শনিবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৩০ ভাদ্র ১৪২৬

ট্রাফিক পুলিশের ‘টেন্ডল’ হতেও লাগে টাকা!

প্রকাশিতঃ বুধবার, আগস্ট ৮, ২০১৮, ৬:৫৬ অপরাহ্ণ

শরীফুল রুকন : সাদা পোশাকধারী কিছু লোককে চট্টগ্রাম নগরের মোড়ে মোড়ে গাড়ি থামিয়ে টাকা আদায় করতে দেখা যায় হরহামেশা। ট্রাফিক পুলিশের কিছু অসাধু কর্মকর্তার হয়ে চাঁদা আদায়কারী এসব ব্যক্তিকে বলা হয়-টেন্ডল।

বর্তমানে ‘টেন্ডলের’ সংখ্যা বাড়লেও চাঁদা আদায়ের স্পট তেমন বাড়েনি। কোনো একটি স্পটে ‘টেন্ডল’ নিয়োগের দরকার পড়লে দেখা যায়, ওই স্পটের দায়িত্ব নিতে অনেকেই ছুটে আসছেন, করছেন নানা চেষ্টা-তদবির। এছাড়া আয় ভালো হওয়ায় ‘ব্যস্ত মোড়ের’ টেন্ডল-পদ লোভনীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে অনেকের কাছে।

আর এই সুযোগটি নিচ্ছে ট্রাফিক পুলিশের ভেতর ও বাইরের লোকদের নিয়ে গড়া একটি সিন্ডিকেট। রীতিমতো ‘নিয়োগফি’ নিয়ে টেন্ডল নিয়োগ দিচ্ছেন তারা। এলাকাভেদে ভিন্ন ভিন্ন অংকের টাকা জমা দিলেই হওয়া যাচ্ছে ট্রাফিক পুলিশের ‘টেন্ডল’।

অভিযোগ আছে- নগরের কদমতলী রেলক্রসিং থেকে প্রায় দেড়শ’ গজ উত্তরে ফ্লাইওভারের নিচে আটমাসিং মোড়ে ট্রাফিক পুলিশের হয়ে চাঁদা আদায়ের দায়িত্ব পান রিপন। এজন্য কাজে যোগ দেওয়ার আগে ৩০ হাজার টাকা নিয়োগফি দিতে হয়েছে তাকে।

এছাড়া জসিম নামের এক ব্যক্তি জিইসি মোড়ে টেন্ডলের দায়িত্ব পেয়েছেন; এ জন্য তাকে ৪০ হাজার টাকা নিয়োগফি দিতে হয়েছে বলে অভিযোগ আছে।

প্রায় ৫০ জনের মতো টেন্ডল ঘুরেফিরে চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন স্পটে ‘দায়িত্বপালন’ করেন বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। এদের মধ্যে রহিম, কামাল, জসিম, রিপন, আমীর, আনোয়ার, সোহেল, আফসার, আকতার, শাহেদ, সাহাবুদ্দিন, রফিক, হৃদয়, সুমন ওরফে লম্বা সুমন, জহির, জাবেদ ও দুলালের নাম পাওয়া গেছে; তারা বিভিন্ন এলাকায় ট্রাফিক পুলিশের পাশাপাশি অবস্থান নিয়ে গাড়ি থেকে টাকা আদায়ে সক্রিয় থাকেন।

একজন ট্রাফিক সার্জেন্ট নির্দিষ্ট একটি স্পটে এক সপ্তাহ দায়িত্ব পালন করেন। ফলে কোনো কোনো টেন্ডল নতুন জায়গায় সার্জেন্টের সাথে চাঁদা তোলার জন্য চলে যান। তবে বেশিরভাগই টেন্ডল নির্দিষ্ট সময়ের জন্য স্পটভিত্তিক নিয়োগ পান বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

