শনিবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৩০ ভাদ্র ১৪২৬

রিমান্ডে এনে ‘ডিমান্ড’!

প্রকাশিতঃ সোমবার, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০১৮, ৭:৪৪ অপরাহ্ণ

চট্টগ্রাম : রিমান্ড- সাধারণ মানুষের কাছে একটি আতঙ্কের নাম। পুলিশি রিমান্ডে অমানুষিক নির্যাতনের অভিযোগ বহু পুরনো। পুলিশের হেফাজতে থাকা অবস্থায় নির্যাতনে মৃত্যুর অভিযোগও কম নয়। রিমান্ড নিয়ে মানুষের মধ্যে থাকা এই ভয়কে কাজে লাগিয়ে টাকা ‘ডিমান্ড’ করার অভিযোগ আছে পুলিশের বিরুদ্ধে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী নিজেদের অদক্ষতা ঢাকতে রিমান্ডে নির্যাতন করে মিথ্যা স্বীকারোক্তি আদায় করে এমন অভিযোগও অহরহ।

রিমান্ডে নিয়ে একজন আসামির সঙ্গে সচরাচর কী ধরনের আচরণ করা হয়, তা অনুসন্ধান করতে এ প্রতিবেদক চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার ও চট্টগ্রাম আদালত প্রাঙ্গণে চারজন আসামি ও তাদের স্বজন এবং একাধিক আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলেন। এসব কথোপকথনে উঠে এসেছে রিমান্ডে নিয়ে পুলিশি নির্যাতনের ভয়ঙ্কর সব তথ্য। তবে ভুক্তভোগীরা নিজেদের পরিচয় গণমাধ্যমে প্রকাশে রাজী নন।

তারা বলেছেন, রিমান্ডে নিয়ে বেদম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মাধ্যমে তার স্বজনদের কাছ থেকে অনৈতিকভাবে টাকা আদায় করছে কিছু অসাধু কর্মকর্তা। আবার কিছু ক্ষেত্রে বাদীপক্ষ থেকে টাকা নিয়ে আসামিকে ‘শিক্ষা’ দিতে রিমান্ডে আনা হয়। রিমান্ডের নামে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে নির্যাতনই শুধু নয়, এমনকি হাত-পায়ের নখ উপড়ে ফেলারও অভিযোগ রয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এমন নির্যাতন করা হয় যে, শুধু আসামি নন, তার নিকটজন পর্যন্ত ভীষণ আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েন।

পুলিশের ভাষায় নির্যাতনের এসব ধরনকে বলা হয় ‘থেরাপি’। শারীরিক নির্যাতনের অন্তত এমন ডজনখানেক থেরাপি আছে তাদের। এর মধ্যে গিরা নির্যাতন, বাদুড় ধোলাই, ওয়াটার থেরাপি, উলঙ্গ করে নির্যাতন, সারা দিন না খাইয়ে রাখা, টানা নির্যাতন, বাতাস নির্যাতন, বোতল ও ডিম থেরাপি, ডিসকো ড্যান্স থেরাপি, সেলাই থেরাপি, ঝালমুড়ি থেরাপি উল্লেখযোগ্য।

হাত-পায়ের জয়েন্টগুলোতে লাঠিপেটা করার নাম গিরা নির্যাতন। এ নির্যাতনের ফলে হাড়-মাংস থেঁতলে যায়। তবে বাইরে থেকে কিছুই স্পষ্ট হয়না। চিৎ করে মেঝেতে ফেলে হাত-পা বেঁধে মুখে গামছা বা কাপড় ঢুকিয়ে পানি ঢেলে মারধর করাকে বলা হয় ওয়াটার থেরাপি। নাকে-মুখে পানি দিতে থাকলে নিঃশ্বাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। পরে আসামি তথ্য দিতে থাকে। দুটি উঁচু টেবিলের মাঝখানে দুই হাত বেঁধে ঝুলিয়ে পেটানোকে বলা হয় বাদুড় ধোলাই। এ ধরনের নির্যাতনে আসামি জ্ঞান হারায়। গরম বা প্রচণ্ড ঠাণ্ডা ডিম মলদ্বারে ঢুকিয়ে নির্যাতন করাকে বলা হয় ডিম থেরাপি। পাছায় ইলেকট্রিক শক দেওয়াকে বলা হয় ডিসকো ড্যান্স থেরাপি। হাত-পায়ের নখে মোটা সুঁই ঢুকানোকে বলা হয় সেলাই নির্যাতন। চোখ-মুখ ও নাকে শুকনো মরিচ লাগানোকে বলা হয় ঝালমুড়ি নির্যাতন। সিলিং ফ্যানে ঝুলিয়ে নির্যাতন করাকে বলা হয় বাতাস নির্যাতন। টাকা আদায় ও কথিত স্বীকারোক্তি আদায় করতে মূলত এসব নির্যাতন করা হয় বলে অভিযোগ আছে।

