চট্টগ্রাম : ক্ষণিকের এই পৃথিবীতে সেবার মাধ্যমে নার্সরা মৃত্যুঞ্জয়ী হবে বলে আশা রেখেছেন নারীনেত্রী অ্যাডভোকেট রেহানা বেগম রানু।
বৃহস্পতিবার দুপুরে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে মা ও শিশু হাসপাতাল নার্সিং ইনস্টিটিউট ও শামসুন নাহার খান নার্সিং কলেজে ডিপ্লোমা ইন নার্সিং কোর্সের নবীনবরণ অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন তিনি।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে রেহানা বেগম রানু বলেন, ‘কেন এত দ্বন্ধ? ক্ষণিকের অতিথি আমরা। এই নশ্বর পৃথিবীতে আমরা কেবল মৃত্যুঞ্জয়ী হতে পারি, সেবা দিয়েই। সেবিকারা মৃত্যুঞ্জয়ী হবে, তাদের সেবার মাধ্যমে।’
হবু নার্সদের প্রতি রানু বলেন, ‘আপনাদের নামটা কিন্তু খুব চমৎকার- নার্স বা সেবিকা। আমার খুব ইচ্ছে করছে যে আপনাদের ওইখানে গিয়ে একটু বসি। বাংলাদেশের কোনো পেশার মানুষকে সেবিকা বলা হয় না। আপনারা সৌভাগ্যবান। আপনাদেরকে দেখে আমার ভীষণ ভালোলাগা কাজ করছে। এখানে আসতে পেরে আমি গর্ববোধ করছি। মনে হচ্ছে পৃথিবীর সৌন্দর্য সব আজকে এই হলরুমের মধ্যে।’
‘আমি আইন পেশায় আছি। আমাকে আইনজীবী বলা হয়। অর্থ্যাৎ আমি জীবিকা নির্বাহ করি আইন পেশা দিয়ে। ব্যবসায় মূল লক্ষ্য হচ্ছে মুনাফা অর্জন। কিন্তু কিছু পেশা আছে যেখানে বলা হবে না, এই পেশার পূর্বশর্ত মুনাফা অর্জন। আপনাদের নামের সাথে জুড়ে দেওয়া হয়েছে সেবিকা। আপাদমস্তক আপনারা সেবায় ব্রত হয়েছেন।’
রেহানা বেগম রানু বলেন, ‘মাদার তেরেসার নাম শুনেছেন আপনারা সবাই, আমি জানি। নিশ্চয়ই অনেকে মাদার তেরেসার ভক্ত। আমি ছোট থেকে মাদার তেরেসার ছবি দেখে দেখে বড় হয়েছি। আমরা সুরপাগল ছিলাম। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় আমরা গণসংগীত করে মানুষকে উজ্জীবিত করেছিলাম, সম্মিলিতভাবে। আমার ধারণা বিশ্বের এমন কোনো দেশ নেই, জায়গা নেই, মানুষ নেই যারা শ্রদ্ধায় মাথা অবনত করেন না মাদার তেরেসার সেবার জন্য। তিনি কুষ্ঠ রোগীদের নিয়ে কাজ করেছেন।
‘মাদার তেরেসার দুইদিন আগে-পরে মৃত্যুবরণ করেছিলেন আন্তর্জাতিকভাবে বিখ্যাত লেডি ডায়না। তিনি অনেক মানুষের স্বপ্নের নারী। আমিও কিন্তু ওনার একজন ভক্ত। কিন্তু আমি এত বেশি ভক্ত যে, ছোটকাল থেকে ধ্যান-জ্ঞান করে বড় হয়েছি, তিনি হলেন মাদার তেরেসা। রাজনীতিবিদদের নিয়ে অনেকের অনেক ধরনের কথাবার্তা থাকতে পারে। কিন্তু মাদার তেরেসা নিয়ে নেই। কেন নেই? আপনাদেরকে আমি ওনার উত্তরসূরিই বলবো।’
