শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

রাইফার মৃত্যু : ম্যাক্সের এমডিসহ চার চিকিৎসকের বিরুদ্ধে এজাহার

| প্রকাশিতঃ ১৮ জুলাই ২০১৮ | ৪:৫৭ অপরাহ্ন

চট্টগ্রাম : ভুল চিকিৎসা ও অবহেলায় সাংবাদিক কন্যা রাইফার মৃত্যুর ১৯ দিন পর ম্যাক্স হাসপাতালের এমডি ডা. লিয়াকত আলী ও কর্ত্যবরত তিন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে মামলা গ্রহণের জন্য এজাহার দায়ের করা হয়েছে।

বুধবার বিকেলে সাড়ে চারটার দিকে চকবাজার থানায় এজহারটি দায়ের করেন রাইফার পিতা বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের নব নির্বাচিত সদস্য ও সমকালের সিনিয়র সাংবাদিক রুবেল খান। এসময় সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ ও সিএমপির উপ কমিশনার (দক্ষিণ) মোস্তাইন হোসাইনও উপস্থিত ছিলেন চকবাজার থানায়।

আসামিরা হলেন- ডা. বিধান রায় চৌধুরী, ডা. দেবাশীষ সেনগুপ্ত, ডা. শুভ্রদেব ও ডা. লিয়াকত আলী। এদের মধ্যে প্রথম তিন শিশু রাইফার চিকিৎসায় নিয়োজিত ছিল সরাসরি আর লিয়াকত আলী ম্যাক্স হাসপাতালের এমডি। তাদের প্রত্যেকের ঠিকানা দেওয়া হয়েছে ম্যাক্স হাসপাতাল। আসামিদের বিরুদ্ধে অবহেলা ও ভুল চিকিৎসায় ২ বছর চার মাস বয়সী শিশু রাইফার মৃত্যুর অভিযোগ আনা হয়েছে।

বিষয়টি নিশ্চিত করে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের নব নির্বাচিত সদস্য সাংবাদিক আজহার মাহমুদ বলেন, ‘মামলার বাদী রুবলে খান বিকেল চারটার দিকে সাংবাদিক নেতৃবৃন্দকে সাথে নিয়ে চকবাজার থানার ওসির কাছে এজাহার দায়ের করেন। তিনি গ্রহণ করে স্বাক্ষরও করেছেন। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে মামলার নাম্বার দেওয়া হবে। এসময় উপ কমিশনার (দক্ষিণ) মোস্তাইন হোসাইনও এসেছেন।’

এদিকে চকবাজার থানার ওসি আবুল কালাম আজাদ বলেছেন, রাইফার বাবা একটি এজাহার দিয়েছেন। সেটি আমরা গ্রহণ করেছি। পরে যাচাই বাছাই শেষে সিদ্ধান্ত দেওয়া হবে।

এরআগে বেসরকারি ম্যাক্স হাসপাতালে শিশু রাইফার মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত কমিটি যাদের অবহেলার প্রমাণ পেয়েছে, সেই চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলকে (বিএমডিসি) নির্দেশ দিয়েছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। মন্ত্রণালয়ের তথ্য কর্মকর্তা পরীক্ষিৎ চৌধুরী জানান, মন্ত্রীর নির্দেশে গঠিত স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও চট্টগ্রামের সিভিল সার্জনের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের সুপারিশের ভিত্তিতে মন্ত্রী গত ৮ জুলাই এই নির্দেশ দেন।

দৈনিক সমকালের চট্টগ্রাম ব্যুরোর সাংবাদিক রুবেল খানের আড়াই বছর বয়সী মেয়ে রাইফা গলায় ব্যথা নিয়ে গত ২৮ জুন বিকালে ম্যাক্স হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর ২৯ জুন রাতে তার মৃত্যু হয়। ভুল চিকিৎসায় তার মৃত্যু হয়েছে অভিযোগ করে বিক্ষোভ করেন সাংবাদিকরা। পরে ঘটনা তদন্তে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে একটি কমিটি করে দেওয়া হয়। পাশাপাশি চট্টগ্রামের সিভিল সার্জনের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি কমিটি এ ঘটনার তদন্ত করে।