পুলিশি রিমান্ডের অভিজ্ঞতার কথা এ প্রতিবেদককে জানিয়েছেন চট্টগ্রামের একজন শিক্ষক। তিনি বলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে একটি মিথ্যা মামলায় আমাকে জড়িয়ে দেয়া হয়। এরপর আদালতে আত্মসমর্পণ করলে মামলায় জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য রিমান্ডে পায় পুলিশ। সেদিন দুপুরে কারাগার থেকে পুলিশ তাদের কার্যালয়ে নিয়ে যায়। তখন দুইজন পুলিশ সদস্য আমার কাছে এসে হাতে ফোন ধরিয়ে দিয়ে বলেন, পরিবারকে ফোন করে আপনার এবং আমাদের জন্য খাবার নিয়ে আসতে বলুন। কথা শুনে আমি অবাক হলাম। পরে নিজের পরিচয় দিয়ে ও জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তাকে বিষয়টি জানিয়ে রেহাই পাই। সেদিন পুলিশ সদস্যদের সাথে কথা বলে বুঝতে পারলাম, রিমান্ড মানে হচ্ছে ডিমান্ড পূরণের আয়োজন।

চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি কফিল উদ্দিন চৌধুরী বলেন, পুলিশ চাইলেই রিমান্ড মঞ্জুর করছে আদালত। কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, রিমান্ড শেষে রক্তাক্ত অবস্থায় আদালতে হাজির করা হচ্ছে। পুলিশ রিমান্ড চায়, তখন ওই বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেটের একটি বিরাট আইনগত দায়িত্ব থাকে। এবং তার ওপর নির্ভর করে একজন নিরীহ মানুষকে রিমান্ডে নিয়ে যাতে নির্যাতনের শিকার হতে না হয় এবং নির্যাতনের ফলে পুলিশের শেখানো মতে মিথ্যা স্বীকারোক্তি প্রদানে বাধ্য না হয়। দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, রিমান্ড বিষয়ে এখন উচ্চ আদালতের নির্দেশনা নিম্ন আদালতে অনুসরণ করা হচ্ছে না।

এদিকে পুলিশি হেফাজতে পুলিশি নির্যাতন ও অসংখ্য মৃত্যু এবং পুলিশি রিমান্ডে কোনো অভিযুক্তকে ন্যস্ত করার ক্ষেত্রে ম্যাজিস্ট্রেটদের অপর্যাপ্ত মনোযোগের ব্যাপারে হাইকোর্টের বিচারকেরা তাদের চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। ব্লাস্ট বনাম বাংলাদেশ ও অন্যান্য (৫৫ ডিএলআর (এইসিডি) (২০০৩) (৩৬৩) ও সাইফুজ্জামান বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য (৫৬ ডিএলআর (এইসিডি) (২০০৪) (৩২৪) মামলায় হাইকোর্টের বিচারকেরা পুলিশ ও ম্যাজিস্ট্রেটদের প্রতি অনেকগুলো নির্দেশনা দিয়েছেন।

ব্লাস্ট বনাম বাংলাদেশ ও অন্যান্য মামলার ১১ নম্বর নির্দেশনায় বিচারপতি মোহাম্মদ হামিদুল হক ও বিচারপতি সালমা মাসুদ চৌধুরী বলেন, যদি তদন্তকারী কর্মকর্তা কোনো অভিযুক্তকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে চান, তাহলে তিনি জেলের মধ্যে ওই ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবেন।

২০১৬ সালের ২৫ মে দেশের সর্বোচ্চ আদালত পরোয়ানা ছাড়া গ্রেফতার ও রিমান্ড-সংক্রান্ত ৫৪ ধারা ও ১৬৭ ধারা বিষয়ে হাইকোর্টের দেওয়া একটি যুগান্তকারী রায় সমুন্নত রেখেছেন। হাইকোর্টের দেওয়া রায়ে নির্দেশনাগুলোর মধ্যে ছিল, কোনো ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন হলে ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশক্রমে কারাগারের ভেতরে কাচ দিয়ে নির্মিত বিশেষ কক্ষে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে। কক্ষের বাইরে তার আইনজীবী ও নিকটাত্মীয় থাকতে পারবেন। জিজ্ঞাসাবাদের আগে ও পরে ওই ব্যক্তির ডাক্তারি পরীক্ষা করাতে হবে। তবে উচ্চ আদালতের ওই নির্দেশনাগুলো এখনো পালন করা হয় না।

