মঙ্গলবার, ১৮ জানুয়ারি ২০২২, ৫ মাঘ ১৪২৮

জেদ্দার ‘গৃহকারাগারে’ আম্বিয়ার বন্দিজীবন!

প্রকাশিতঃ শুক্রবার, অক্টোবর ৫, ২০১৮, ১:০১ পূর্বাহ্ণ

সৌদি আরব থেকে ফিরে : আম্বিয়া বেগম (৪৫)। সিলেট মৌলভীবাজারের ইদ্রিস মিয়ার মেয়ে। পাঁচ সন্তানের জননী। স্বামী কালা মিয়া কর্মক্ষম। মানুষের বাড়িতে বাড়িতে কাজ করে আম্বিয়াই সংসারের চাকা সচল রাখতেন।

তবুও টানাপোড়েন, অনটন। স্বচ্ছলতার আশায় ধারদেনা করে দালাল ইয়াছিনের হাতে মোটা অংকের টাকা তুলে দেন। তারপর পাড়ি জমান সৌদি আরবের জেদ্দায়।

সময়টা চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি। কথা ছিল থাকা-খাওয়া বাদে মাসিক বেতন এক হাজার রিয়াল (বাংলাদেশি ২২ হাজার টাকা)। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখেন উল্টোচিত্র। বেতন দূরের কথা; না খেয়ে, না ঘুমিয়ে, উপোস থেকে, গৃহকর্তার মার খেতে খেতে ভয়াবহ এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হন আম্বিয়া।

আর একমাস থাকলে এখানে হয়ত মরেই যেতেন! মালিকের পায়ে ধরলেন আম্বিয়া। বললেন-কোনো টাকা-পয়সা চাই না। আমাকে দেশে যাবার একটা টিকেট করে দিন। আম্বিয়ার পীড়াপীড়িতে একসময় ধুরছাই বলে ইতিহাদ এয়ারলাইন্সের টিকেট একটা করে দিল মালিকপক্ষ।

সেই টিকেটে সম্প্রতি এক কাপড়ে দেশে ফিরছিলেন আম্বিয়া। ছোট্ট একটি হাতব্যাগ, সঙ্গে একটি পলিথিনের ব্যাগ’; তাতে কিছু কাগজপত্র, পাসপোর্ট, বাচ্ছাদের ছবি, দালাল ইয়াছিনের ভিজিটিং কার্ড আর সৌদি আরবের ২০ রিয়াল (বাংলাদেশি ৪শ’ টাকা)। আবুধাবি এয়ারপোর্ট হয়ে গন্তব্য ঢাকা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর।

জেদ্দা এয়ারপোর্টে ইত্তিহাদ এয়ারলাইন্সের বাসে চড়লেন বিমানে উঠার জন্য। বাসে উঠেই হাউমাও কান্না। ভাষা জানা নেই, পথ জানা নেই, মানুষ চেনা নেই। প্রথমে আবুধাবী, তারপর ঢাকা বিমানবন্দর। ঠিকমতো পৌঁছবেন তো! ঢাকা পৌঁছেই বা কী হবে!


মৌলভীবাজার যাবেন কী করে! যাতায়াতভাড়া পাবেন কই? এসব উৎকণ্ঠা আম্বিয়ার কান্নাজড়িত কণ্ঠে। বাসের অনেকেই বুঝতে পারেন না আম্বিয়ার ভাষা। কেউ কেউ বুঝতে পারলেও নিরব, নির্বিকার। তখনই এগিয়ে যান প্রতিবেদক। ওমরা হজ শেষে প্রতিবেদক আবুধাবীর যাত্রী। আম্বিয়াকে আশ্বস্ত করলেন। বললেন চিন্তা নেই, তিনি আছেন।

একটু পরে আকাশে উড়াল দেবে বিমান। নেটওয়ার্ক থাকতেই মৌলভীবাজারে আম্বিয়ার ভাইকে ফোনে কথা বলার ব্যবস্থা করা হয়। জানিয়ে দেওয়া হয় আম্বিয়া বেঁচে আছেন, পরদিন সকাল ৬টায় নামবেন ঢাকা এয়ারপোর্টে। কেউ যেন এয়ারপোর্ট থেকে নিতে আসেন।

এরপরও শঙ্কা-উৎকণ্ঠা কাটে না আম্বিয়ার। স্বজনেরা যদি সময়মতো এয়ারপোর্ট না আসে তাহলে কী গতি হবে তার! তার হাতে কিছু বাংলাদেশি টাকা দিয়ে প্রতিবেদক এবার জানতে চান এ পরিস্থিতি কেমন করে হলো? এরপর আম্বিয়া যা শোনালেন তা অমানবিক, নিষ্ঠুর এক উপাখ্যান। বন্দিকারাগারের গল্প!

