শনিবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৩০ ভাদ্র ১৪২৬

আত্মহত্যাই করেছে তাসফিয়া !

প্রকাশিতঃ বৃহস্পতিবার, জুলাই ১২, ২০১৮, ৮:৪৫ অপরাহ্ণ

চট্টগ্রাম : চট্টগ্রামের আলোচিত স্কুল ছাত্রী তাসফিয়ার মৃত্যু রহস্য উদঘাটনের দ্বারপ্রান্তের তদন্ত দল। থানা পুলিশের কাছ থেকে মামলার তদন্তভার নগর গোয়েন্দা পুলিশের কাছে আসার পর পরই রহস্যজট খুলতে শুরু করেছে। গত বুধবার তাসফিয়ার ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেন তাসফিয়ার ময়নাতদন্তকারী চমেক’র ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসক ডা. সুজন কুমার দাশ। এছাড়া সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো প্রতিবেদনেও ধর্ষণের পর খুন নাকি রক্তে কোনো প্রকার বিষক্রিয়ায় তাসফিয়ার মৃত্যু হয়েছে এসব পরীক্ষার উত্তরের জবাবও মিলেছে নেতিবাচক।

ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন, ফরেনসিক ল্যাবের প্রতিবেদন, সুরতহাল প্রতিবেদন, প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা, গ্রেফতার আসামিদের দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ থেকে প্রাপ্ত তথ্য, সিসিটিভির ফুটেজ বিশ্লেষণ ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনা করে তদন্ত টিম একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে। আর সেটি হলো- তাসফিয়া পরিবারের ভয়ে মানসিক চাপ নিতে না পেরে নিজ আগ্রহেই সিএনজি অটোরিকশায় করে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে যায়। পরে রাত ৯ টা থেকে ১০ টার মধ্যে কোনো এক সময় সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করে। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে এ মামলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাতে আর কিছু দিন সময় নিয়ে দুই-একটি প্রশ্রের উত্তর মেলানোর চেষ্টা করছে গোয়েন্দা পুলিশের তদন্ত । তদন্ত সংশ্লিষ্ট নগর গোয়েন্দা পুলিশের সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

উল্লেখ্য, আলোচিত এ ঘটনার পর গত ৪ মে একুশে পত্রিকায় “‘স্বপ্নভঙ্গে’ তাসফিয়ার আত্মহত্যা!” এ শিরোনামে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল।

তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, তাসফিয়া নগরের ইউরিপিয়ান স্কুলে পড়ালেখা করতো। কিন্তু সেখানে থাকা অবস্থায় ফেসবুক-ইমো এসবে আসক্তি কারণে পড়ালেখায় মনযোগ হারিয়ে ফেলে। এছাড়া সেখানে থাকা অবস্থায় অনেকটা অনিয়ন্ত্রিত জীবন যাপন শুরু করে। সেকারণে তার পরিবার তাকে মৃত্যুর দুই মাস আগে জানুয়ারি থেকে সাইনশাইন গ্রামার স্কুলে ভর্তি করান। কিন্তু এরপরও তার চলা ফেরায় পরিবর্তন না আসার তার কাছে থাকা দামি দুটি মোবাইল সেট নিয়ে ফেলেন তার বাবা। এরই মাঝে বাংলাদেশ এলিমেন্টারি স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র আদনান মির্জার সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে তাসফিয়া।

