শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

বাঁশখালিতে ইউপি-ভবনে এখনো পাকিস্তানের অখণ্ডতার ‘প্রতীক’

| প্রকাশিতঃ ২৫ এপ্রিল ২০১৮ | ১:৪১ অপরাহ্ন

চট্টগ্রাম : সাদা অর্থে শান্তি-সাম্য, সবুজ অর্থে জমিন। চাঁদতারায় ধর্মীয় আনুগত্য- এই তিনের সমন্বয়ে তৈরি পাকিস্তানের পতাকাটি দেশটির অখণ্ডতা, পাকিস্তানের প্রতি সংহতি ও অনুভূতি প্রকাশে বোঝানো হয়। পাকিস্তানের প্রতি প্রেম, আনুগত্য প্রকাশে পাকিস্তানি ভাবধারার লোকজন সগৌরবে তাদের বাড়িঘর, ব্যবহার্য জিনিসপত্রে ‘চাঁদতারা’ ব্যবহার করতেন পাকিস্তান ভাঙার আগে থেকেই।

যেমনটি করেছিলেন পাকিস্তানের অখণ্ডতায় বিশ্বাসী, পাকিস্তানের তৎকালীন স্পীকার ফজলুল কাদের চৌধুরী। গুডসহিলের বাড়ি বানাতে গিয়ে পরতে পরতে তিনি চাঁদতারার ব্যবহার করেছেন, যা এখনো শোভা পায়।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে ৪৭ বছর। স্বাধীন বাংলাদেশের কোনো ইউপি ভবনের প্রবেশমুখে পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্য প্রকাশের এ ‘চাঁদতারা’ এখনো শোভা পায় কী করে?

সম্প্রতি একুশে পত্রিকার অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এমনই চিত্র। চট্টগ্রামের বাঁশখালি উপজেলার ২ নম্বর সাধনপুর ইউনিয়ন পরিষদ ভবনে বেশ কয়েকটি চাঁদতারার ব্যবহার করা হয়েছে। ভবনটি অবশ্য নির্মিত হয়েছে অন্তত ৮০ বছর আগে।

তথ্য মতে, মুক্তিযুদ্ধের সময় এ ভবন ছিল রাজাকারদের ক্যাম্প। বিভিন্ন জায়গা থেকে মুক্তিকামী মানুষ ধরে এনে এখানে টর্চার করা হতো, গুলি করে হত্যা করা হতো বলে প্রচার আছে। বিমান বাহিনীর ফ্লাইট সার্জেন্ট মহিউল আলমকে এখানে গুলি করে হত্যার পর ৫ কিলোমিটার দূরে পাহাড়ি এলাকায় লাশ পুঁতে ফেলেছিল রাজাকার-আলবদররা।

স্থানীয়রা বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, রাজাকারদের এই ‘টর্চারসেল’ ইউপি কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার হয় কী করে! ব্যবহার যদিও হয় পাকিস্তানি পতাকার ‘চাঁদতারা’ শোভা পায় কী করে?

তারা বলেন, স্বাধীনতার পর এ পর্যন্ত ৯ জন চেয়ারম্যান সাধনপুর ইউনিয়ন পরিষদের দায়িত্ব পালন করেছেন। আওয়ামী ঘরানার এসব চেয়ারম্যানের কেউই ভবন থেকে পাকিস্তান পতাকার এ ‘প্রতীক’ সরানোর প্রয়োজন মনে করেননি।

সর্বশেষ সরাসরি নৌকা প্রতীক নিয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন বাঁশখালি উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. মহিউদ্দিন চৌধুরী খোকা। গত বছরের ৫ জুন তিনি দায়িত্বভার গ্রহণ করে তিনিও চাঁদতারাখচিত ভবনে দিব্যি অফিস করছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, স্বাধীন বাংলাদেশের চেতনাবিরোধী, পাকিস্তানি পতাকার এ ‘প্রতীক’ ইচ্ছা করলে মুহূর্তের মধ্যে মুছে ফেলা যায়। কিন্তু রহস্যজনক কারণে এ কাজটি নৌকা প্রতীকে নির্বাচিত চেয়ারম্যানও এড়িয়ে যাচ্ছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম হাজী মুহাম্মদ মহসীন কলেজের শিক্ষক, দেশের কনিষ্ঠতম মুক্তিযোদ্ধা প্রফেসর মুহাম্মদ ইদ্রিস আলী স্বাধীন দেশে এধরনের ঘটনা মেনে নেয়া যায় না উল্লেখ করে একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘বর্তমানে অর্বাচীনরাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে জায়গা করে নিচ্ছে। কিছু কিছু চেয়ারম্যান আছেন, যাদের বোধে এসব নেই। তাদের কাছে দেশচেতনাটাও লোকদেখানো। ফলে তাদের কাছ থেকে এর চেয়ে বেশি কিছু আশা করা উচিত নয়।’

এ প্রসঙ্গে সরাসরি কথা হয় সাধনপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন চৌধুরী খোকার সঙ্গে। ‘নৌকা’ দেশচেতনার প্রতীক, মুক্তিযুদ্ধের প্রতীক। নৌকা প্রতীকে চেয়ারম্যান হয়েও আপনি মুক্তিযুদ্ধবিরোধী, পাকিস্তান অখণ্ডতার ‘প্রতীক’ খচিত কার্যালয়ে বসেন কীভাবে? এ দায় কি এড়াতে পারেন-এমন প্রশ্নে ভ্যাবাচেকা খেয়ে যান চেয়ারম্যান; একটু চুপ থেকে বলেন- ভাই, আমি তো দায়িত্ব নিয়েছি মাত্র একবছর। পাকিস্তানি পতাকার চিহ্নটা আগে থেকে ছিল, তাই রয়ে গেছে। বিষয়টি অতটা গভীরভাবে ভাবা হয়নি কখনো। আপনি যখন বলছেন, এটা আর থাকবে না। বলেন চেয়ারম্যান খোকা।

এ ব্যাপারে কথা বলার জন্য বুধবার দুপুরে বাঁশখালি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাসুদুর রহমান মোল্লাকে ফোন করে পাওয়া যায়নি।

একুশে/এটি