আম্বিয়া জানান, তার পরিবারে কামাই-রোজগারের কেউ নেই। নিজেই বাড়িতে-বাড়িতে কাজ পরিবারের সদস্যদের মুখে অন্নের জোগান দিতেন। একটা সময়ে সুখের আশায় সিলেটের পানসি বাড়ির ইয়াছিনের (দালাল) মাধ্যমে গৃহকর্মীর কাজে সৌদি আরব যান। দালালের সহায়তায় জেদ্দায় এক সৌদির বাড়িতে কাজ পান। আসার আগে ইয়াছিন বলেছিল সৌদি আরবের গৃহকর্মীর কাজ করলে থাকা-খাওয়া বাদে মাসে একহাজার রিয়াল (২২ হাজার টাকা) বেতন দিবে।

এসময় আম্বিয়া ব্যাগ থেকে সন্তানদের ছবি বের করে কাঁদছেন আর বলছেন, দেশে কখনো উপোস থাকিনি। এখানে কাজ করতে এসে সপ্তাহে দুদিন ভাত খেয়েছি। তাও আবার শুক্র ও শনিবার। বাকি দিনগুলো রুটি খেতাম। ওরা (মালিকের পরিবার) হোটেল থেকে খাবার কিনে খেতেন। দুদিন মালিকের বাচ্চাদের স্কুল বন্ধ থাকত বলে মালিকের স্ত্রী নিজে বাসায় রান্না করতেন।

আম্বিয়া বলেন, পাঁচমাসে কেঁদে কেঁদে স্বামী-স্ত্রী আর তাদের পাঁচ সন্তানের কাপড় ধুয়েছি। আছর থেকে এশা পর্যন্ত তারপর সবগুলো কাপড় আমাকে ইস্ত্রি করতে হত। প্রতিদিন সিঁড়ি মোছার কাজ করতে হত। দেয়াল পর্যন্ত মোছানো হত আমাকে দিয়ে। জীবনে মেশিনে কখনো কাপড় ধুইনি। ইস্ত্রি কীভাবে করতে হয় তাও জানতাম না। তাই ভুল হত। আর ভুল হলে মালিক ও তার স্ত্রী মিলে আমাকে নিষ্ঠুরভাবে মারধর করত।

তাদের ভাষা তো বুঝতাম না। আর না বোঝার কারণে মার খেতে খেতে শরীরের অবস্থা আজ এরকম হয়েছে। আর যদি একমাস এ মালিকের বাসায় কাজ করতাম তাহলে আর প্রাণ নিয়ে দেশে ফেরা হত না। ঘরের মালিক সারাদিন টেলিভিশন দেখে সময় কাটায়। মালিকের স্ত্রী বাচ্চাদের স্কুলে আনানেয়ার কাজ করত। তারা খুব নিষ্ঠুর, কোনো দয়ামায়া নেই তাদের। শুধু নিজেদের সুখ দেখে। বলেন আম্বিয়া।

পাঁচমাসে বেতন পেয়েছি আঠার হাজার টাকা। মালিক একটা বিমানের টিকেট হাতে দিয়ে আমাকে বিমানবন্দরে রেখে চলে গেছে। কিন্তু দালাল ইয়াছিন আজ পর্যন্ত কোনো খবর নেয়নি। যোগ করেন আম্বিয়া বেগম।

একুশে পত্রিকার পক্ষ থেকেও বিভিন্নভাবে চেষ্টা করা হয়। কোনোভাবেই পাওয়া যায়নি দালাল ইয়াছিনকে। ফলে তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

একুশে/এসসি/এটি