এ বিষয়টি তাসফিয়ার পরিবার জানতে পেরে তাকে নানাভাবে শাসন করে থাকেন। এরপরও প্রয়োজনে ব্যবহার করার জন্য একটি দামি মোবাইল ফোন ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছিলেন তার পরিবার। এই সুযোগটাকে কাজে লাগিয়ে ইমো আর হোয়াটসআপ অ্যাপসের মাধ্যমে আদনানের সঙ্গে যোগাযোগ করতো তাসফিয়া। ঘটনার দিন ২ মে মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টা ১৫ মিনিটে চায়না গ্রিল রেস্টুরেন্টে প্রবেশ করে তাসফিয়া ও আদনান। তারা ৬টা ৩৭ মিনিটে বের হয়ে যায়। ওই রেস্টুরেন্টের যে কর্মচারী তাদের আইসক্রিম সার্ভ করেছিলেন তার নাম উজ্জ্বল দাস। তিনি জানিয়েছিলেন, এ জুটি ২০-২২ মিনিট দোকানে ছিল। তারা দুটি আইসক্রিম অর্ডার করেছিল। দুটি আইসক্রিমের দাম আসে ভ্যাটসহ ৩৭৫ টাকা। বিল দিয়ে বের হয়ে যাওয়ার পর ওই টেবিলে গিয়ে দেখতে পান গ্রাহক আইসক্রিম খায়নি। কিন্তু বিল পরিশোধ করে চলে গেছে। মূলত ওই সময়ে তাসফিয়ার মা তাকে ফোন দিয়ে খোঁজ নেয়ার কারণেই সে আইসক্রীম না খেয়ে তাড়াহুড়ো করে বের হয়ে যায়। যদিও এরআগে তারা দুজনেই ওই দিন বিকেলে বাসা থেকে বের হয়ে প্রথমে সিআরবি যায়। সেখান থেকে স্টেডিয়াম সংলগ্ন গ্রিডিগার্টস রেস্টুরেন্টে বসে সেখানেও কিছু খায়নি তারা। পরে দুজন সিএনজি অটোরিক্সা করে গোলপাহাড় মোড়ের চায়না গ্রিল রেস্টুরেন্টে আসে।

তবে তাসফিয়া আদনানকে জিইসির বাসায় যাওয়ার কথা বলে সিএনজি অটোরিকশা ঠিক করলেও তাসফিয়া কিন্তু সেই সিএনজি অটোরিকশাটি নিয়ে বাসা থেকে প্রায় ১৮ মাইল দূরে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে চলে যায়। সেখানে রাত সাড়ে সাতটার দিকে পৌঁছার পর নিরিবিলি পাথরের ওপর সৈকতে বসে থাকে তাসফিয়া। অনেক প্রত্যক্ষদর্শী তাকে একাকী বসে থাকতে দেখলেও নানা কারণে বা কোনো মেয়ের ফাঁদে পড়ছেন কিনা এসব ভেবে কিছুই বলেনি বা তার কাছেও যাননি। কিন্তু রাত সাড়ে ৯টার দিকে স্থানীয়রা একটি মেয়ের চিৎকার শুনতে পান তবে কেউ সেদিকে আর যাননি। পরে সকালে ঠিক যেই স্থানে তাসফিয়া বসে ছিল তার থেকে আধা কিলোমিটার উত্তরে পাথরে উপর উপুড় অবস্থায় তার মরদেহ দেখতে পায় স্থানীয়রা। পরে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করার পর বিকেলে তার পরিচয় মেলে।

তদন্ত টিম বলছে, তাসফিয়া প্রেম ও অনিয়ন্ত্রিত জীবন যাপনের জন্য এমনেও পরিবারের কাছ থেকে চাপে ছিল। কিন্তু ওই দিন বান্ধবীর জন্মদিনের কথা বলে বাসা থেকে বের হয়ে প্রেমিক আদনান মীর্জার সঙ্গে দেখা করার খবর জানার ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। তাই ভয় আর মানসিক চাপ থেকে চায়না গ্রিল থেকে বের হয়ে বাসায় না গিয়ে সোজা সিএনজি অটোরিকশাটি নিয়ে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে চলে যায়। সেখানেই কয়েকঘণ্টা অবস্থান করার পর সে সাগরে জোয়ারের পানিতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করে। আর পানিতে ভাসতে ভাসতে আধা কিলোমিটার দূরে গিয়ে ভাটার সময়ে সৈকতের পাথরের উপর উপুড় হয়ে আটকে থাকে। পানির স্রোতের কারণে পাথরের সঙ্গে তার মরদেহের ধাক্কা লাগায় মুখসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। আর তাসফিয়ার কোনো টাকা না থাকলেও হাতে থাকা আংটিটি সম্ভবত সিএনজি অটোরিকশার চালককে দিয়ে ভাড়া মিটিয়ে ছিল সে। আর মোবাইলসেটটি এখনো পর্যন্ত যেহেতু সচল হয়নি, ধারণা করা হচ্ছে, পানিতে ঝাঁপ দেওয়ার সময় সেটিও তার সাথে সাগরে পড়ে গেছে।

