শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

ছিন্নমূলদের জন্য কোরবানি, বছরজুড়ে টাকা জমান তিনি (ভিডিও)

| প্রকাশিতঃ ২৫ অগাস্ট ২০১৮ | ১০:৫৮ অপরাহ্ন

চট্টগ্রাম : আশপাশে ঘনবসতি। পরিবেশটা বিবর্ণ, হতশ্রী। জীর্ণশীর্ণ কুড়েঘর। এ ঘরে, ঘরের সামনেই বছরের একটি নির্দিষ্ট দিনে ছিন্নমূলদের মেলা বসে। হতদরিদ্রের লাইন পড়ে, সে লাইন ‌‌‌’দীর্ঘ’। অনেক ‘দীর্ঘ’।

কারণ, এ ঘরেই সমাজে আমরা ‘বড়’ বলতে যা বুঝি, সেরকম কেউ নন, মনের দিক থেকে ‘বড়’, ‘মস্তবড়’ মানবিক এক মানুষের বাস। মানুষটির নাম জাহাঙ্গীর আলম।

আঠার বছর আগের কথা। সে বছর অর্থাভাবে কোরবানি দেয়া সম্ভব হয়নি জাহাঙ্গীরদের ঘরে। সেদিনই পাশের ঘরটিতে ঈদ উপলক্ষে ‘জামাইআদর’ চলছে। হরেক রকম আয়োজন। রঙিন, বর্ণময় সেই আয়োজনের ঘ্রাণ পেয়ে ছুটে এসেছিলেন দুজন ফকির। দাঁড়িয়েছিলেন দরজা ঘেঁষে। তখনই গৃহকর্তার দূর দূর করে তাদেরকে তাড়িয়ে দেয়ার দৃশ্য জাহাঙ্গীরের ভেতরটা মুছড় দিয়ে যায়। অজান্তেই জাহাঙ্গীরের চোখের জল গড়িয়ে পড়ে। সেদিনই জাহাঙ্গীর পণ করেন নিজের জন্য নয়, সামর্থ্য হলে এই গরীবদের জন্যই তিনি কোরবানি দেবেন। কিন্তু সেই পথটা অত মসৃণ ছিল না।

ড্রাইভিং স্কুল থেকে হালাল উপার্জনের যৎসামান্য টাকায় পরিবার চালাবেন, ঘরে ‘চালা’ লাগাবেন, নাকি কোরবানি দেবেন! সবমিলিয়ে এক কঠিন সমীকরণ। এ সমীকরণ মেলাতে তাকে আরও কয়েকবছর অপেক্ষা করতে হয়। ঘরসংস্কার কিংবা পরিপাটি ‘চালা’ লাগানোর বিষয়টি মাথা থেকে ঝেড়ে ফেললেন। নিজের বিলাসিতাকে ‘গুডবাই’ জানালেন। কোরবানের জন্য বছরের শুরু থেকে ২ হাজার, ৫ হাজার করে টাকা জমাতে লাগলেন।

১২ বছর আগের কথা। সে বছর কোরবান আসতে আসতে তার সঞ্চয় দাঁড়ালো ৫০ হাজার টাকা। আরও ১০ হাজার টাকা যুক্ত করে জাহাঙ্গীর কিনলেন ৬০ হাজার টাকার গরু। পাড়ার মানুষের চোখ ‘ছানাবড়া’। ও মা জাহাঙ্গীর নাকি পাড়ার সবচেয়ে বড় গরু কিনল! অনেকে হাসাহাসি করলেন। কেউ টিপ্পনি কাটলেন। বললেন- জাহাঙ্গীর টাকার গরম দেখাচ্ছে। কিন্তু জাহাঙ্গীরই জানেন, এ টাকার পেছনে তার কত রক্তক্ষরণ! বড়ত্ব ফলানো নয়, নয় অসম প্রতিযোগিতা। শ্রেফ চিত্তের তাগাদা, মানবিক তাড়না থেকে তার এই চেষ্টা, এই রক্তক্ষরণ। যে যাই বলুক, আমার চিন্তা তো সৎ, মহৎ- এভাবেই নিজেকে সামলে নিয়ে সেই মাহেন্দ্রক্ষণের জন্য চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিতে লাগলেন জাহাঙ্গীর।

প্রথমবার ২শ’ জনের আয়োজন। মেন্যু ঠিক করলেন দুটি পরোটা, একবাটি মাংস, একটি আপেল, একটি কলা সঙ্গে পেপসি। মাংসের বাইরে বাকি মেন্যুর জন্য বাজেট করলেন আরো ১০ হাজার টাকা। প্রাথমিক প্রস্তুতি শেষ। কিন্তু যাদের খাওয়াবেন তাদের তো এ বার্তা পৌঁছে দিতে হবে।

নিজ বাড়ি কালামিয়া বাজারের আশপাশে বস্তিতে বস্তিতে গিয়ে কোরবানের আগের রাতে জানিয়ে দিতেন তার ঘরে ‘অতিথি’ হওয়ার কথা। যেমন নিমন্ত্রণ তেমন কাজ। কোরবানের দিন দুপুর না গড়াতেই জাহাঙ্গীরের কুড়েঘরে ‘অতিথি’দের ঢল নামে। সুশৃঙ্খলভাবে ঈদের দিন ভরপেট খেয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলে সমাজের কাছে উপেক্ষিত, ধিকৃত অতিথিরা।