চট্টগ্রাম জেলা ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান শ্রমিক ইউনিয়নের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অনেক আগে ট্রাফিক পুলিশের সার্জেন্টরা কনস্টেবল পাঠিয়ে চাঁদা নিতেন। কয়েক বছর ধরে সার্জেন্টদের নিয়োগ দেয়া সাদাপোশাকধারী কিছু লোক মোড়ে মোড়ে গাড়ি থামিয়ে টাকা আদায় করেন। টাকা নিয়ে তারা সার্জেন্টদের হাতে তুলে দেন। এসব বিষয় নিয়ে বিভিন্ন সময় আমরা ট্রাফিকের ডিসির কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণসহ অভিযোগ দিয়েছি। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। উল্টো যারা অভিযোগ দেয় তাদের গাড়ি ধরে হয়রানি করা হয়।

একজন বাসচালক অভিযোগ করে জানান, বছর খানেক আগেও টেন্ডলের উপর পুরোপুরি নির্ভর ছিলেন সার্জেন্ট ও টিআই’রা। কারণ রাস্তায় দাঁড়িয়ে প্রকাশ্যে গাড়ি থেকে টাকা আদায় কঠিন ছিল তাদের জন্য, কেউ ছবি তুলে ফেলে কিনা সেই ভয় ছিল। কিন্তু গত বছরের নভেম্বর থেকে বিভিন্ন মোড়ে ‘ট্রাফিকবক্স’ স্থাপন করার পর থেকে সেখানে চালক-হেলপারকে ডেকে নিয়েও টাকা আদায় করছেন ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা।

গত বছরের নভেম্বর-ডিসেম্বরে এসব ট্রাফিক বক্স উদ্বোধনের সময় ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের পাশে মোহাম্মদ এয়াকুব মাস্তান আলচিশতি ওরফে মাস্তান মামাকে দেখা গেছে।

অভিযোগ আছে, শিল্পগ্রুপগুলোর কাছ থেকে অনুদান এনে এসব ট্রাফিক পুলিশ বক্স স্থাপনে ভূমিকা রেখেছেন মাস্তান মামা; যিনি পুলিশ প্রশাসনে নানাকারণে আলোচিত-সমালোচিত।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন টেন্ডল জানান, প্রতিদিন হাজার হাজার টাকা ট্রাফিক পুলিশকে তুলে দেন তিনি, অথচ তাকে কোনোদিন দেয়া হয় ৫০০, কোনোদিন ৬০০ টাকা।

তিনি আরও জানান, এরপরও ট্রাফিক পুলিশ সম্পর্কিত নানা অনুষ্ঠান উপলক্ষে ধার্য করা চাঁদা দিতে হয়। এমনকি গত বছরের ডিসেম্বরে আনোয়ারায় মাস্তান মামার খানকা উদ্বোধনের জন্য ধার্য করা চাঁদার পাশাপাশি তিনটি খাসি দিতে হয়েছে সব টেন্ডলকে।

অভিযোগ আছে, ট্রাফিক পুলিশের টেন্ডল নিয়োগ দেওয়ার জন্য ‘টেন্ডলসেল’ গঠন করা হয়েছে। মাস্তান মামা নিজেই এটির তত্ত্বাবধান করেন। আর ‌’টেন্ডলসেল’ পরিচালনার মূল দায়িত্বে আছেন চট্টগ্রাম মহানগর ট্রাফিক পুলিশের বন্দর জোনের টিআই (প্রসিকিউশন) আবুল কাশেম চৌধুরী ও উত্তর জোনের সার্জেন্ট (প্রসিকিউশন) আনোয়ারুল হক।

এ ব্যাপার জানতে চাইলে উপ পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক-উত্তর) হারুন অর রশীদ হাজারী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘টেন্ডলরা ট্রাফিক পুলিশের পক্ষে নয়, পরিবহন শ্রমিকদের পক্ষ হয়ে টাকা তুলে বলে জানি।’ তিনি বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন এবং ট্রাফিক পুলিশ টেন্ডল নিয়োগ করে টাকা তোলার তথ্য-প্রমাণ মিললে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান ট্রাফিক বিভাগের এ উপ কমিশনার।

একুশে/এসআর/এটি