শনিবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৩০ ভাদ্র ১৪২৬

আ. লীগের সাইনবোর্ড নিয়েও বাঁচতে পারল না ‘কানা আলতাফ’ (ভিডিও)

প্রকাশিতঃ সোমবার, আগস্ট ১৩, ২০১৮, ১০:৫৯ অপরাহ্ণ

চট্টগ্রাম : শাসক দল আওয়ামী লীগের সাইনবোর্ড ধারণ করেও বাঁচতে পারলো না স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত মাদকব্যবসায়ী, দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী আলতাফ হোসেন ওরফে ‘কানা আলতাফ’।

সোমবার সকাল ৮টায় কাপ্তাই সড়কের রাঙ্গুনিয়ার কাটাখালির কূল এলাকা থেকে তার গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করা হয়। এর আগে সোমবার রাতে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ পরিচয়ে মরিয়নগরের বাড়ি থেকে কানা আলতাফকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় বলে তার পরিবারের দাবি।

এরপর যেখান থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়েছে সেখানে রাত ৩টার দিকে তিনটি গুলির শব্দ শুনতে পায় স্থানীয়রা। তবে তার শরীরে ছুরিকাঘাতেরও চিহ্ন রয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয়রা।

এদিকে, সন্ত্রাসী কানা আলতাফের নিহত হবার ঘটনায় রাঙ্গুনিয়ার জনমনে স্বস্তি ফিরে এসেছে। অনেকেই নিজেদের মাঝে মিষ্টি বিতরণ করেছেন, উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাঙ্গুনিয়া উপজেলার মরিয়মনগর ইউনিয়নের আবদুল মোতালেব মেম্বারের দ্বিতীয় সন্তান কানা ”আলতাফ”। ছোটকাল থেকেই তিনি ছিলেন একরোখা প্রকৃতির। ২০০০ সালের গোড়ার দিকে মূলত ডাকাতির মাধ্যমে তার উত্থান, আলোচনার পাদপ্রদীপে আসা। মরিয়মনগরসহ আশপাশের এলাকায় অসংখ্য ডাকাতির হোতা তিনি। এ নিয়ে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়। তাকে যেতে হয় জেলে।

২০০৮ সালে ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে আ য়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ডাকাতির ‘তকমা’ ঘুচিয়ে রাতারাতি আওয়ামী লীগ নেতা বনে যান আলতাফ। স্থানীয় নেতাদের ধরে, সুপথে ফেরার প্রতিশ্রুতিতে প্রথমে স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং পরবর্তীতে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি হন তিনি। কিন্তু ‘সভ্য’ হওয়ার পরিবর্তে আওয়ামী লীগের রাজনীতিকে ব্যবহার করে তার ‘অসভ্যতা’র খোলসটাই নতুন করে উন্মোচিত হয়।

সন্ত্রাসী, মাদকব্যবসা, ভূমিদখল এমন কোনো কাজ নেই যা তিনি করেননি। মরিয়মনগর চৌমুহনী বাজারসহ আশপাশের এলাকায় কেউ কোনো স্থাপনা, দোকান, ঘরবাড়ি নির্মাণ করতে গেলে কানা আলতাফকে বাধ্যতামূলকভাবে চাঁদা দিতে হতো। তার অত্যাচারের শিকার হন খোদ আওয়ামী পরিবারেরও অনেকেই।

চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য, আবুধাবী বঙ্গবন্ধু পরিষদের সভাপতি ইফতেখার চৌধুরী বাবুলের জমি দখল করতেও দ্বিধা করেননি আলতাফ বাহিনী। মরিয়মনগর চৌমুহনী এলাকায় দোকান দখল প্রতিরোধ করতে গেলে রাঙ্গুনিয়া থানার তৎকালীন ওসি (তদন্ত) চন্দন চক্রবর্তীকে গুলি করতেও দ্বিধা করেনি আলতাফ । বছর দুয়েক আগে জমি সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে চৌমুহনী বাজারে প্রতিপক্ষের আক্রমণের শিকার হন আলতাফ। রাতে একটি দোকানে বসে আড্ডা দিলে প্রতিপক্ষের লোকজন আলতাফকে লক্ষ্য করে ব্রাশফায়ার করে। এতে ঘটনাস্থলে আলতাফের এক সহকর্মী মারা গেলেও আলতাফ গুলিবিদ্ধ হন।

গুলিবিদ্ধ আলতাফ চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে আসার পর আবারো বেপরোয়া হয়ে উঠেন। গত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে মরিয়মনগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হওয়ার জন্য আলতাফ মরিয়া হয়ে উঠেন। এজন্য কাউন্সিলরদের অস্ত্র ঠেকিয়ে, কোরআন শপথে জিম্মি করে তৃণমূলের ভোটে প্রথম হয়ে যান আলতাফ। অবশ্য সীমানা জটিলতা সংক্রান্ত মামলায় সেই নির্বাচন আদালতে ঝুলে যায়।

ওইসময় আলতাফকে তুলে নিয়ে যায় র‍্যাব। র‍্যাবের হাতে গ্রেফতারের পর এলাকার মানুষ আলতাফের ক্রসফায়ারের জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করেছিল। কিন্তু সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে পরদিন র‍্যাব আলতাফকে রাঙ্গুনিয়া থানায় সোপর্দ করলে পুলিশ তাকে আদালতে চালান দেয়। দীর্ঘদিন কারাভোগের পর জামিনে মুক্ত হয়ে ফের পুরোনো চেহারায় ফিরে যায় ‘কানা আলতাফ’। বীরদর্পে শুরু করে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, ভূমিদস্যুতা এবং মাদকব্যবসা। আর এসব কাজে তাকে সহযোগিতা করতো রাঙ্গুনিয়া যুবলীগের প্রভাবশালী এক নেতা, যিনি আলতাফকে তার সেকেন্ড ইন কমান্ড বানিয়েছেন।

অবশেষে সোমবার সকালে তার গুলিবিদ্ধ লাশ পাওয়ার মধ্যদিয়ে অবসান ঘটলো ‘কানা আলতাফ’ এর সন্ত্রাসী জগতের কালো অধ্যায়ের।

রাঙ্গুনিয়া থানার ওসি ইমতিয়াজ মো. আহসানুল কাদের ভুঞা একুশে পত্রিকাকে বলেন, সোমবার সকালে গুলিবিদ্ধ লাশটি উদ্ধার করে ঘরে নিয়ে যান নিহত অালতাফের স্বজনরা। খবর পেয়ে লাশটি উদ্ধার করে মর্গে পাঠানো হয়েছে। নিহতের শরীরে তিনটি গুলির চিহ্ন রয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত মাদক ও অস্ত্র ব্যবসায়ী আলতাফের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগে ১১টি মামলা থাকার কথাও জানান ওসি।

একুশে/এসআর/এটি