তিনি বলেন, ‘আমি দেখতে পাচ্ছি, আপনাদের মধ্যে অনেক মাদার তেরেসা লুকিয়ে আছেন। একদিন আপনারাও সেবা দিয়ে মানুষের ভালোবাসা অর্জন করবেন। ভারত থেকে আমি মাদার তেরেসার একটি পথিকৃত এনেছি। এখনো পর্যন্ত সেটা আমার কাছে সংরক্ষিত আছে। ওনাকে দেখলে আমার মনে হয়, আর কী লাগে। ওনি বিশ্বের কুষ্ঠ রোগীদের সন্তান মনে করেছেন।’
সৌদি আরবের জেদ্দায় অনেক বছর ধরে বসবাস করা বাংলাদেশী একজন নার্সের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন রানু। একসময় চট্টগ্রাম মেডিকেলের নার্স থাকা ওই নারী সুযোগ পেয়ে সৌদিতে যান। পরে স্বামী, দুই ভাই, বোনের স্বামী ও দুই ভাগিনাকেও সৌদিতে নিয়ে যান তিনি। সেখানে সেবার জায়গায় থাকায় সবার মনজয় করেন। সবার কাছে প্রিয়মুখ তিনি। কিন্তু সৌদি আরবের নতুন নিয়ম অনুযায়ী পরিবার নিয়ে বসবাস করলে সরকারকে জনপ্রতি দশ হাজার রিয়াল ট্যাক্স দিতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে স্বজনদের নিয়ে দেশে ফিরে আসার পরিকল্পনা শুরু করেন ওই নার্স।
রেহানা বেগম রানু বলেন, ওই নার্সের একজন পরিচিত ধনী ব্যক্তি, যিনি শত শত কোটি টাকার মালিক হয়ে গেছেন ব্যবসা করে। তিনি নার্সের বাসায় বেড়াতে গিয়ে একদিন অসুস্থ হয়ে যান। ওই ভদ্রলোক তাদের সংকটটা জানতো, কিন্তু প্রথমে এগিয়ে আসেননি। অসুস্থ হওয়ার পর একদিন-দুইদিন বাসায় রেখে চিকিৎসা সেবা দিয়েছে, তিনি সেরে উঠলেন। এরপর ভুল ভাঙলো এবং বললো আপনাদেরকে একেবারের জন্য দেশে ফিরে যেতে হবে না। জনপ্রতি দশ হাজার রিয়াল দিয়ে তিনি রাখার ব্যবস্থা করেছেন। শুধুই সেবিকা বলে।
‘আপনারাও তো পারবেন। আপনারাও মানুষের মন জয় করবেন। আপনাদের জন্য অনেক বিত্তবান মানুষ এগিয়ে আসবে। তবে আমার দৃষ্টিতে নার্সরাই হচ্ছেন শ্রেষ্ঠ বিত্তবান মানুষ। তারা মানুষকে অবহেলা করেন না, মানুষকে ভালোবাসেন, মানুষকে ধ্যান-জ্ঞান করেন।’
পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অস্ত্র কী- জানতে চান রেহানা বেগম রানু। তখন উপস্থিত শিক্ষার্থীরা জানান- ভালোবাসা। এরপর রানু বলেন, পৃথিবীতে ভালোবাসার চেয়ে সবচেয়ে বড় অস্ত্র তৈরি হয়নি, কখনো হবেও না। সেই অস্ত্র হচ্ছে আপনাদের হাতের ভালোবাসার অস্ত্র। যে অস্ত্র দিয়ে মানুষের সেবা করে আপনারা প্রাণে বাঁচিয়ে রাখেন। সেই যোগ্যতা নার্সদের আছে। আমি বিনয়ের সাথে বলি, অনেক ডাক্তার অসহায় হয়ে যাবেন যদি নার্সরা তাদের পাশে না থাকেন, তাদেরকে সঠিক সময়ে সহযোগিতা না করেন।
