমরা।

চাইল্ড কেয়ার হাসপাতালের পরিচালক ডা. ফাহিম হাসান রেজা বলেন, নবজাতক ওই ছেলেশিশুকেও গত শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটে একই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। তার ১০ মিনিট পর মেয়েশিশুটি ভর্তি হয়। দুই নবজাতককে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রাখা হয়েছিল।

নবজাতক ছেলেশিশুটিকেও আনা হয়েছিল নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ থেকে। একই বয়সের নবজাতক এবং ঠিকানা একই হওয়ায় এই ভুল হয়ে গেছে। এ ঘটনার পর স্বাভাবিকভাবে আমরা ক্ষমাপ্রার্থী। তারাও আমাদের ওপর আস্থা রাখতে পারবেন না। তাই বলেছি, চাইলে তারা অন্য কোথাও নিয়ে যেতে পারেন নবজাতকটিকে।

রয়েল হাসপাতালের আইসিইউতে নবজাতককে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছিলেন ডা. বিধান রায় চৌধুরী; তিনি বলেন, শ্বাসকষ্টসহ শারীরিক নানা জটিলতা রয়েছে শিশুটির মধ্যে। জন্মের পর ব্রেনে অক্সিজেন পৌঁছেনি। খিঁচুনি ও ইনফেকশন আছে। মেডিকেল বোর্ড গঠন করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেব।

এডি/একুশে