শনিবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৩০ ভাদ্র ১৪২৬

ভূমি-অধিগ্রহণের চেক নিয়ে নয়-ছয় : দালালদের বাঁচানো কার স্বার্থে?

প্রকাশিতঃ বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ২০, ২০১৮, ১১:৫৮ অপরাহ্ণ

চট্টগ্রাম : ভূমি অধিগ্রহণের চেকসহ আটক তিন দালালকে নিয়মিত মামলার পরিবর্তে মুক্তি দিতে ৮৮ ধারায় চালান দেয়ায় তোলপাড় হচ্ছে নানা মহলে।

অভিযোগ উঠেছে, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তার অনুরোধে পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে মামলা না দিয়ে ৮৮ ধারায় আদালতে চালান দেয়। আটক তিন দালালের দুইজন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তা এবং এক বিচারকের আত্মীয় হওয়ায় পুলিশ তাদের ‘মুক্তি’ দিতে এই কাণ্ড ঘটাতে বাধ্য হয়েছে।

গত ১৭ সেপ্টেম্বর বিকেলে তিন দালালকে আদালত এলাকা থেকে আটক করেছিল গোয়েন্দা পুলিশ। তারা হলেন- ফেনী সদর থানার ইজ্জতপুর এলাকার আলী রাজা ভুঁইয়ার বাড়ির মৃত ইছহাক ভুঁইয়ার ছেলে মো. আবদুল্লাহ ভুঁইয়া (৫৮), চট্টগ্রামের কর্ণফুলী থানার শাহমীরপুর ভেলুয়াপাড়া ক্রসিংয়ের পূর্ব পাশের এলাকার মৃত ইব্রাহিমের ছেলে মো. আইয়ুব আলী (৪৩) ও চট্টগ্রামের সাতকানিয়া থানার কেঁওচিয়া নন্দী বাড়ির মৃত রবীন্দ্রলাল নন্দীর ছেলে তপন নন্দী (৬০)।

আটক তিনজনকে ১৮ সেপ্টেম্বর ৮৮ ধারায় আদালতে হাজির করে পুলিশ। ৮৮ ধারায় অভিযুক্ত করার অর্থ হল- আসামি ভবঘুরে অবস্থায় ছিল। সন্দেহজনক ঘোরাঘুরিকালে আটক করা হয়েছে।

আমল-অযোগ্য অপরাধ হওয়ায় সাধারণত ৮৮ ধারায় আটকদেরকে আদালত জরিমানা করে; পরে জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়।

তবে আটক তিনজনকে সেদিন জরিমানাও গুনতে হয়নি। চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম মো. শফির আদালত তাদেরকে বিনা জরিমানায় জামিন দেন। কিন্তু তিন আসামির স্বজনরা নন-জিআরও প্রসিকিউশন শাখার ইউসুফকে ‘খুশি হয়ে পাঁচ হাজার টাকা দেন’ বলে অভিযোগ পাওয়া যায়।

একুশে পত্রিকার অনুসন্ধানে জানা গেছে, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণের চেক এবং এ সংক্রান্ত সরকারি কিছু কাগজপত্র নিয়ে ধরা পড়েছিলেন ওই তিনজন। শেষ পর্যন্ত প্রশাসনসহ বিভিন্ন পর্যায় থেকে চাপের মুখে সঠিক পথে এগোতে পারেনি পুলিশ।

চট্টগ্রাম নগর পুলিশের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে একুশে পত্রিকাকে বলেন, আটককৃতদের সিন্ডিকেটটি বেশ বড়, প্রভাবশালী। আমাদের একটি ভালো কাজ নষ্ট হয়ে গেল।

নগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ কমিশনার (বন্দর) মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ একুশে পত্রিকাকে বলেন, ভূমি অধিগ্রহণের চেক এবং এ সংক্রান্ত সরকারি কিছু কাগজপত্রসহ তিনজনকে আটক করার পর একটি ফরওয়ার্ডিং দিয়ে আমরা তাদেরকে ডিসি অফিসে পাঠিয়ে দেই। ডিসি অফিস থেকে বলা হয়েছে, এটা তো তদন্তের বিষয়, সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের বিষয় আছে। আমরা তদন্ত করে দেখবো। আপনারা তাদেরকে আপাতত ৫৪ ধারায় চালান দেন। আমরা সন্দেহজনক ধরলে যেটা করি, ৮৮ ধারায় চালান দেই সিএমপির অধ্যাদেশ অনুযায়ী। তাদের বেলায় শেষপর্যন্ত তাই করতে হয়েছে।