এদিকে ময়না তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘তার মুখে ও শরীরে বিভিন্ন অংশে আঘাত থাকলেও তার ওপর কোনো ধরণের যৌন নির্যাতনের ঘটনা ঘটেনি। মূলত পানিতে পড়ে শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে।’

এছাড়া সুরতহাল প্রতিবেদন ও সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবের প্রতিবেদনেও তাসফিয়ার পোশাক ও যৌনিপথে যৌন সংক্রান্ত ইতিবাচক কোনো ফল পাওয়া যায়নি।

মামলার তদারক কর্মকর্তা নগর গোয়েন্দা পুলিশের উপকমিশনার (বন্দর-পশ্চিম) মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, ‘তাসফিয়ার ময়নাতদন্ত রিপোর্ট আমরা পর্যালোচনা করেছি। প্রতিবেদনে চিকিৎসকরা এটি পানিতে পড়ে শ্বাস বন্ধ হয়ে মারা গেছে বলেছেন। এছাড়াও অন্যান্য প্রতিবেদনগুলোও একই ধরণের আসছে। খুন হয়েছে এমন জোরালো প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। এরপরও যেহেতু এটি আলোচিত মামলা আমরা রহস্য উদঘাটন করেই ছাড়ব শিগগিরই। আশা করছি কয়েক দিনের মধ্যে এই মামলার ইতি টানতে পারবো।’

প্রসঙ্গত, গত ২ মে সকালে নগরের পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতের ১৮ নম্বর ব্রিজঘাটের পাথরের ওপর থেকে সানশাইন গ্রামার স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির ছাত্রী তাসফিয়ার মরদেহ উদ্ধার করে পতেঙ্গা থানা পুলিশ। প্রথমে অজ্ঞাত লাশ মনে করা হলেও পরিচয় মেলার পর একই দিন সন্ধ্যায় খুলশি থানার জালালাবাদ হাউজিং সোসাইটির বাসা থেকে তাসফিয়ার বন্ধু আদনান মির্জাকে (১৬) জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয় পুলিশ।

আদনান মির্জা নগরের বাংলাদেশ এলিমেন্টারি স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র। তাসফিয়াকে ধর্ষণের পর খুন করা হয়েছে এমন অভিযোগ এনে তার বাবা মো. আমীন গত ৩ মে দুপুরে আদনান মির্জাকে প্রধান আসামি করে ৬ জনের বিরুদ্ধে পতেঙ্গা থানায় হত্যা মামলা করেন। আসামিরা হলেন-আদনান মির্জা, সৈকত মিরাজ, আশিক মিজান, ইমতিয়াজ সুলতান ইকরাম, মো. মোহাইন ও মো. ফিরোজ।

এরমধ্যে ঘটনার পরদিন তাসফিয়ার বন্ধু আদনান মির্জা এবং গত ২৩ মে রাতে আশিক মিজানকে গ্রেফতার করে পুলিশ। গত ৩ জুলাই আত্মসমর্পণ করলে তাসফিয়া হত্যা মামলায় অন্যতম আসামি কথিত যুবলীগ নেতা মো. ফিরোজকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন আদালত। গত ৮ জুলাই ফিরোজকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে তিনদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।

একুশে/এডি