আর এতে জাহাঙ্গীরের চোখে আনন্দাশ্রু। যে অশ্রুতে গড়িয়ে পড়ে অমিয় আনন্দধারা। ১২ বছর আগে সেই যে শুরু, তার আর থামাথামি নেই। বরং দীর্ঘ হয়েছে অতিথির সারি। বাড়তে বাড়তে অতিথি ৫শ’ ছাড়িয়ে গেলো একসময়। জাহাঙ্গীরের প্রস্তুতিটাও হয় অতিথির বাড়বাড়ন্ত অনুযায়ী।

৫ বছর আগের কথা। অতিথির বাড়বাড়ন্ত অবস্থা দেখে সেবার ১ লাখ ৮ হাজার টাকায় মস্তবড় এক অস্ট্রেলিয়ান গরু কিনলেন জাহাঙ্গীর। বিক্রেতাকে অনুরোধ করলেন গরুটি তার ঘরে পৌঁছে দিতে। পৌঁছে দিতে গিয়ে জাহাঙ্গীরের ঘর চিনতে পারে না বিক্রেতারা। ঘরের সামনেই দাঁড়িয়ে তারা বিরক্ত হচ্ছেন, ‘ভাই আপনার ঘরটা কই বলেন না, আর কত দাঁড়াব।’ কুড়েঘরটি যে জাহাঙ্গীরের তারা বিশ্বাসই করতে চান না। শুনে তাদের চক্ষু চড়কগাছ। যার একটা থাকার ঘর নেই তিনিই কিনা কিনলেন এত বড় গরু! আসল কাহিনী শোনার পর তারা দুহাত যুক্ত করে নত হলেন, জাহাঙ্গীরের মানবিকতাকে সাধুবাদ দিলেন।

প্রতি কোরবানিতে নিরবচ্ছিন্নভাবে এই আতিথেয়তা দেখাতে গিয়ে পড়শিদের কত বাঁকা কথা শুনতে হয় তাকে! জাহাঙ্গীর পাড়ার মধ্যে এসব কী শুরু করেছে, পাড়াটাকেই বস্তি বানালো, বস্তির ছেলেমেয়েদের জন্য হাঁটতে পারছি না- আরও কত কী?

এসব কারণে মানসিক ‘যন্ত্রণা’ও কম ভুগতে হয়নি তাকে। কোরবানের ঈদ এলে সৃষ্টিকর্তার কাছে দুহাত তুলে আর্জি জানাতেন জাহাঙ্গীর। বলতেন, হে খোদা তুমি রহমানুর রহিম, তুমিই ইজ্জতদাতা, বরকতদাতা। সব প্রতিকূলতা ছাপিয়ে শেষপর্যন্ত জাহাঙ্গীরের আয়োজন হয়ে উঠতো পরিপাটি, বরকতময়।

কোরবানি নিয়ে এক ধুন্ধুমার, বুককাঁপা অভিজ্ঞতাও আছে জাহাঙ্গীরের। এক কোরবানি ঈদের দুদিন আগে ৮০ হাজার টাকায় মহিষ কিনলেন। কিন্তু কোরবানের একদিন আগে অকস্মাৎ সুস্থ-সুবল সেই মহিষটি মারা যায়।

ব্যাংক বন্ধ। হাতে ২০-২৫ হাজারের বেশি টাকা নেই। রাত পেরোলেই কোরবান। অতিথিদের কী জবাব দেবেন-চরম এক অসহায়ত্ব জাহাঙ্গীরের চোখেমুখে। তখনই বন্ধু আকবরের ফোনটা এলো-‌’জাহাঙ্গীর তোর মহিষ নাকি মারা গেছে।’

‘ভাই এখন ফোনটা রাখ, খুব চিন্তাই আছি। পরে কথা বলবো।’ জাহাঙ্গীরের এমন জবাবে আকবরের পাল্টা জবাব- ‘আরে সেজন্যই ফোন করেছি। আমার ড্রয়ারে ৫০ হাজার টাকার একটা বাণ্ডিল আছে, সেটা নিয়ে কাজ সেরে নেয়। ঈদের পর ফিরিয়ে দিলে চলবে।’

সেদিন এভাবেই সৃষ্টিকর্তা জাহাঙ্গীরকে রক্ষা করেছিলেন। তাই সমস্ত কৃতজ্ঞতা সবার আগে তাকেই জানালেন। আকবরের টাকার সঙ্গে আরও ১৫ হাজার যোগ করে ৬৫ হাজার টাকায় আরেকটি গরু কিনলেন কোরবানের আগের রাতে।

এভাবে কোরবানি দিয়ে প্রতিবার ৫ শতাধিক নিরন্ন, অভুক্ত মানুষকে পেটপুরে খাওয়ান শুধু তা নয়, কোরবানির অবশিষ্ট মাংস প্রতিবেশি, স্বজনদের মাঝে সামাজিক বণ্টন নিশ্চিত করে কোরবানির মর্মার্থ ফুটিয়ে তোলার চেষ্টায় ব্রত জাহাঙ্গীর। বড়লোকদের কোরবানির মাংস সংরক্ষণের প্রতিযোগিতার বিপরীতে জাহাঙ্গীরের ফ্রিজ থাকে মাংসশূন্য। ভোগবিলাসী সমাজে এ যেন এক অনন্য, ব্যতিক্রমী উদাহরণ।

ব্যতিক্রমী এই কোরবানির আয়োজন সম্পর্কে জানতে চাইলে একুশে পত্রিকার কাছে করজোড়ে ক্ষমা চান নিভৃতচারী জাহাঙ্গীর আলম। বলেন, ‘ভাই, নিভৃতে কাজটি করে চলেছি মানসিক প্রশান্তির জন্য। কারো কাছে নিজেকে জাহির করার জন্য নয়।’ বলেই ফোনের লাইনটা কেটে দেন তিনি।

একুশে/এটি