একাধিক সূত্রে জানা গেছে, আটকদের মধ্যে আব্দুল্লাহ ভুঁইয়া হচ্ছে প্রশাসন ক্যাডারের জ্যেষ্ঠ এক কর্মকর্তার নিকটাত্মীয়, এছাড়া আটক তপন নন্দী একজন জ্যেষ্ঠ বিচারিক কর্মকর্তার শশুর বলে তথ্য দিয়েছেন আদালতের এক কর্মকর্তা; তবে এসব তথ্য যাচাই করতে পারেনি একুশে পত্রিকা।

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ইলিয়াছ হোসেন বলেন, ‘ওই তিনজনকে চেকসহ আদালত এলাকা থেকে ধরা হয়নি। ধরা হয়েছে দুই নম্বর গেইট এলাকার ব্যাংক থেকে। তারা বলেছিল, যাদের চেক তাদেরকে তারা হেল্প করছিল। তারা নাকি চেক গ্রহীতাদের আত্মীয়ও। আসলে একজনের চেক আরেকজনের কাছে থাকার সুযোগ নেই। চেকগুলো যাদের তাদেরকে জিজ্ঞাসা করার পর আমরা বুঝতে পারবো আসলে ঘটনাটা কী।’

তিনি বলেন, ‘ভূমি অধিগ্রহণের চেকগুলো তো আমি সাতকানিয়ায় গিয়ে বিতরণ করে এসেছি। চেকগুলো ক্যাশ করার কাজটি একটু ভিন্ন ধাঁচের। এই চেকগুলো যার চেক তার ব্যাংক হিসাবেই জমা হবে। কারও হিসাবে যাওয়ার সুযোগ নেই। কীভাবে চেক নিজের ব্যাংক হিসাবে নিতে হয়, ক্যাশ করতে হয়, এসব অনেকেই জানেন না। এজন্য সহযোগিতার জন্য কেউ তাদের হেল্প নিয়েছিল।’

‘আমরা ভূমি অধিগ্রহণের চেক গ্রহীতাদের বলেছি, নিজেরাই চেক নিয়ে ক্যাশ করতে। প্রয়োজনে আমরা হেল্প করবো। লোক দেব। তারপরও কিছু লোক আমাদের হেল্প নেয় না। তাদের ভাষ্য হচ্ছে, ৫০০-৭০০ টাকা তারা দেবে, টাকাটা তুলে দেয়ার জন্য। এ ধরনের কিছু লোক তো আসলে থাকে… কিছু লোক জানে কোথায় যেতে হয়, কী করতে হয়, কীভাবে করতে হয়, এই কাজগুলো করার জন্য কিছু লোক থাকে। যেমন পাসপোর্ট অফিসের আশপাশের কিছু লোক.. একসময় ছিল। যারা ফরম পূরণে সহযোগিতা করে।’ যোগ করেন জেলা প্রশাসক।

‘আটক তিনজনের বিরুদ্ধে প্রাথমিকভাবে গুরুতর অভিযোগ পাওয়া যায়নি। এটা নিয়ে কিছু করা যায়, এমন কোনো ধারাও নাই। এজন্য তাদেরকে এভাবে চালানটা দেয়া হয়েছে। এ ধরনের ঘটনাকে নিরুৎসাহিত করার জন্য এটা করা হয়েছে। এটা দালালি টাইপের কিছু না। তবে ঘটনাটি আমরা তদন্ত করছি। যারা চেকের মালিক তাদের কথা আমরা শুনবো, সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব।’

জেলা প্রশাসক বলেন, ‘খুব বেশী চেকও ছিল না। বড় ধরনের দুর্নীতি- এমন কিছুও নয়। এটা সাধারণ একটা বিষয়। তারপরও আমরা সতর্ক এ বিষয়ে। আমার অফিসের আশপাশে কেউ (দালাল) আসতে পারে না। সিসিটিভি ক্যামেরায় পর্যবেক্ষণ করা হয়। ভুক্তভোগী জমির মালিক ছাড়া এলএ শাখায় অন্য লোক প্রবেশ করা নিষেধ। এখন বাইরে যদি এসব ঘটনা ঘটে সেগুলো আমরা কীভাবে ঠেকাবো?’ তিনি বলেন, ‘এটা নিয়ে জেলা প্রশাসনের কারও সংশ্লিষ্টতা আছে বলে আমি মনে করি না। গোয়েন্দা পুলিশকে বলে রেখেছি, এ ধরনের কিছু পেলে আটক করে ফেলতে।

একুশে/এটি