শনিবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৩০ ভাদ্র ১৪২৬

রাইফাকে সেডিল পুশ করা সেই নার্সের সনদ নেই!

প্রকাশিতঃ বৃহস্পতিবার, জুলাই ৫, ২০১৮, ১০:৫২ অপরাহ্ণ

চট্টগ্রাম : চট্টগ্রামের বেসরকারি ম্যাক্স হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় সাংবাদিক-কন্যা রাইফার মারা যাওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসকের সাথে পুলিশ যে নার্সকে ধরে থানায় নিয়ে যাওয়ার পর ছেড়ে দিয়েছিল নার্সিংয়ে তার পেশাগত সনদ নেই বলে অভিযোগ ওঠেছে।

নিয়ম অনুযায়ী নার্স হিসেবে কোনও হাসপাতালে চাকরি করতে চাইলে, চার বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন নার্সিং সায়েন্স ও মিডওয়াইফারি অথবা তিন বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন নার্সিং সায়েন্স ও মিডওয়াইফারি অথবা চার বছর মেয়াদি বেসিক বিএসসি ইন নার্সিং পাস হতে হয়। এ ছাড়া বাংলাদেশ নার্সিং কাউন্সিল কর্তৃক নিবন্ধতিও হতে হবে।

ম্যাক্স হাসপাতালে কর্মরত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মী একুশে পত্রিকাকে বলেন, সেদিন যে নার্স দায়িত্বে ছিলেন তার নাম শিউলী। তিনি নার্সিংয়ে পড়াশোনা করেননি বলে আমরা জেনেছি। নার্সিংয়ে তার কোনও প্রকার সনদপত্র নেই। এ বিষয়টি হাসপাতালের সবাই জানেন। কিন্তু কারও প্রকাশ্যে সেটা বলার সুযোগ নেই।

তিনি বলেন, খিঁচুনি হলে দ্রুত ঘুম নিয়ে আসার জন্য ‘সেডিল’ ইনজেকশন পুশ করার নিয়ম। এটার বিকল্প নেই। কিন্তু সেটি কী মাত্রায় দেয়া হবে সেটা বিবেচ্য বিষয়। বয়স বিবেচনায় নিয়ে সেডিলকে ভাগ করে ‘ডিস্টিল্ড ওয়াটার’ মিশিয়ে তারপর পুশ করা হয়। বাচ্চা হলে কত মিলিগ্রাম দেওয়া হবে সেটা একটা বিষয়।

‘বাচ্চাদেরকে সেডিল দেওয়ার সময় সেটার চার ভাগের এক ভাগের সাথে পানি মিশিয়ে দিই আমরা। এখন রাইফার ক্ষেত্রে সেডিল সরাসরি দেয়া হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে প্রকৃতপক্ষে সেদিন কী হয়েছিল সেটি ডাক্তার, নার্স আর আল্লাহ ভালো জানবে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন চিকিৎসক একুশে পত্রিকাকে বলেন, সাধারণত সনদ যাচাই করে আইসিইউ ও সিসিইউতে নার্স নিয়োগ দেয়া হয়। সাধারণ ওয়ার্ডগুলোতে যে সব নার্স নিয়োগ দেয়া হয় তাদের অনেকেরই সনদ থাকে না।

‘সনদধারী নার্সদের বেতন-ভাতা বেশি দিতে হয়। তাছাড়া যেভাবে বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক গড়ে উঠেছে সেভাবে নার্স তৈরি হয়নি দেশে। এজন্য পেশাগত সনদ আছে এমন নার্স কম বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে।’

তিনি বলেন, ‘অষ্টম শ্রেণী অথবা এসএসসির পর অনেক মেয়ে নার্সিং পেশায় চলে আসছে। তারা দেখতে দেখতে শিখছে। অল্প বয়সে নার্সিংয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি পেশায় এসে তাদের অনেকেই ভুল করছে। অন্যদিকে সনদধারী নার্সগুলো রোগীর পরিস্থিতি ভালোই বুঝতে পারে। তিন-চার বছর নার্সিং নিয়ে পড়াশোনা করায় তাদের ভুল করার সম্ভাবনা কম থাকে।’

নিজের অভিজ্ঞতা থেকে চট্টগ্রামের মেট্রোপলিটন হাসপাতালে কর্মরত একজন সিনিয়র স্টাফ নার্স বলেন, ‘মাঝে মাঝে এমনও হয় যে, ডাক্তাররা ভুল প্রেসক্রাইভ করেছেন। তখন স্যারদের বিষয়টি তুলে ধরি। বলি, এটা তো এখন দেওয়ার কথা নয়। অথবা এত এমজি দিতে হবে, আপনি এত এমজি কেন দিচ্ছেন। অনেক সময় স্যাররা বিষয়টি বুঝতে পেরে শুধরে নেন। আবার কোনও কোনও সময় বলেন, তিনিই ঠিক। তখন আমার কিছু করার থাকে না। আমি তো আর ডাক্তার নয়। আদেশ পালন করি তখন।’