নার্সিংয়ে ভর্তি হওয়া ছেলে-মেয়েদের প্রতি তিনি বলেন, ‘কখনো মন ছোট করবেন না। পেশা কখনো ছোট হতে পারে না। আপনি এমন এক জায়গায় এসেছেন, আপাদমস্তক সেবার মনমানসিকতা নিয়ে। আপনি ধ্যানজ্ঞান করেই কিন্তু এখানে এসেছেন। মনে মনে একটা শপথ গেঁথে এসেছেন। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, শপথ ভাঙার জন্য আপনারা এখানে আসেননি। শপথরক্ষা করার জন্য আপনারা শপথ করেছেন।’
সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর রেহানা বেগম রানু বলেন, আমি সাধারণ একজন মাঠকর্মী। আমার আর কোনো পরিচয় নেই। মানুষকে ভালোবেসে মরতে চাই। পৃথিবীর কোথাও আমাদের স্থায়ী ঠিকানা নেই। একটি চিরস্থায়ী ঠিকানা আছে সেটি হচ্ছে কবর। সেই কবরে যাওয়া পর্যন্ত চাই মানুষের পাশে থাকতে, মানুষকে ভালোবেসে। আপনাদের মতো মানুষকে ভালো বাসতে-বাসতে যেন চিরস্থায়ী ঠিকানায় চলে যেতে পারি।
‘হাসপাতাল পরিচালনা কমিটির কার্যনির্বাহী কমিটির সাধারণ সম্পাদক ডা. আনজুমান আরা ইসলামের সৎ, দক্ষ ও যোগ্য নেতৃত্বে হাসপাতালটি আজকের অবস্থানে এসেছে। এ রকম একজন শক্ত অভিভাবক, বটবৃক্ষের ছায়ায় থাকলে আপনাদের অর্থনৈতিক সংকট, পারিবারিক সংকট কিছুই থাকবে না। সকল প্রকারের সহযোগিতা পাবেন।’
পরপর তিনবার সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়া রেহানা বেগম রানু বলেন, ‘মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে গেছি। আর তো কিছু লাগে না। অনেকের পাজেরো আছে, বিশাল দালান আছে, কিন্তু কেউ তাকে শ্রদ্ধায় একটা সালামও দেয় না। দুজন মানুষ ভালোবাসে না। কিন্তু তার অর্থকে ভালোবাসে। তার পাজেরোকে ভালোবাসে। তার দালানকে ভালোবাসে। সেটা ভালোবাসা নয়, সেটা অভিনয়। লোক দেখানো। কিন্তু আপনাদেরকে প্রত্যেকটা রোগী ভালোবাসবে। এটা হাজার হাজার কোটি টাকা দিয়েও মূল্যায়ন করা যাবে না।’
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পিএইচপি পরিবারের চেয়ারম্যান সুফী মোহাম্মদ মিজানুর রহমান। বক্তব্য রাখেন সংরক্ষিত কাউন্সিলর আবিদা আজাদ, মা ও শিশু হাসপাতালের সহ-সভাপতি এস এম মোরশেদ হোসাইন, প্রাক্তন কমিশনার রেখা আলম চৌধুরী প্রমুখ।
এর আগে মা ও শিশু হাসপাতাল নার্সিং ইনষ্টিটিউট ও শামসুন নাহার খান নার্সিং কলেজে ২০১৭-২০১৮ সেশনে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের শপথবাক্য পাঠ করানো হয়।
অনুষ্ঠানের শেষের দিকে মা ও শিশু হাসপাতালের তহবিলের জন্য এক কোটি টাকার চেক তুলে দেন পিএইচপি পরিবারের চেয়ারম্যান সুফী মোহাম্মদ মিজানুর রহমান। এ সময় অন্যান্যের মধ্যে শামসুন নাহার খান নার্সিং কলেজের অধ্যক্ষ জিন্না রানী দাশ উপস্থিত ছিলেন।
একুশে/এসআর
ছবি : আকমাল হোসেন