২০১৭ সালের ৩১ মে চট্টগ্রামে গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ হেফাজতে এক আসামির মৃত্যু হয়। তার নাম আহমদ ছফা (৪২)। তিনি নগরের দেওয়ানহাট এলাকায় একটি মোটর পার্টসের দোকানের মালিক। সেদিন সন্ধ্যায় অসুস্থ অবস্থায় তাকে নগরের লালদীঘি এলাকার ডিবি কার্যালয় থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। একই বছরের ২৪ মে নগরের সিরাজদ্দৌলা রোড এলাকার একটি বাসা থেকে নাশকতার পরিকল্পনার অভিযোগে আহমদ ছফাসহ ছয়জনকে গ্রেফতার করেছিল গোয়েন্দা পুলিশ।

এ ঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে চকবাজার থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে দায়ের করা মামলা হয়। এক দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৩১ মে বিকেলে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে তাকে ডিবি কার্যালয়ে নেয়া হয়। সেদিন সন্ধ্যায় তিনি মারা যান। তখন চট্টগ্রাম নগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. কামরুজ্জামান দাবি করেন, আহমদ ছফার শরীরে আঘাতের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও যক্ষ্মা রোগে ভুগছিলেন। এসব রোগেই তার মৃত্যু হয়েছে।

২০১৫ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম বন্দরে পৌনে দুই কোটি রুপি আটক করে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। এই ঘটনায় বন্দর থানায় দায়ের করা মামলায় শামীমুর রহমান নামের এক আসামিকে রিমান্ডে নেওয়ার পর শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠে। একই বছরের ৬ অক্টোবর পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেয় সিআইডি। সে সময় আসামির আইনজীবী রাসেল সরকার অভিযোগ করেন, শারীরিক নির্যাতনে অসুস্থ হয়ে পড়ায় ৮ অক্টোবর বিকেলে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছে সিআইডি। তবে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও সিআইডির পরিদর্শক লিটন দেওয়ান দাবি করেছিলেন, শামীমুরকে কোনো ধরনের নির্যাতন করা হয়নি।

এর আগে ২০১৪ সালের ১৮ জুন নগরের বাকলিয়া এলাকায় পাঁচলাইশ থানার একটি নারী নির্যাতন মামলায় রোকনুজ্জামানকে আটক করে পুলিশ। নিহতের পরিবারের অভিযোগ, পুলিশের গাড়িতেই পুলিশি নির্যাতনে রোকনুজ্জামানের মৃত্যু হয়। ব্যবসায়ী রুকনুজ্জামানের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে আঘাতজনিত কারণে মৃত্যুর কারণ উল্লেখ ছিল। এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রী শিমু আক্তার ছয় পুলিশ ও এক আনসার সদস্যসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন একই বছরের ২৫ জুন। ওই ঘটনায় মামলা দায়েরের দিনই ছয় পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে উঠা রিমান্ডে নির্যাতনের অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে সোমবার বিকেলে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (প্রশাসন) মাসুদ উল হাসানের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি মিটিংয়ে আছেন জানিয়ে ফোন কেটে দেন। চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের কমিশনার মো. মাহাবুবর রহমানের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করেও কথা বলা সম্ভব হয়নি।

পরে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত উপকমিশনার অলক বিশ্বাসের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, যারা ঘটনার সাথে পুরোপুরি জড়িত তাদেরকে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডের আবেদন করা হয়। সব আসামিকে রিমান্ডে নিতে আবেদন জানানো হয়না। এ ছাড়া রিমান্ড মানেই মারধর করা নয়। নানা কৌশল অবলম্বন করে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়ে থাকে। রিমান্ডে নির্যাতন করা হয় না। কিন্তু আসামিকে বাঁচাতে আদালতে আইনজীবীরা রিমান্ড বিষয়ে ভুল তথ্য দেন, যাতে রিমান্ড আবেদন নামঞ্জুর হয়ে যায়।

একুশে/এটি