সেদিন চকবাজার থানায় উপস্থিত থাকা চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সবুর শুভ বলেন, ‘দায়িত্বরত নার্স শিউলী চৌধুরী সেদিন সেডিল পুশ করেন রাইফাকে। থানায় তিনি ওই তথ্যটি জানিয়েছেনও।’

আইন অনুযায়ী, নিবন্ধন ছাড়া কেউ নার্সিং, ধাত্রী বা সহযোগীর পেশায় নিয়োজিত থাকলে তিন বছরের কারাদণ্ড, এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয়দণ্ডে দণ্ডিত হবে। ভুয়া পদবী ব্যবহার করলে এক বছরের কারাদণ্ড, ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান আছে।

এদিকে ভুল চিকিৎসার অভিযোগের মুখে থাকা বেসরকারি ম্যাক্স হাসপাতাল ও ডায়গনস্টিক সেন্টারের ১১টি ত্রুটি খুঁজে পেয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ) ডা. কাজী জাহাঙ্গীর হোসেনের বেসরকারি হাসপাতালটিকে বুধবার দেওয়া নোটিসে তিনটি বিভাগে বিধি মোতাবেক লাইসেন্স নবায়ন না করা, কতর্ব্যরত চিকিৎসক ও নার্সদের নিয়োগপত্র না থাকাসহ বিভিন্ন ত্রুটি উল্লেখ করা হয়।

ত্রুটিবিষয়ক বিস্তারিত তথ্য ১৫ দিনের মধ্যে না দিলে হাসপাতালের কার্যক্রমসহ লাইসেন্স বাতিল করা বলেও নোটিশে উল্লেখ করা হয়।

গলা ব্যথা নিয়ে গত ২৮ জুন বিকালে নগরীর মেহেদীবাগের বেসরকারি ম্যাক্স হাসপাতালে ভর্তি হওয়া দৈনিক সমকালের সিনিয়র রিপোর্টার রুবেল খানের শিশুকন্যা রাইফা পরদিন রাতে মারা যায়। অভিযোগ ওঠে কতর্ব্যরত চিকিৎসক ও নার্সদের অবহেলার কারণে এ ঘটনা ঘটেছে।

এর বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের সাংবাদিকেদের বিক্ষোভের মুখে পুলিশ ওই হাসপাতালের ডিউটি চিকিৎসক ও নার্সকে থানায় নিয়ে গেলে সেখানে প্রেসক্লাব ও সিইউজে নেতাদের সঙ্গে ফয়সাল ইকবাল ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

দাবির মুখে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। গত রোববার উক্ত কমিটি চট্টগ্রামে এসে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য শুনে ও সংশ্লিষ্ট তথ্য-নথিপত্র সংগ্রহ করে।

ম্যাক্স হাসপাতালে রাইফা ‘মেডিকেল মার্ডারের’ শিকার হয়েছে কিনা সেটি খতিয়ে দেখতে অনুরোধ জানিয়েছে চট্টগ্রামের বিভিন্ন পত্রিকার সম্পাদকরা। এ ছাড়া রাইফাকে হত্যা করা হয়েছে- এমন অভিযোগ এনে দোষীদের বিচার দাবিতে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশাার মানুষ আন্দোলনে নেমেছেন।

নার্সের সনদ না থাকার অভিযোগ প্রসঙ্গে ম্যাক্স হাসপাতালের মহাব্যবস্থাপক রনজন প্রসাদ দাশগুপ্ত বলেন, তদন্ত শেষ না হওয়ায় এখনই আমি কিছু বলতে পারবো না। আমাদেরও নিজস্ব তদন্ত চলছে। এখনো তদন্ত শেষ হয়নি।

পরক্ষণে বলেন, সনদ থাকবে না কেন? সনদ ছাড়া আমরা নার্স নিয়োগ দিই না। যদি সনদ দেখতে চান আমার অফিসে আসেন, আমি দেখিয়ে দেব।

আগামীকাল শুক্রবার অফিসে যাওয়া যাবে কিনা এ প্রতিবেদকের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, হ্যাঁ। কয়টায় যেতে হবে জানতে চাইলে রনজন প্রসাদ দাশগুপ্ত একটু থেমে বলেন, রোববার আসেন।

একুশে/এসআর/এটি