সিভিল সার্জনের নেতৃত্বাধীন কমিটি গত বৃহস্পতিবার রাতে তাদের প্রতিবেদন দেয়, যাতে কর্তব্যরত চিকিৎসক, নার্স ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দায়িত্বে অবহেলা এবং গাফিলতির প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়ে তিন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়। এই তিন চিকিৎসক হলেন- ডা. বিধান রায় চৌধুরী, ডা. দেবাশীষ সেন গুপ্ত এবং ডা. শুভ্র দেব। তাদের মধ্যে দেবাশীষ ও শুভ্রকে ইতোমধ্যে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে বলে ম্যাক্স কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

সিভিল সার্জনের কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘রাইফা যখন তীব্র খিঁচুনিতে আক্রান্ত হয় তখন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের অনভিজ্ঞতা ও আন্তরিকতার অভাব পরিলক্ষিত হয় এবং ওই সময়ে থাকা সংশ্লিষ্ট নার্সদের আন্তরিকতার অভাব না থাকলেও এ রকম জটিল পরিস্থিতি মোকাবেলা করার মতো দক্ষতা বা জ্ঞান কোনোটাই তাদের ছিল না।

‘শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. বিধান রায় চৌধুরী শিশুটিকে যথেষ্ট সময় ও মনোযোগ সহকারে পরীক্ষা করে দেখেননি। ডা. দেবাশীষ সেন গুপ্ত ও ডা. শুভ্র দেব শিশুটির রোগ জটিলতার বিপদকালীন সময়ে আন্তরিকতার সাথে সেবা প্রদান করেননি বলে শিশুর পিতা-মাতা যে অভিযোগ উত্থাপন করেছেন, যাহা এই তিন চিকিৎসকের বেলায় সত্য বলে প্রতীয়মান হয়।’

এদিকে বির্তকিত ম্যাক্স হাসপাতালে অভিযান চালিয়ে নানা অনিয়মের দায়ে দশ লাখ টাকা জরিমানা করেছে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। র‌্যব সদর দপ্তরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. সারোয়ার আলমের নেতৃত্বে গত ৮ জুলাই রোববার বেলা সাড়ে ১১টা থেকে তিনটা পর্যন্ত ম্যাক্সে আর তিনটা থেকে ৬টা পর্যন্ত সিএসসিআরে চলা এই অভিযানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিনিধি হিসেবে ডা. দেওয়ান মাহমুদ মেহেদি হাসান, ওষুধ প্রশাসনের প্রতিনিধি গুলশান জাহানসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

অভিযানে ম্যাক্সের বায়োকেমিস্ট্রি ল্যাবে ব্যবহৃত উপকরণ, ওষুধ এবং হাসপাতালের নথিপত্র ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়োগপত্র পরীক্ষা করে দেখা হয়। এসময় সাংবাদিকদের ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম বলেন, ‘ম্যাক্স হাসপাতালের প্যাথলজি ল্যাবে যথেষ্ট দক্ষ জনবল নেই। বায়োকেমিস্ট্রি ল্যাবে এইচএসসি পাস লোকজন চাকরি করছে। এখানে মিনিমাম স্নাতক ডিগ্রিধারী বা বিশেষ যোগ্যতাসম্পন্নদের কাজ করার কথা। এখানে বায়োকেমিস্ট ও মাইক্রোবায়োলজিস্টও নেই। একটি হাসপাতাল চালাতে হলে নমুনা পরীক্ষার নিজস্ব ব্যবস্থা থাকার নিয়ম থাকলেও মাক্সে সে নিয়ম অনুসরণ করা হয় না। রোগ নির্ণয়ে বিভিন্ন স্যাম্পল কালেকশন করে তারা চট্টগ্রাম ও দেশের বাইরের বিভিন্ন ল্যাবে পাঠিয়ে পরীক্ষা করিয়ে নিজেদের নামে রিপোর্ট দেয়। অনেকটা কমিশন এজেন্টের মত তারা কাজ করে।’

এসব অনিয়মের কারণে ম্যাক্স হাসপাতালকে দশ লাখ টাকা জরিমানা করার পাশাপাশি গাফিলতি সংশোধনের জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে ১৫ দিন সময় দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

একুশে/এডি